মার্কিন রাজনীতিতে ‘বদমাশদের’ উত্থান

গত পহেলা সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা ‘সাইমন অ্যান্ড শুস্টার’ প্রকাশিত বইটির শিরোনাম ছিল চমকে দেওয়ার মতো: ‘আমেরিকান স্কাউন্ড্রেল: রয় কোনস ডার্ক জার্নি ফ্রম জো ম্যাকার্থি টু ডোনাল্ড ট্রাম্প’ (মার্কিন বদমাশ: জো ম্যাকার্থির থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত রয় কোন-এর অন্ধকারময় সফর)। বইটির রচয়িতা হলেন পুলিৎজারজয়ী মার্কিন লেখক কাই বার্ড ও গবেষক সুজান গোল্ডমার্ক। লেখকদ্বয় নামকরা মার্কিন আইনজীবী ও ডিল-মেকার (সফল মধ্যস্থতাকারী) রয় কোন (১৯২৭-৮৬)-এর বিস্ময়কর জীবনী তুলে ধরেছেন, আপাতদৃষ্টিতে সততার সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পটুত্বের জন্য যার কুখ্যাতি ছিল। তার পিতা অ্যালবার্ট কোন নিউ ইয়র্ক রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হওয়ায় প্রথমে অকৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও পরে পারিবারিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি কলাম্বিয়া ল স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান, যার মাধ্যমে বিধিবিধানকে কীভাবে বাঁকাতে হয়, সেই শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন।
লেখকদ্বয় বইটিতে রয় কোনের সবচেয়ে কুখ্যাত ভূমিকাগুলোর কথা তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে ছিল কট্টর কমিউনিস্টবিরোধী ম্যাকার্থি দর্শনের শিশুসুলভ মুখ ও প্রতীক হিসেবে কাজ করা আর মাফিয়া ডন, স্টুডিও-৫৪ বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিচিত্র সব খদ্দেরের পক্ষে ওকালতি করা। বইটিতে উকিল হিসেবে কোনের অদ্ভুত ও পরস্পরবিরোধী চরিত্র এবং আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রবণতাসহ তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এতে নিউ ইয়র্ক সিটি ও ওয়াশিংটন ডিসির উঁচু সমাজে কোনের বিরামহীন জনপ্রিয়তার কথাও বলা হয়েছে। যদিও তার রাজনীতি ও দুর্নীতির ব্যাপারে অনেকেই বিরক্ত এবং বীতশ্রদ্ধ ছিলেন, তবু তার ক্যারিশমা, আড্ডাবাজিতে দক্ষতা এবং লেনদেনমূলক আনুগত্যের কারণে তিনি অনেককেই আকর্ষণ করতেন। উদাসীনতা ও নির্লজ্জতার এই অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে মৃত্যুর— এমনকি চল্লিশ বছর পরও মার্কিন সমাজে তার প্রতাপ আজও দৃশ্যমান হয়।
কাই বার্ড অতীতে রয় কোনের প্রভাব ও তাৎপর্যকে তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কোনের প্রাক্তন খদ্দের ও শিষ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন, তখন তিনি নড়েচড়ে বসলেন ও উপলব্ধি করলেন, যা ঘটছিল তা হলো কোনের মারকুটে বা অতি-আক্রমণাত্মক রাজনীতির জয়, যার মাধ্যমে এক পার্শ্ব-অভিনেতাই রাজনৈতিক মঞ্চের কেন্দ্রস্থল দখল করতে সক্ষম হয়েছিল।
মার্কিন রাজনৈতিক মঞ্চে রয় কোনের আবির্ভাব ঘটে ১৯৫১ সালে, যখন ২৪ বছর বয়সী মার্কিন সহকারী অ্যাটর্নি হিসেবে তিনি কমিউনিস্টদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে জুলিয়াস ও এথেল রোজেনবার্গের বিচারে কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারককে সম্ভবত প্রভাবিত করেন। এরপর তিনি সরকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কমিউনিস্ট ও সমকামীদের বহিষ্কারে সিনেটর জো ম্যাকার্থির শুদ্ধিকরণ অভিযানে যোগ দেন, যদিও তিনি নিজেও সমকামী ছিলেন। রয় আত্মসমালোচনার ব্যাপারে কখনো আগ্রহী ছিলেন না, বরং তার ভিন্ন ধরনের সত্তা নিয়েই তিনি বিভিন্নমুখী লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। সরকারি মামলা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি এমনকি মাফিয়াদের পক্ষেও আদালতে দাঁড়াতেন। এটি অব্যাহত ছিল ১৯৮৬ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত, যখন সারা জীবন অস্বীকার করা সত্ত্বেও ৫৯ বছর বয়সে তিনি এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে মারা যান।
