পদত্যাগের বৃত্তেই পাহাড়ের রাজনীতি

এখনো নিরূপা দেওয়ানের স্মৃতিতে ঝলমল ৩৪ বছর আগের সেই কঠিন সময়। স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, ১৯৮৯ সালে পাহাড়ের সংকট সমাধানে গঠিত হলো স্থানীয় সরকার পরিষদ, যা এখন পার্বত্য জেলা পরিষদ নামে পরিচিত। পাহাড়ি-বাঙালি সবার একচ্ছত্র সমর্থনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন সাবেক জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ও সংগঠক, দুবারের নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান, সরাসরি কোনো দলীয় রাজনীতি না করা গৌতম দেওয়ান। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৯২ সালে রাঙামাটি শহরে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা চলাকালে বারবার প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে ব্যর্থ হয়ে রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে পদত্যাগ করে চলে গেলেন তিনি। সেই যে পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রথম ও একমাত্র চেয়ারম্যানের সংক্ষিপ্ত শাসনামলের অবসান হলো, সেই পদে আর নির্বাচনই হলো না ৩৭ বছরেও! গৌতম দেওয়ানকে দিয়ে পদত্যাগ সংস্কৃতি শুরু হলো, এরপর মনিস্বপন পেরিয়ে দীপেনে এসেও একই ঘটনাই ঘটল। রাঙামাটিবাসী দুর্ভাগা, তাদের কপালই খারাপ। রাষ্ট্র পাহাড়ের মানুষের আবেগ, অনুভূতিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে না কখনো। করলে বারবার একই রকম ঘটনা ঘটত না।
১৯৯২ সালে গৌতম দেওয়ানের পদত্যাগের পর ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান। কিন্তু পাশের জেলা খাগড়াছড়ির সাংসদ ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ-বিবাদ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিরক্ত মনিস্বপন উপমন্ত্রী থেকে পদত্যাগই করেন। সেই সঙ্গে দলও ছাড়েন বা ছাড়তে বাধ্য হন।
এ প্রসঙ্গে মনিস্বপন দেওয়ান বললেন, ‘বিশ বছর পর সেই সময়কার প্রেক্ষিত ও পরিস্থিতি কেমন ছিল, সেসব নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। তবে আমার সঙ্গে দল বা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো বিরোধ বা মান-অভিমান ছিল না। এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় যে, আমি দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম।’ তবে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মনিস্বপন ফের দলেও ফিরেছেন দল ছাড়ার বছর পাঁচেক পর। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলের প্রার্থীও হয়েছিলেন।
গৌতম দেওয়ান, মনিস্বপন দেওয়ানের ধারাবাহিকতায় মাত্র দুদিন আগে পদত্যাগ করলেন রাঙামাটি থেকে প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হওয়া দীপেন দেওয়ানও! ৩৭ বছরের ব্যবধানে তিন দেওয়ানের পদত্যাগ কাকতালীয় হলেও একই ধরনের রাজনীতির পুনরাবৃত্তি।
শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বললেন, ‘এটা অস্বাভাবিক, একই ঘটনা, বারবার, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। আমার ধারণা, শাসকরা পাহাড়ের সমস্যা ও পাহাড়ের মানুষকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করছেন না। শাসকের চোখে না দেখে আস্থা ও নির্ভরতার চোখে দেখতে পাহাড়ের মানুষ ও নেতৃত্বকে। তবেই হয়তো এমন বারবার পদত্যাগের ঘটনা ঘটবে না।’
৩৭ বছরের ব্যবধানে তিন দেওয়ানের পদত্যাগ কাকতালীয় হলেও একই ধরনের রাজনীতির পুনরাবৃত্তি। একই দৃশ্যের প্রত্যাবর্তনকে ‘স্বাভাবিক’ মানতে নারাজ বিশিষ্টজনরা
আর সাবেক পার্বত্য উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান বলছেন, যদিও ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিত ভিন্ন ভিন্ন। তবে বাস্তবতা তো অস্বীকার করা যায় না। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, ‘আপাতত সবাই কিছু বিষয় নিয়ে কথা বললেও আমার বিশ্বাস ভেতরে অন্য কোনো কারণ আছে, যা হয়তো আমরা জানি না বা বুঝতে পারছি না। সময়ে হয়তো তা পরিষ্কার হবে।’
সর্বশেষ এ পদত্যাগের কারণে কী জটিলতা হতে পারে পাহাড়ে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘কী আর হবে? কিছুই হবে না। বিএনপি বড় দল। কোনো কিছুই থেমে থাকবে না। যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা ভেবেচিন্তেই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা গেছে খুব দ্রুত পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে গেজেট নোটিফিকেশন দেখেই। দেখা যাক, সামনে কী হয়।’
তবে নিরূপা দেওয়ান মনে করেন, এ পদত্যাগের ঘটনার কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। কারণ, দীপেন কাজ করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিছু উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তার পদত্যাগে তা বাধাগ্রস্ত হবে, আস্থাহীনতা বাড়বে।
তবে ঘটনার নেপথ্যে যত ঘটনাই থাকুক না কেন, গৌতম দেওয়ান, মনিস্বপন দেওয়ান আর দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে সাদৃশ্য খুঁজে বের করে প্রতিবাদে সরব হয়েছেন পাহাড়ের মানুষ। তারা বলছেন, সম্ভবত আত্মমর্যাদার প্রশ্নেই বারবার হোঁচট খাচ্ছে পাহাড়ের নেতৃত্ব, যা গড়াচ্ছে পদত্যাগে। এমন পদত্যাগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তারা শাসকদের শক্তিপ্রয়োগ নয়, হৃদয়কে ব্যবহারের পরামর্শই দিচ্ছেন।
পদত্যাগের পর ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো মুখ খোলেননি সদ্য পদত্যাগী পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। অনুসারীরা মিছিল-মিটিং-বিক্ষোভ করলেও তিনি একদম নীরব। তিনি মুখ না খোলা অবধি মিলবে না বহু প্রশ্নের উত্তর।
নতুন পার্বত্যমন্ত্রী হবেন কে তা নিয়েও চলছে নানা বিশ্লেষণ। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা কেউই মুখ খুলছেন না এ নিয়ে। দীপেন দেওয়ান এখনো ঢাকায়, ঢাকায় আছেন জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারও। ঢাকাতে আছেন, যাকে ঘিরে এত ঘটনা, সেই সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ানও। এমনকি ঢাকায় অবস্থান করছেন বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরিও, যার নামই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে পরবর্তী পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে। তবে বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তিনি এ কঠিন সময়ে বড় দায়িত্বটি পালন করতে পারবেন, এটা মানতে নারাজ তার ঘনিষ্ঠজনরাও।
বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছে, সম্ভবত ২০০১-০৬ সালের খালেদা জিয়া সরকারের মতো মন্ত্রণালয় নিজের অধীনে রেখে বর্তমান প্রতিমন্ত্রীকে দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়টি চালাতে পারেন খোদ প্রধানমন্ত্রী! কারণ, শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট না থাকা জেরিকে মন্ত্রী করা না হলে, টেকনোক্র্যাট কোটায়ও কাউকে যে মন্ত্রী করা যেতে পারে, সেই সুযোগ কম সরকারের হাতে। ফলে প্রধানমন্ত্রী নিজের দায়িত্বেই এ মন্ত্রণালয় রেখে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনার কথাই বলছে!
লেখক: সাংবাদিক, রাঙামাটি




