সম্পাদকীয়
সিন্ডিকেটের ভূত তাড়াবে কোন ওঝা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যেন এক ট্র্যাজেডির নাম। ক্ষমতার হাতবদল হয়, রাজপথের স্লোগান বদলায়, কিন্তু বদলায় না ভাগ্যপীড়িত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়তি। ক্ষমতার মসনদে যখনই যিনি বসেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ততবার আরও শক্তিশালী, আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই রাক্ষুসে সিন্ডিকেটের চাবুক কি এতটাই শক্তিশালী যে, কোনো সরকারই এর রাশ টানতে পারে না? নাকি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সিন্ডিকেটের ওপর দায় চাপিয়ে সব সরকারই দায়মুক্তি খুঁজে যাবে?
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ছিল মূলত ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুর আশীর্বাদপুষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ীর একচেটিয়া চারণভূমি। হাজার হাজার কোটি টাকার এ মহাযজ্ঞে মুষ্টিমেয় কিছু রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ‘১০ এজেন্সি’ কিংবা ‘২৫ এজেন্সি’র চক্র। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কয়েকগুণ বেশি অভিবাসন ব্যয় চাপানো হয়েছিল সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। ভিটেমাটি বেচে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কুয়ালালামপুরে পা রেখে হাজার হাজার শ্রমিক দেখেছিলেন শূন্যতা— না ছিল চাকরি, না ছিল থাকার জায়গা।
এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের ডঙ্কা বাজিয়ে শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত ও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময়ই কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং বন্ধ থাকা বাজার খোলার ধীরগতির মারপ্যাঁচে কেবল সময়ক্ষেপণই হয়েছে।
এখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার আলোচনায়। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় ১৮ ঘণ্টা কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন বেইজিংয়ে। বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারেক রহমান। কিন্তু সেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কি আদৌ সস্তা ও স্বচ্ছ হবে? নাকি পুরনো সিন্ডিকেটের চর্বিতচর্বণ চলবে?
সাবেক রাষ্ট্রদূত এ কে এম আতিকুর রহমানের অভিজ্ঞতা আমাদের বিচলিত করে। তার মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা মানেই একদল মধ্যস্বত্বভোগী আর সিন্ডিকেটের পোয়াবারো। সেই পুরনো জিম্মিদশা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের ফাঁস আর ঋণের ফাঁদ। প্রধানমন্ত্রী মুখে বলছেন মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে কি সেই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব? মালয়েশিয়া এখন আর শুধু পাম বাগানের অদক্ষ শ্রমিক চায় না। তারা চাইছে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ হাত। অথচ আমাদের প্রস্তুতি এখনো সেই মান্ধাতা আমলের। ফার্নিচারশিল্পেও এখন কম্পিউটার চলে। আমরা কি আমাদের তরুণদের সে কারিগরি বিদ্যা দিতে পেরেছি, নাকি স্রেফ সস্তা শ্রমের জোগানদার বানিয়েই খালাস?
উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে কাঠামোগত লোভের মধ্যে। এই সিন্ডিকেট এখন আর শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র। এর এক হাত ঢাকায়, তো অন্য হাত কুয়ালালামপুরে। এটি এখন একটি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের ব্যবস্থা। তাই দুই দেশের কর্তৃপক্ষ এর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। বাংলাদেশের সব সরকারই কেন শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের সামনে নতজানু হয়? মালয়েশিয়া সরকার মাঝেমধ্যে বাগাড়ম্বর করলেও তাদের নিজেদের ভেতরের লবিস্ট আর এজেন্সির চাপ সামলাতে পারে না। ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে— ঢাকা এবং কুয়ালালামপুর, দুই প্রান্তের সরষের ভেতরেই ভূত বসে আছে। এই দুই দেশের যৌথ মাফিয়াতন্ত্রকে উপড়ে না ফেলে কেবল দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আর আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে শ্রমবাজার সচল করার চেষ্টা করা মানে আবারও একদল নিরপরাধ মানুষকে ঋণের ফাঁদে ফেলে জিম্মি করার লাইসেন্স দেওয়া।




