গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তায়

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও গৃহস্থালি খাতে প্রাকৃতিক গ্যাস অন্যতম প্রধান এবং অপরিহার্য চালিকাশক্তি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে আমদানি-নির্ভরতার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা চলেছে। এতে সাময়িকভাবে সরবরাহ ঘাটতি পূরণ হলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়েছে।
আমদানি-নির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধি তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ের ওপর। তাই চলমান গ্যাস সংকটকে শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের দুর্বল জ্বালানি পরিকল্পনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, আমদানি-নির্ভরতা ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর সম্মিলিত ফল। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমলেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উন্নয়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো অনুসন্ধান পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বিপরীতে ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছে। ভারতের মন্ত্রিসভা এরই মধ্যে ৮৪ হাজার ৮৪ কোটি রুপি ব্যয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত একটি জাতীয় অফশোর অনুসন্ধান প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন দিয়েছে। দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কোনো একটিতে ত্রুটি দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা গুরুতর সংকটে পড়ে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলে সার উৎপাদন কমবে এবং আমদানি-নির্ভরতা বাড়বে। এতে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে হিমাগার, গুদাম এবং অন্যান্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় রাখা পচনশীল খাদ্য নষ্ট হতে পারে। ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। জ্বালানি সংকটে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হবে।
চলমান গ্যাস সংকটকে শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ২০২৬ সালের গ্লোবাল আউটলুক অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, জলবায়ু বিপর্যয় এবং জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে আরও ১ কোটি ৮১ লাখ বাংলাদেশি চরম খাদ্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন।
পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রাইড-শেয়ারচালক পরিবারগুলো এই সংকটে বহুমাত্রিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৮৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের দৈনিক আয় কমেছে। আয় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কথা জানিয়েছেন, যা তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট করছে। এসব কৌশল সাময়িকভাবে পরিবার চালাতে সহায়তা করলেও দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক স্থিতি, শিশুদের শিক্ষা-চিকিৎসা গ্রহণ এবং পারিবারিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করতে পারে।
এদিক থেকে দেখলে বলা যায়, জ্বালানি সংকট শুধু গ্যাস সরবরাহ বা পরিবহন খাতের সংকটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ঋণ-নির্ভরতা এবং সামাজিক সুরক্ষারও সংকট। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিকল্পনা একসঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্বারোপ করতে হবে। এলএনজি আমদানি অবকাঠামোর বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাও গড়ে তোলা দরকার। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দেশীয় উৎপাদন, জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং ঝুঁকিতে থাকা শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই টেকসই জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: গবেষণা ও মিল কর্মকর্তা, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক




