বন্যার পুনরাবৃত্তি নয় চাই টেকসই সমাধান

বাংলাদেশের ইতিহাসে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার প্রকৃতি ও তীব্রতা উদ্বেগজনকভাবে বদলে গেছে। একসময় বন্যা ছিল মৌসুমি ও সীমিত সময়ের প্রাকৃতিক একটি ঘটনা; এখন তা জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা ঢল, নদীর নাব্য হ্রাস এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে একটি জটিল জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বন্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই হতে হবে রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গীকার।
চলতি বর্ষা মৌসুমেও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, বহু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা অংশ নিলেও দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার এরই মধ্যে দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, চাল, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র চালু এবং উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে অভিজ্ঞতা বলে, ত্রাণের তাৎক্ষণিক সাড়া যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি জরুরি দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বন্যা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।
বাংলাদেশের বন্যা এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জলবায়ু পরিবর্তন অপরিকল্পিত উন্নয়ন নদী দখল এবং পরিবেশের অবক্ষয় এর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলছে
২০২২ সালে সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যায় প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৭০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। সড়ক, সেতু, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ বহু অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে টানা বর্ষণ, উজানের পানি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১০-১২ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি এবং ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শত শত আশ্রয়কেন্দ্র খুলতে হয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষকে জরুরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাঁধ ও স্লুইসগেট ভাঙনে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, দক্ষিণ চট্টগ্রামে (বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ) প্রায় ২০ হাজার টিউবওয়েল এবং ৫ হাজার ৬০০টির বেশি টয়লেট বন্যার পানিতে তলিয়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে বন্যার কারণে ২৯ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বাংলাদেশের বন্যা এখন আর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী দখল এবং পরিবেশের অবক্ষয় এর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য স্বল্পমেয়াদি ত্রাণব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড বন্যার ক্ষতি অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন— নদী দখল ও ভরাট করায় নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। খাল, বিল ও জলাধার ভরাট করে বসতি ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন উজাড়ের কারণে মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না, ফলে পাহাড়ি ঢল দ্রুত নিচু এলাকায় নেমে আসে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দিয়ে নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের বন্যার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বেড়েছে। হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, ফলে উজান থেকে বেশি পানি নেমে আসছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় বন্যা এখন আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। বন্যার ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। যেমন— নদী ও খাল নিয়মিত খনন এবং দখলমুক্ত করা। জলাভূমি সংরক্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বজায় রাখা। ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ। টেকসই বাঁধ ও আধুনিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ। আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। দুর্যোগ-সহনশীল ঘরবাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র ও সড়ক নির্মাণ। জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।
বাংলাদেশের প্রায় পুরো ভূপ্রকৃতিই নদীবাহিত বদ্বীপ। দেশের বড় অংশই বন্যাপ্রবণ সমভূমি। ফলে বন্যাকে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আমাদের সচেতনতাই আমাদের মুক্তির পথ।
আসুন সচেতন হই। নিজে বাঁচি, অন্যকে বাঁচার সুযোগ করে দিই।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাবি এবং সাবেক গবেষক, হোক্কাইডো ইউনিভার্সিটি, জাপান






