সম্পাদকীয়
বয়স্কদের সুরক্ষাকবচ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্পত্তি দান করার পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন— এমন বিধান রেখে গত রবিবার জাতীয় সংসদে ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল পাস হয়েছে। বর্তমান সমাজ-বাস্তবতায় আইন পাসের ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা এমন অনেক ঘটনা দেখেছি, যেখানে জীবিত অবস্থায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে সম্পত্তি দানের পর দাতা, বিশেষ করে বয়স্ক মা-বাবাকে অসহায় অবস্থায় পড়তে হয়েছে। লিখিতভাবে সম্পত্তি বুঝে পাওয়ার পর কর্তৃত্ববাদী আচরণ ও দুর্ব্যবহার ছাড়াও সন্তান কর্তৃক মা-বাবাকে ঘরছাড়া করার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। নিঃসন্দেহে এ চিত্রটি অস্বস্তিকর; কিন্তু এটিই আমাদের সমাজের বাস্তবতা। তবে আইনটি এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্পত্তির মালিকানা, দখল ও উত্তরাধিকার অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আইনটির প্রয়োগে যাতে কোনো প্রকৃত উত্তরাধিকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়; কিংবা ভোগের অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধ সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে দান, মালিকানা ও উত্তরাধিকার— এই তিনটি বিষয় যেন আইনি ব্যাখ্যার জটিলতায় পরস্পরের সঙ্গে গুলিয়ে না যায়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধিমালা ও প্রয়োগব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকতে হবে।
আপাতদৃষ্টে নতুন আইনটি মানুষের সম্পত্তির অধিকার, পারিবারিক দায়িত্ব এবং বয়স্ক দাতা ব্যক্তির নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দাতা সম্পত্তি দান করবেন; কিন্তু জীবদ্দশায় সে সম্পত্তির ভোগাধিকারও বজায় থাকবে— এটি অবশ্যই বাস্তবমুখী একটি ব্যবস্থা। তবে আইন পাস করাই শেষ কথা নয়; এর সুষ্ঠু প্রয়োগই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অপব্যবহার রোধ, দাতার সম্মতি নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত মালিকানা ও উত্তরাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। একই সঙ্গে
এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এটি শুধু কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের জন্য নয়; সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু ‘আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’— এমন অভিযোগ এনে বিলটি পাসের বিরোধিতা করেছে বিরোধী দল। আইনমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এই আইন হেবা বা অন্যভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর প্রভাব ফেলবে না। এখানে মুসলিম আইনকে স্পর্শ করা হয়নি। এই আইনে যে গিফটের (সম্পত্তি হস্তান্তর) কথা বলা হচ্ছে, তা হেবা নয়। এই
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে এটি স্পষ্ট, ধর্মীয় উত্তরাধিকার বিধানের সঙ্গে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিষয়টিকে এক করে দেখা যুক্তিসংগত নয়। সার্বিক বিবেচনায় বিরোধিতা সত্ত্বেও বিলটি পাস হওয়া দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সংযোজন বলেই আমরা মনে করি।



