ভূমি দখলবাজির রাজনৈতিক অর্থনীিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বস্তুগত লাভের আশায় মানুষ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়; কিন্তু এগুলোর সঙ্গে অনেক সময় দুর্নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িত থাকে। উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ, ও বিনিয়োগসহ যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, এখানে ভূমির বণ্টন ঘটে থাকে জমি হস্তান্তর ও ভূমি দখল উভয় পন্থায়। ক্ষমতাবানদের জোরপূর্বক জমি দখলবাজি পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার উদ্যোগের বিরুদ্ধে কাজ করে, যার বিরূপ প্রভাব দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির ওপর পড়ে।
ভূমি দখলে যে প্রক্রিয়া ও কৌশল অনুসরণ করা হয় সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পেশিশক্তি ও সহিংসতার প্রয়োগ এবং দুর্নীতি ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় অনৈতিকতার সঙ্গে এর সম্পর্কটি পরিষ্কার। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের ভূমিকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভূমির অধিকার প্রদান ও তার পুনর্বণ্টনের ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রেরই আছে, কিন্তু সেখানেও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল প্রভাব বিস্তার করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্যমূলক ও অন্যায়ভাবে বিশেষ কিছু ব্যক্তি, শ্রেণি, সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশে বহু দশক ধরে ভূমি দখলের প্রক্রিয়া চলমান আছে। লাঠিয়ালদের ব্যবহার করে চর দখলের ঘটনা তো দেশের ইতিহাসেরই অংশ। তা ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করে ভূমি অধিগ্রহণ এবং বিত্তশালীদের দ্বারা দরিদ্র কৃষকের বন্ধকি জমি কুক্ষিগত করার প্রবণতাও বেশ প্রাচীন।
বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অনেক স্থানীয় ও অস্থানীয় সত্তা ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত। সরকারি দখলবাজদের মধ্যে থাকে সরকারি সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী, উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদি। অন্যদিকে, বেসরকারি সত্তাগুলোর মধ্যে আছে স্থানীয় ও বিদেশি কোম্পানি, ব্যক্তি খাতের সংগঠন, এনজিও এবং বিভিন্ন শ্রেণি ও জাতিগত গোষ্ঠীর ক্ষমতাশালীরা। আজকের বাংলাদেশে এই দখল-প্রক্রিয়া সর্বব্যাপী। শক্তিশালী সংগঠন ছাড়াও গ্রাম ও শহরে ক্ষমতাবান প্রতিবেশীরাও দরিদ্র ও সংখ্যালঘুদের জমি দখলে তৎপর থাকে।
গবেষক স্বপন আদনানের মতে, ভূমি দখলকে চারটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায়। এগুলো হলো: (ক) শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সরাসরি দখল; (খ) শক্তি প্রয়োগ করে পরোক্ষভাবে দখল; (গ) শক্তি প্রয়োগ না করে সরাসরি দখল এবং (ঘ) শক্তি প্রয়োগ না করে পরোক্ষভাবে দখল। নিরাপত্তার অজুহাতে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক দখল এবং ব্যক্তি খাতের সংগঠন দ্বারা দখল প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় শ্রেণির দখলবাজরা হলো কৃষিজ ব্যবসা এবং চিংড়ি ও মৎস্য চাষে জড়িত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। সহিংসতার মাধ্যমে সামাজিকভাবে দুর্বল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করার মাধ্যমেও এটা ঘটে। তৃতীয় শ্রেণিতে আছে মালিককে না জানিয়ে অথবা মীমাংসা বা বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমি দখল করা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত জমির লিজ-গ্রহণ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে জমির নিবন্ধন। চতুর্থ শ্রেণির উদ্ভব ঘটে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হতে, যখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে বাড়ি বা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
ভূমি-সম্পর্কিত বিবাদে জড়িত সব পক্ষই তাদের অবস্থানকে সঠিক মনে করে এবং সেই অনুযায়ী আইনি ও বেআইনি পন্থায় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত হয়
জমি দখলের প্রক্রিয়া ও কৌশলে প্রায়ই অনৈতিক আচরণ পরিলক্ষিত হয়। বিশেষত জালিয়াতি, দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ভূমি দখলের ক্ষেত্রে কথাটা বেশি প্রযোজ্য। তা ছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকায়ও এই অনৈতিকতা দৃশ্যমান হয়। বলা হয় যে ‘জনস্বার্থে’ ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, কিন্তু সরকারি আচরণের অসংগতি পরিষ্কার হয়ে ওঠে যখন জমিটা ব্যক্তি খাতের মুনাফাকামী পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিরাপত্তার কারণে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো বিশেষ কোনো নৃগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য দেখা যায়, যেটা অনৈতিক এবং সংবিধানে বর্ণিত সমতার মূলনীতির পরিপন্থী। তা ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় দলীয় ক্যাডাররা যখন জমি দখল করে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক সময় সঠিক ও বেঠিকের পার্থক্যটা ভুলে যায়। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন দেখিয়েও ব্যক্তি খাতের বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও কোম্পানি ভূমি দখল করে থাকে। ক্ষমতার দৌরাত্ম্যের কাছে তখন সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে একদম অসহায়।
মজার ব্যাপার হলো, ভূমি-সম্পর্কিত বিবাদে জড়িত সব পক্ষই তাদের অবস্থানকে সঠিক মনে করে এবং সেই অনুযায়ী আইনি ও বেআইনি পন্থায় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত হয়। এসব কারণে ভূমি-সম্পর্কিত বিরোধ বিশ্লেষণের সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ছাড়াও সামাজিক, নৈতিক ও আদর্শিক প্রেক্ষিত বিবেচনা করাটা বাঞ্ছনীয়। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিতে পারে। তা ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র, সমাজ, সম্প্রদায় ও শ্রেণিসমূহের ক্ষমতা কাঠামো নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে।
তবে এটা পরিষ্কার, দেশে যে প্রক্রিয়া, পন্থা ও কৌশলে জমি দখল করা হয় তাতে নৈতিকতার সীমা বারবার লঙ্ঘিত হয়। এক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সংগঠন কর্তৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করে, আর আইন ও নৈতিকতাকে সমুন্নত রাখার পরিবর্তে সরকারি কর্মচারীরা প্রায়ই অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেয়।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব



