প্রাণপ্রকৃতি রক্ষায় মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা

প্রকৃতি আল্লাহর সৃষ্টির এক অপূর্ব নিদর্শন। আকাশ, মাটি, পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, ফুল, পাখি ও জীবজন্তু শুধু মানুষের ব্যবহার্য সম্পদ নয়; এগুলো আল্লাহর কুদরতেরও নিদর্শন ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের অপরিহার্য অংশ। পবিত্র কোরআন মানুষকে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আল্লাহর মহত্ব উপলব্ধি করতে আহ্বান জানিয়েছে। আর মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, প্রাণীর প্রতি মমতা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন। তিনি প্রকৃতিকে শুধু সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় হিসেবে না দেখে সেগুলো আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখতে শিখিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি দিতে আহ্বান করে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০) মহানবী (সা.)-এর জীবনেও প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়।
মদিনার উহুদ পাহাড় সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এটি এমন একটি পাহাড়, যে আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও তাকে ভালোবাসি।’ (বুখারি, হাদিস: ২৮৮৯) একটি পাহাড়ের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কের এমন ভাষা মানুষের প্রকৃতিবোধে নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করে।
বৃক্ষরাজি প্রকৃতির অন্যতম উপাদান। ইসলাম বৃক্ষরোপণকে পরিবেশগত দায়িত্বের পাশাপাশি ইবাদতের মর্যাদাও দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে অথবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি কিংবা পশু খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
এই হাদিসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একটি গাছ মানুষের ফলের চাহিদা পূরণ করবে, পাখিকে খাদ্য দেবে, পশুকে আশ্রয় দেবে, ছায়া দেবে এবং পরিবেশে প্রাণ ফিরিয়ে আনবে। এর প্রতিটি উপকারের সঙ্গে একজন মানুষের আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃতির কল্যাণে করা কাজ মানুষের মৃত্যুর পরও তার জন্য সওয়াবের ধারাবাহিক উৎস হয়ে থাকতে পারে।
প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপ্রয়োজনীয় ধ্বংস থেকে বিরত থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করেছিলেন এবং সেখানে শিকার করা ও গাছপালা কাটার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। সহিহ মুসলিমে মদিনার হারাম সম্পর্কিত হাদিসে এসেছে, সেখানে শিকার করা এবং গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (মুসলিম, হাদিস: ১৩৬৩)।
এটি প্রমাণ করে যে, পরিবেশ সংরক্ষণ কোনো আধুনিক ধারণা নয়। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নবীজি (সা.) একটি নগরীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
প্রকৃতির প্রতি নবীজির (সা.) ভালোবাসার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকের একটি হলো প্রাণীদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ। তিনি প্রাণীকে শুধু মানুষের অধীন বস্তু হিসেবে দেখেননি; বরং তাদেরও আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে যত্ন নিতে শিখিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই পুণ্য রয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩) অন্য এক হাদিসে এসেছে, একটি বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার-পানি না দেওয়ার কারণে এক নারী শাস্তি পেয়েছিল। (বুখারি, হাদিস: ২৩৬৫) আরেক বর্ণনায় এসেছে, একবার একটি পশুর মুখে দাগ দেওয়া অবস্থায় দেখে নবীজি (সা.) বললেন, যে ব্যক্তি একে দাগ লাগিয়েছে, আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করুন। (মুসলিম, হাদিস: ২১১৭) এসব হাদিসে প্রমাণিত হয়, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ইসলামে শুধু অমানবিকই নয়; মারাত্মক গুনাহও।
প্রকৃতি রক্ষায় পানির আবশ্যকতা অপরিহার্য। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) পানির অপচয় দৃঢ়ভাবে নিষেধ করেছেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে (রা.) ওজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এ কেমন অপচয়?’ সাদ (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ওজুতেও কি অপচয় হয়? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, তুমি যদি প্রবহমান নদীর তীরেও থাকো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)
পবিত্র কোরআনেও অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১) ফলে পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার থেকে বিরত একজন মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই পুণ্য রয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)
প্রকৃতির প্রতি নবীজির (সা.) দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে কোরআনের পরিবেশনীতির শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে এসেছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে।’ (সুরা রূম, আয়াত: ৪১) অন্য আয়াতে এসেছে, ‘পৃথিবীতে তার সংস্কারের পর বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৬)
এই আয়াতগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করার অধিকার মানুষের নেই। মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়, মানুষ শুধু দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচরণ সেই দায়িত্বশীলতার বাস্তব রূপ।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, জলাশয়দূষণ, জীববৈচিত্র্য ক্ষয়ের মতো নানা ধরনের পরিবেশগত সংকটে আক্রান্ত আজকের বিশ্ব। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার ফল ভোগ করছে মানুষসহ অসংখ্য প্রাণী।
এমন সময়ে নবীজি (সা.)-এর প্রকৃতিবোধ আমাদের সামনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শন তুলে ধরে। যে দর্শনের মৌলিক উপলব্ধি হচ্ছে পৃথিবী আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষ তার দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। মানুষ প্রকৃতি থেকে উপকৃত হতে পারবে; কিন্তু প্রকৃতি বিনষ্ট করতে পারবে না।
তাই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা শুধু সৌন্দর্য উপভোগের জন্য নয়, এটি একজন মুমিনের অন্যতম দায়িত্বও। গাছ লাগানো, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ, প্রাণীর প্রতি মমতা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে আল্লাহর দেওয়া এই আমানত রক্ষা করা অবশ্যকর্তব্য। কারণ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে সুন্দর রাখা শুধু দায়িত্বই নয়; বরং আল্লাহর আমানতের যথাযথ হক আদায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
মহান আল্লাহ সবাইকে নবীর আদর্শের আলোকে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ভূমিকা রাখার তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক







