রুশোর কল্যাণরাষ্ট্র ও সুনীলের ট্যাক্সি ড্রাইভার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণতন্ত্রকে আমরা প্রায়ই একটি স্বতঃসিদ্ধ রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধরে নিই। কিন্তু গণতন্ত্রের ধারণা, তার সীমাবদ্ধতা এবং বিকল্প শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক সভ্যতার একেবারে শুরুর দিক থেকেই বিদ্যমান। সক্রেটিস জনমতনির্ভর শাসনব্যবস্থার প্রতি সন্দিহান ছিলেন। তিনি যে একটি কেন্দ্রীভূত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থাকে বেশি কার্যকর মনে করতেন।
সক্রেটিসের সেই সংশয় তার ছাত্র প্লেটোর চিন্তায় আরও কাঠামোবদ্ধ ও বিস্তৃত রূপ নেয়। প্লেটো যে রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্পনা করেছিলেন, সেখানে ব্যক্তি সমাজের মধ্যে মিশে থাকবে; কিন্তু শাসনক্ষমতা থাকবে অল্প কয়েকজনের হাতে। তবে প্লেটোর রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ক্ষমতাসীন সেই অল্প কয়েকজনের জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি এমনকি ব্যক্তিগত পরিবারব্যবস্থাও নিষিদ্ধ করেছিলেন। তার মতে, সম্পত্তির লোভ ও স্বার্থ সংঘাত সৃষ্টি করে, যা ন্যায়বিচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার রাষ্ট্রে তিনটি শ্রেণি ছিল। শাসক, রক্ষক এবং উৎপাদক। শাসক ও রক্ষক শ্রেণির ক্ষেত্রে সম্পত্তি ও পরিবার নিষিদ্ধ হলেও, উৎপাদক শ্রেণি যেমন কৃষক, কারিগর ও ব্যবসায়ীরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতে পারত। প্লেটো স্পষ্টভাবেই উৎপাদক বা ব্যবসায়ী শ্রেণিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর পক্ষপাতী ছিলেন না।
এই আদর্শবাদী কাঠামোর বিপরীতে প্লেটোর ছাত্র অ্যারিস্টটল ছিলেন অনেক বেশি বাস্তববাদী। তিনি ব্যক্তিমালিকানার পক্ষে ছিলেন এবং মনে করতেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি না থাকলে সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। তার মতে, সামাজিক মালিকানা অলসতার জন্ম দেয় যা সবার, তা আসলে কারোরই দায়িত্ব নয়।
অ্যারিস্টটলের এ পর্যবেক্ষণ আধুনিক যুগেও অনেক রাষ্ট্রনায়ক উপলব্ধি করতে পারেননি। এর একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার রাশিয়া ভ্রমণ নিয়ে একটি লেখায়। তিনি লেখেন শীতের রাত্রে মস্কোর রাস্তায় তিনি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়েও কোনো ট্যাক্সি ড্রাইভারকে গন্তব্যে যেতে রাজি করাতে পারছিলেন না। কারণ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় সব ট্যাক্সি ড্রাইভার সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা পায়। কাজেই শীতের রাত্রে দূরবর্তী গন্তব্যে যেতে চাওয়ার জন্য তার কোনো অতিরিক্ত প্রণোদনা নেই। কিন্তু সুনীলকে পথচলতি একজন তার ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেন কিছু রুবলের বিনিময়ে। সেই ব্যক্তির কাছে ওই অর্থ ছিল তার নিয়মিত আয়ের বাইরে একটি অতিরিক্ত প্রণোদনা।
মিলেমিশে সম্পত্তি ব্যবহার করার বিভ্রান্তিটি সম্ভবত রুশো বুঝেছিলেন। তিনি সম্পত্তিকে দেখেছেন প্যান্ডোরার বাক্স হিসেবে, যেখান থেকে সব নষ্টামির উৎপত্তি
অ্যারিস্টটল ব্যক্তিমালিকানার পক্ষে ছিলেন, তবুও তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজে মানুষ সম্পত্তি মিলেমিশে তা ব্যবহার করবে। এই মিলেমিশে সম্পত্তি ব্যবহার করার বিভ্রান্তিটি সম্ভবত রুশো বুঝেছিলেন। তিনি সম্পত্তিকে দেখেছেন প্যান্ডোরার বাক্স হিসেবে, যেখান থেকে সব নষ্টামির উৎপত্তি। এদিক থেকে রুশো অ্যারিস্টটলের চেয়েও বাস্তববাদী। তিনি এমন একটি সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে কেউ এত ধনী হবে না যে, সে অন্যকে কিনে নিতে পারে, আবার কেউ এত গরিব হবে না যে, তাকে নিজেকে বিক্রি করে দিতে হয়। আজ আমরা যে কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাকে আদর্শ হিসেবে দেখি, তার নৈতিক ভিত্তি অনেকটাই এখানেই।
এই দীর্ঘ চিন্তাধারার ভেতর দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, প্রাচীন বা আধুনিক কোনো বাস্তববাদী মতবাদই আসলে সব মানুষের জন্য সর্বদা সমান অধিকার বা সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার পক্ষে নয়। কেউ সম্পদ দিয়ে, কেউ শ্রম দিয়ে, কেউ জ্ঞান বা প্রজ্ঞা দিয়ে সমাজে অবস্থান নির্ধারণ করবে— এ বিভাজনকে অধিকাংশ চিন্তাবিদই স্বাভাবিক বলে মেনেছেন। কিন্তু বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন এ বিভাজনের সুযোগে একটি ক্ষুদ্র শ্রেণির হাতেই সব সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।
ইতিহাসে এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা প্রায় সবসময়ই সম্পদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। মিসরের ফারাও থেকে প্রাচীন চীনা, রোমান কিংবা গ্রিক সম্রাটরা শস্যাগার, সেচব্যবস্থা, সোনা ও রুপার খনির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগ করতেন। আধুনিক বিশ্বে তথ্যের প্রবাহ, পুঁজি, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও তার কাছেই কেন্দ্রীভূত হয়। এ ধরনের কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ থেকেই প্রথমে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম।
এই আধুনিক রূপটিকে ইউভাল নোয়া হারারি ব্যাখ্যা করেছেন একটি কেন্দ্রীভূত তথ্য-নেটওয়ার্ক হিসেবে। তার মতে, স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের প্রথম কাজই হলো তথ্য নিজেদের কুক্ষিগত করা এবং সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্রে নিয়ে আসা, যাতে মানুষের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই সর্বতন্ত্রবাদ। এখানে কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রায় দেবতুল্য করে তোলা হয়, যেন তারা ভুল করতেই পারে না। ফলে ভুল হলেও তা সংশোধনের কোনো পথ থাকে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঠিক উল্টোটা ঘটে। কেন্দ্র যদি ভুল করে, তবে স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচিত আইনসভা সে ভুল চিহ্নিত ও সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। এ কারণেই স্বৈরশাসকেরা এসব স্বাধীন ক্ষমতার কেন্দ্রকে হুমকি হিসেবে দেখে এবং ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে আধুনিক স্বৈরতন্ত্রে আদালত থাকে, সংসদ থাকে, এমনকি নির্বাচনও থাকে।
নির্বাচন সর্বোচ্চ এটা প্রকাশ করতে পারে যে, অধিকাংশ মানুষ কী চায়। কিন্তু তা সত্য না মিথ্যা, তা বলা যায় না। অধিকাংশ মানুষ কোনো কিছু চাইলেই তা সত্য হয়ে যায় না, তবে সেটার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। ফলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানগুলো বিশেষত নির্বাচন কতটা কার্যকর প্রভাবক হতে পারে, তা নতুন করে ভাবতে হয়। কারণ নিয়মিত নির্বাচন হলেও বাস্তব ক্ষমতা কোথায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে গণতন্ত্রের প্রকৃতি ও পরিণতি।
যদি গণতন্ত্রকে শুধু একটি বাহনের মতো দেখা হয়, যার গন্তব্য নির্ধারণ করেন চালক, তবে জনগণ যাত্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। তখন নির্বাচন থাকে কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না, আদালত থাকে কিন্তু স্বাধীনতা থাকে না, সংসদ থাকে কিন্তু কার্যকর জবাবদিহি থাকে না। এ ব্যবস্থায় গণতন্ত্র শুধু প্রক্রিয়া হিসেবে বেঁচে থাকে, কিন্তু চেতনা হিসেবে নিঃশেষ হতে শুরু করে। কিন্তু যদি জনগণই গন্তব্য নির্ধারণের অধিকারী হয় এবং চালকের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, তবেই গণতন্ত্র তার অর্থবহ রূপ লাভ করে।
লেখক: প্রাবন্ধিক




