মিমযুদ্ধের বিদ্রূপবাণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রবিবার গভীর রাতে লেখক ও চিত্রনাট্যকার সৈয়দ নাজিম উদ দৌলা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন— “জার্মানি এক গোল দিতে না দিতেই কুরাসাও শোধ করে দিল। অবস্থা বেগতিক দেখে জার্মানির কোচ পোলাপানরে ডাইকা বললেন, ‘বাবারা ওপরের দিকে তাকানোর দরকার নাই, মাথা নিচু করে খেলো।’ খেলোয়াড়রা তো অবাক! ‘কী বলেন কোচ? মাথা নিচু করে খেলব কেন?’ কোচ মুচকি হেসে বললেন, ‘মাথা নিচু রাখলে দেখতে পাবা কুরাসাওয়ের প্যান্টের কালার হলুদ। আর হলুদ কালার দেখতে থাকলে অতীতের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি মনে পড়বে, আরও ইন্সপায়ার্ড হয়ে খেলতে পারবা।’”
নাজিম উদ দৌলা এই পোস্টটি দিয়েছেন গত রবিবার রাতে ফুটবল বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপে জার্মানি বনাম কুরাসাও ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মাথায়। ততক্ষণে বাংলাদেশে রাতবিরেতে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং এমনভাবে তারা পরস্পরের দিকে কটাক্ষের তীর ছুড়তে শুরু করেছেন, যেন তাদের পছন্দের দল এ ম্যাচে অংশ নিয়েছে। এ তর্কের উৎস জার্মানি-কুরাসাও ম্যাচের স্কোরলাইন: ৭-১। ১২ বছর আগে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচে ব্রাজিল আর জার্মানির স্কোরলাইনের সঙ্গে কালতালীয় মিল এ মল্লযুদ্ধে বারুদ ঠুকেছে।
নাজিম উদ দৌলার এ পোস্টের নিচেই এক ব্রাজিল সমর্থক লিখেছেন: ‘জার্মানি ১-২টি গোল দিলে আর্জেন্টিনা ফ্যানরা খুশি, আর ৭ গোল দিলে মনে করে পারিবারিক অর্জন। রক্তের টান বলে একটা কথা আছে না।’
ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ফ্যানরা পরস্পরের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধেই লিপ্ত হয়। মাঠে-ঘাটে এ নিয়ে সমর্থকদের লাঠালাঠি, দুনিয়া জুড়ে কৌতূহল ও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। এর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শুরু হয় বিভিন্ন মিডিয়ায়।
লেখক কিযী তাহনিন ওই রবিবার রাতেই এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন: “বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এ দেশে অনেক সবুজ গাছ আছে, লাল, কমলা ফুল ফোটে তাতে। বাঘ আছে, পাখি আছে, গরু আছে। ...এ দেশে দুটো মাত্র জেলা— ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। তারা এমনিতে মিলেমিশে থাকে। কিন্তু প্রতি চার বছর পরপর তারা বিশেষ এক ঐতিহ্যবাহী খেলার আয়োজন করে থাকে, যার নাম ‘গুঁতোগুঁতি খেলা’।”
কিযী তাহনিন কথিত এই ‘গুঁতোগুঁতি’ রাজপথে অনেক সময় সংঘাতের জন্ম দেয়। তবে সংঘাতের বড় অংশটি ঘটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকে বললেন, বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মিমযুদ্ধ শুধু ফুটবল সমর্থনের প্রকাশ নয়, এটি ডিজিটাল যুগে পরিচয় নির্মাণ, গোষ্ঠীগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিকল্প বা ‘ধার করা জাতীয়তাবাদের’ এক অভিনব সামাজিক নাটক।
এই মিমযুদ্ধের বেশিরভাগই হয় তীব্র আক্রমণাত্মক ও বিদ্রূপাত্মক, যেটি এখন আমাদের মতপ্রকাশের সংস্কৃতির সার্বিক চেহারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর উল্টোটাও হরহামেশা চোখে পড়ে। ফেসবুকে পোস্ট, মিম আর রিলসের এ মল্লযুদ্ধে আমি মাঝেমধ্যে বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ আর সৃজনশীলতার ছাপ খুঁজে পাই।
যেমন ধরা যাক ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো একটি জার্সির বিজ্ঞাপনের কথা। অর্ধেক হলুদ আর অর্ধেক লাল এই জার্সিটি, বলা হচ্ছে— ‘পর্তুজিল’ নামে একটি দেশের ফুটবল জার্সি। পর্তুজিল কেন? পর্তুগাল আর ব্রাজিল শব্দের পোর্টম্যান্টো। পেছনের কারণ হলো, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বরাবরের অভিযোগ, পর্তুগালের ফ্যানদের বড় অংশটি আসলে ব্রাজিলের সেসব ছদ্মবেশী সমর্থক, যারা মেসির সর্বকালের সেরা ফুটবলার হওয়ার পথে সিআর-৭-কে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। ফলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা যুদ্ধে শিখণ্ডী হিসেবে প্রায়ই পর্তুগালের আবির্ভাব ঘটে।
মেসির এটি বিদায়ী বিশ্বকাপ। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই তার তাক লাগানো পারফরম্যান্স দেখে পাভেল মহিতুল আলম নামে এক প্রবাসী লেখক তার পোস্টে লেখেন: ‘প্রতিবারের মতো এবারও কি শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামলেন তিনি?’