তার বিবেকহীনতা ও নির্মমতার জন্য দশকের পর দশক রয় কোন মার্কিন সমাজে পপ-সংস্কৃতির পরিপূর্ণ খলনায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। টনি কুশনারের নাটক ‘অ্যাঞ্জেলস ইন আমেরিকা’য় তাকে বানানো হয়েছিল অন্যতম প্রধান চরিত্র। আর টেলিভিশন সিরিজ ‘দি সিম্পসন’-এ তার কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে নিয়মিত প্যারোডি বা বিদ্রূপ করা হতো। তা ছাড়া দুটি ডকুমেন্টারিসহ অন্তত চারটি চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ছিলেন রয় কোন। সম্প্রতি ‘দি অ্যাপ্রেন্টিস’ চলচ্চিত্রে তরুণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেন্টর বা বিশ্বস্ত মন্ত্রণাদাতা হিসেবে তার চরিত্রটি রূপায়ণ করা হয়েছিল।
‘সেটা সত্য নয়’ দাবিটি যেন কাই বার্ডের বইয়ের একটি অন্তর্নিহিত থিম বা বিষয়। কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য রয় দাবি করেছিলেন, তিনি শেয়ারবাজারে লাখ লাখ ডলার খুইয়েছেন, কিন্তু এফবিআইয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল সেটি সত্য নয়। তার জন্য জুতসই বা সুবিধাজনক মনে হলেই তিনি মিথ্যা বলতেন, যেটি প্রায়ই ঘটত; আর এটিকে তিনি অন্যদের সামনে তার কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর পন্থা হিসেবে দেখতেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই রয় কোন কখনো শাস্তির সম্মুখীন না হয়েই দশকের পর দশক ধরে মিথ্যা কথা বলে গেছেন। মার্কিন সেনাবাহিনী বনাম সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থি শিরোনামের মামলায় তিনি ছিলেন ম্যাকার্থির প্রধান কৌঁসুলি। সে সময় আদালতে শপথবদ্ধ থাকা অবস্থায়ও তার প্রতারণামূলক আচরণ ও মিথ্যাচার সবার কাছে উন্মোচিত হয়ে পড়ে এবং তাকে শপথভঙ্গের অভিযোগেরও সম্মুখীন হতে হয়। তবে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর এই মামলাটি ম্যাকার্থির রাজনৈতিক জীবন বা ক্যারিয়ারের ইতি টেনে আনলেও রয় কোনকে এর কারণে কোনো পরিণতি ভোগ করতে হয়নি।
কাই বার্ডের বইটিতে রয় কোনের ঘটনাবহুল জীবনের নির্বাচিত কিছু অংশ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে মার্কিন বিচার বিভাগ যখন কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, তখন কোম্পানির উকিল হিসেবে রয় কোন পাল্টা দাবির বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। এ দুই ব্যক্তি শুধু দুটি পথই বেছে নিতেন: হয় যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শন, না হয় তৈলমর্দন। মামলা চলাকালে ট্রাম্পের জন্য কোনের উপদেশ ছিল— লড়াই আর লড়াই, আক্রমণ আর প্রতি-আক্রমণ। প্রয়োজনে বাদীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি, যেটি ছিল একেবারেই আজগুবি। তবে তরুণ ট্রাম্প এ ধরনের পরামর্শই পছন্দ করতেন আর এভাবেই ট্রাম্পের উত্থানে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন। এরপর বহু বছর ধরে এই দুই গুরু-শিষ্য ব্যক্তিগত ও পেশাগত পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
এফবিআইয়ের নথি থেকে জানা যায়, শপথভঙ্গ, ঘুষ লেনদেন ও চাঁদাবাজির জন্য রয়কে তিনবার অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে তিনি লক্ষণীয়ভাবে প্রতিবারই সেগুলো এড়িয়ে যেতে বা পাশ কাটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশ্য ১৯৮৬ সালে তার মৃত্যুর আগে তাকে পেশাগত অসদাচরণের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
কাই বার্ডের মতে রয় কোনের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার হলো তার মূল্যবোধের ভিন্নতা, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ ও এলিটশ্রেণির ব্যাপারে অসন্তোষ এবং অভিবাসীদের সন্দেহের চোখে দেখা, যার যোগফল হলো ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদ, যেটি মার্কিন রাজনীতির সর্বত্র আজ দৃশ্যমান, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো উঠতি জনতুষ্টিবাদী নেতাদের মনে গভীরভাবে ছায়াপাত করেছিল।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও ‘বাংলাদেশ কোয়ার্টারলি’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক




