সম্পাদকীয়
গরিবের হাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি মানবিক রাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে দেশের দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি অধিক সংখ্যায় মারা যায়, তা শুধু বেদনাদায়কই নয়, বৈষম্যমূলকও। কেননা, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবাইকে সমান চিকিৎসাসেবা দেওয়া। পাশাপাশি িকিৎসা ব্যয় বহন করার দায়িত্বও সরকার এড়াতে পারে না। গতকাল বুধবার ‘আগামীর সময়’-এ প্রকাশিত ‘গরিবের মৃত্যুর কান্না পৌঁছায় না ওপরতলায়’ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো মর্মস্পর্শী ও অনভিপ্রেত। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে ব্যর্থ হওয়ায় বা চাহিদামতো অর্থ জোগান দিতে না পারায় অনেক পিতা-মাতার সন্তান অকালে ঝরে গেছে। যেসব শিশুর মৃত্যু ঘটেছে, অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারে। পিতা-মাতা বা অভিভাবক সীমিত আয়ের মানুষ। স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার থাকায় মৃত্যুহার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ।
প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে এ বছর এখন পর্যন্ত ৭৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার মানুষ। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় দুই ও সিলেটে দুই এবং নতুন আক্রান্ত হয়েছে ৯৯০ জন। মার্চ থেকে সংক্রমণের এই উচ্চ প্রবণতা প্রায় একইভাবে অব্যাহত রয়েছে।
একসময় হামকে সাধারণ শিশুরোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন। দেশে হামের প্রকোপ বাড়ছে আর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। যে রোগ প্রতিরোধে টিকা রয়েছে, সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে গরিব মানুষের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গৌরবের নয়। অথচ নীতিনির্ধারণী মহলের আলোচনায় এই মানুষের আর্তনাদ খুব কমই জায়গা পায়। সত্যিই, গরিবের কান্না যেন ওপরতলায় পৌঁছায় না।
সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা বলা হলেও বাস্তবে রোগীর স্বজনকে বাইরে থেকে পরীক্ষা, ওষুধ কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে হয়। দরিদ্র পরিবারের জন্য এই ব্যয়ই হয়ে ওঠে অসহনীয়। হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য গরিব পিতা ৬০ হাজার টাকা ঋণ করেও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। অনেকে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে বাড়ি ফিরে যান। ফলে রোগীর পরিণতি হয় দুঃখের।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা বারবার সামনে আসছে। টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, সচেতনতার অভাব, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং রোগ শনাক্তে বিলম্ব— এসবের দায় সাধারণ মানুষের নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। অথচ এই ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষ।
আরও বেদনাদায়ক হলো, স্বাস্থ্য খাতে বিপুল পরিকল্পনা ও উন্নয়নের কথা বলা হলেও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বাস্তব চিত্র কমই আলোচনায় আসে। শহরের উন্নত হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা পরিসংখ্যান দিয়ে সাফল্যের গল্প ফাঁদা সহজ; কিন্তু গ্রামের সেই বাবা, যিনি সন্তানের চিকিৎসার জন্য সহায়সম্পদ বিক্রি বা ঋণ করেন, তাদের গল্প রাষ্ট্রীয় সাফল্যের পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় না।
মনে রাখা দরকার, হামে আক্রান্ত একটি শিশুর কান্না বা মৃতের পিতা-মাতার বুকফাটা আর্তনাদ শুধু পরিবারের নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও ক্ষোভ প্রকাশের প্রতীক। দরিদ্র মানুষের জীবন যদি অর্থের কাছে পরাজিত হয়, তবে উন্নয়নের সব দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন গরিব মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং তাদের কান্নাও সমান গুরুত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। কারণ, একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার অট্টালিকায় নয়; বরং সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতায়।