তবে মেসির বিরুদ্ধে ব্রাজিল সমর্থকদের পুরনো অভিযোগ, রেফারি ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে পেনাল্টি পাইয়ে দেন আর সেই পেনাল্টিতে গোল করে মেসি তার গোলের ভাণ্ডার বাড়িয়ে নেন। মেসিকে খাটো করার এই অভিপ্রায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এবার ম্যাচ শেষে লেখক এনামুল রেজা লিখেছেন: ‘আমাদের ভাগের পেনাল্টিটা ছাড়াই লিও মেসির প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক হয়ে গেল।’ আর মিউজিক কম্পোজার রুসলান রেহমান লিখেছেন: ‘এই দুনিয়ায় একমাত্র মেসিই পারে আহমেদ শরীফকে আহমেদ রুবেলে পরিণত করতে।’
প্রথম ম্যাচে মেসির এ জয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায় অনেক ব্রাজিল সমর্থককেও। আবার একটু তেতো ওষুধের মতো জিনিসটাকে গেলার ভঙ্গি দেখা যায় কারও কারও মধ্যে। সেটিরও প্রকাশ ঘটে মিমে। একটি মিমে যেখানে মেসি আকাশের দিকে হাত তুলে বলছেন, ‘আমাকে একজন ব্রাজিলিয়ানের মতো খেলার তৌফিক দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, ঈশ্বর।’
নেটিজেনদের সবচেয়ে সৃজনশীল সক্রিয়তা দেখতে পেলাম পর্তুগাল বনাম কঙ্গোর ম্যাচের পরপর। ম্যাচে পর্তুগাল ভালো করতে না পারা মানে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের অব্যর্থ বিদ্রূপবাণ আর সেটি ব্রাজিল সমর্থকদের দিকে তাক করা। তার ওপর মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এবার ম্যাচে কোনো গোল করতে পারেননি। মেসির হ্যাটট্রিকের বিপরীতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর গোলখরা। ফেসবুকে ঘুরতে থাকা একটি রিলসে দেখি— টেলিভিশনের এক জনপ্রিয় নাটকের খণ্ডদৃশ্যে মোশাররফ করিম মহল্লায় ফুটবল খেলতে নেমে প্রতিপক্ষের ক্যাপ্টেনের প্রায় পায়ে পড়ে অনুনয় করছেন, তাকে যেন অন্তত একটি গোল করতে দেওয়া হয়। এই রিলের ক্যাপশনে লেখা: ‘প্রত্যেক ম্যাচের আগে সি. রোনালদো।’
জনপ্রিয় উপস্থাপক এবং ক্রীড়া ভাষ্যকার কাজী সাবির পর্তুগালের ম্যাচ প্রসঙ্গে তার পোস্টে ব্রাজিল সমর্থকদের উদ্দেশে কটাক্ষ হেনে লিখেছেন: ‘যখন ওয়াহিদা (প্রথম স্ত্রী) আর মাসনা (দ্বিতীয় স্ত্রী) দুজনেই ড্র করে, তখন দুই বিয়ে আর আনন্দের থাকে না।’
এসব মিমযুদ্ধের হট্টগোলে মাঝেমধ্যেই দেখি ঢুকে পড়ে রাজনৈতিক বিদ্রূপবাণ। সেরকম একটি মিমে দেখছি রেফারি খেলোয়াড়ের দিকে হলুদ কার্ডের বদলে বাড়িয়ে ধরেছেন একটি ফ্যামিলি কার্ড।
বিশ্বকাপ ফুটবল এখন গ্রুপ পর্যায় পার করছে। খেলা যতই এগোবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হবে, ততই দেশের ফুটবলপাগল নেটিজেনদের শানিত তরবারি থেকে সৃজনশীলতার স্ফুলিঙ্গ দিগ্বিদিক ছুটতে দেখব আমরা— এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।




