মোদি কি সত্যিই চাপে

ক্ষমতার করিডরে যত দীর্ঘ সময় কাটে, ততই শাসনের গায়ে শ্যাওলা জমে
গণতন্ত্রের সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে স্বাভাবিক রাজনৈতিক নিয়মটির নাম অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা যেকোনো সরকারের বিরুদ্ধে একসময় মানুষের মনে প্রশ্ন জমে, প্রত্যাশা ও বাস্তবের ফারাক বাড়ে, আর সাফল্যের পাশে জমতে থাকে ক্ষোভের হিসাব। শাসকের কৃতিত্ব তখন আর একমাত্র রাজনৈতিক মূলধন থাকে না; বরং সেই কৃতিত্বকেই নতুন প্রত্যাশার মানদণ্ড বানিয়ে মানুষ বিচার করতে শুরু করে। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতার করিডরে যত দীর্ঘ সময় কাটে, ততই শাসনের গায়ে শ্যাওলা জমে। নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির সরকারও সেই চিরন্তন রাজনৈতিক সূত্রের ব্যতিক্রম নয়।
২০১৪ সালে তিনি যখন দিল্লির মসনদে বসেন, তখন ভারত এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চলছিল। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একের পর এক অভিযোগ, নীতিগত অচলাবস্থা, মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। সেই ক্ষোভই অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির শক্তিশালী ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়েছিল কংগ্রেস সরকারের ওপর।
উন্নয়ন, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ— এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয়েছিল ব্র্যান্ড মোদি। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান মন্ত্রে যিনি রাষ্ট্রকে শুশ্রূষা করতে পারবেন। তার অতীত নিয়ে বিতর্ক ছিল। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার ছায়া তখনো তার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু বিজেপি সেই বিতর্ককে ছাপিয়ে সামনে নিয়ে এসেছিল গুজরাটের শিল্পোন্নয়ন, অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গল্প। ভারতীয় ভোটাররা সেই আখ্যানকে গ্রহণ করেছিলেন। ফলাফল, কংগ্রেস স্বাধীনোত্তর ইতিহাসের অন্যতম খারাপ ফল করে এবং বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
তারপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে— ২০১৪ সালের সেই অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক ব্র্যান্ড কি এখনো একই রকম অটুট? সম্ভবত না। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিয়েছে। বিজেপি বৃহত্তম দল হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এনডিএর শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয়েছে। অস্বীকার করা কঠিন যে, দীর্ঘ শাসনের প্রভাব তার জনপ্রিয়তার ওপর পড়তে শুরু করেছে।
এর কারণও রয়েছে। বেকারত্ব আজও জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয়। মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ, জ্বালানির দাম, কৃষিক্ষেত্রের অসন্তোষ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য— এসবই সরকারের সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ডলারের তুলনায় টাকার দুর্বলতা এবং প্রবৃদ্ধির গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এ আবহেই সামনে আসে নিট পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক। দেশের চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশের একমাত্র সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী এবং তাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। একটি প্রবেশিকা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়া মানে শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; তা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাকেও নাড়িয়ে দেয়। ফলে ছাত্রদের রাস্তায় নামা ছিল অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত।
কোনো আন্দোলন জনমত তৈরি করতে পারে, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে হলে মানুষের সামনে এমন একটি রাজনৈতিক বিকল্প রাখতে হয়, যার ওপর তারা ভবিষ্যৎ সঁপে দিতে প্রস্তুত
বিরোধী দলগুলো এই ক্ষোভকে স্বাভাবিকভাবেই জনমত তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। একই সঙ্গে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও আন্দোলনের মধ্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করে। ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথাও শোনা যেতে থাকে।
কিন্তু রাজনীতির একটি অলিখিত নিয়ম হলো— সংকট যত গুরুত্বপূর্ণ, সংকট মোকাবিলার কৌশলও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এ জায়গায় কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত রাজনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটে। পরীক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করা, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির কাঠামোগত সংস্কারের ঘোষণা, নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি করে দ্রুত পুনরায় পরীক্ষা আয়োজন এবং দ্রুত ফল প্রকাশ— একটির পর একটি পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার বোঝাতে চায় যে, সংশোধনের পথেই তারা হাঁটছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। প্রশাসনিক দায় স্বীকার করে তার সরে দাঁড়ানো ছিল একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। এর মাধ্যমে সরকার একদিকে ছাত্রদের ক্ষোভের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দাবিকেও কার্যত মেনে নিয়েছে। এই পদক্ষেপ নিছক নৈতিক দায়বদ্ধতা ছিল, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল— তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।
ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় স্তরের আন্দোলন নতুন নয়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), কৃষক আন্দোলন, অগ্নিবীর ইস্যুতে উত্তাল পরিস্থিতি হোক বা কুস্তিগিরদের বিদ্রোহ— গত এক দশকে একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র জনবিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু রাজপথের উত্তাপ সবসময় ভোট বাক্সের রায়ে একই মাত্রায় প্রতিফলিত হয় না।
বিজেপি এবারও আন্দোলনকে শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখেনি, দেখেছে রাজনৈতিক ন্যারেটিভের লড়াই হিসেবেও। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে ধারাবাহিক পদক্ষেপে সরকার আন্দোলনের মূল ইস্যুটিকেই অনেকাংশে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলতে সক্ষম হয়েছে বলে তাদের রাজনৈতিক কৌশলবিদদের ধারণা।
কিন্তু বিজেপির একাংশের বক্তব্য, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার নেপথ্যে যেমন আন্তর্জাতিক অর্থপুষ্ট নেটওয়ার্ক, তথ্যযুদ্ধ এবং সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, তেমনি ভারতের ক্ষেত্রেও বিদেশি প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। নেপাল, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে এই যুক্তি সামনে আনা হয়। এই দাবির পক্ষে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ সামনে আসেনি। বিরোধীরা একে নিছক রাজনৈতিক প্রচার বলেই উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে বাস্তবের পাশাপাশি ন্যারেটিভও সমান শক্তিশালী অস্ত্র।
এই বয়ানের আরও একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে যদি বিদেশি প্রভাব, রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত কিংবা তথ্যযুদ্ধের প্রসঙ্গ জুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রই বদলে যায়। আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং সাংগঠনিক ষড়যন্ত্রের প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে কলকাতার কয়েকটি আন্দোলন ঘিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ এবং ভাঙচুরের ঘটনাও বিজেপির রাজনৈতিক সুযোগ দেয়। শাসকদলের বক্তব্য ছিল, শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে চরমপন্থী বা মৌলবাদী প্রবণতার অনুপ্রবেশ ঘটছে। এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনাপ্রবাহকে সামনে রেখে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সরকার নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিজেপির ছাত্রসংগঠন এবিভিপি অবিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শিক্ষামন্ত্রীদের জবাবদিহির দাবিতে পাল্টা আন্দোলনের পথেও হাঁটতে পারে। অর্থাৎ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও স্পষ্ট।
তবে এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা সম্ভবত অন্যত্র। ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তবু তিনি মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে। এর ফলে বিজেপি অন্তত এই দাবি করার সুযোগ পেয়েছে যে, ভুল হলে দায় স্বীকার করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধীদের অতীতও তাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কংগ্রেস আমলে বিভিন্ন নিয়োগ ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিতর্কের অভিযোগ উঠেছিল। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের ঘটনাও বিরোধীদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। ফলে জবাবদিহির প্রশ্নে সরকারকে আক্রমণ করতে গিয়ে বিরোধীদের নিজেদের অতীতও বারবার ফিরে এসেছে।
অবশ্য এসবের অর্থ এই নয় যে, মোদি সরকারের সামনে আর কোনো সংকট নেই। বরং উল্টোটা সত্য। কিন্তু গণতন্ত্রে শুধু শাসকের দুর্বলতা যথেষ্ট নয়, বিকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আন্দোলন জনমত তৈরি করতে পারে, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে হলে মানুষের সামনে এমন একটি রাজনৈতিক বিকল্প রাখতে হয়, যার ওপর তারা ভবিষ্যৎ সঁপে দিতে প্রস্তুত।
আন্দোলন রাজনৈতিক পুঁজি তৈরি করতে পারে, কিন্তু আস্থা তৈরি করে না। আপাতত সমীকরণ বলছে, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেমন বাস্তব, তেমনি বিরোধীদের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটও বাস্তব। এই দুই বাস্তবতার সংঘর্ষই সম্ভবত ২০২৯ সালের ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠবে।
লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক ও কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট





