অঙ্গীকার ও আন্তরিকতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক দিন আগে পৃথিবীর বড় বড় নগরীর বাসযোগ্যতা নিয়ে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) একটি সূচক প্রকাশ করেছে। এই সূচকে জরিপকৃত ১৭৩টি নগরের মধ্যে ঢাকার স্কোর ১০০ নম্বরের মধ্যে ৪২ এবং অবস্থান ১৭১। এতে ঢাকার নিচে অবস্থান নিয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত মাত্র দুটি নগর— দামেস্ক ও ত্রিপোলি। এর আগে ২০২২ ও ২০২৪ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল যথাক্রমে ১৬৬ ও ১৬৮; নিচের দিক থেকে র্যাংক ছিল যথাক্রমে সপ্তম ও ষষ্ঠ। এবারকার অর্জন তৃতীয় স্থান। গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, ঢাকার নিচে অবস্থিত নগর দুটিতে গৃহযুদ্ধ না থাকলে এ মহানগরী এবারই প্রথম স্থান দখল করে ফেলত। উন্নতিতে সবাই গর্ববোধ করে থাকে, কিন্তু ঢাকার এই ক্রমোন্নতি দুঃখের ও লজ্জার।
নগরসভ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না, এটিকে পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা দিয়ে গড়ে নিতে হয়। নগরে জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে যেমন ক্রমবর্ধমান হারে আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলে; তেমনি সেখানে নতুন নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয় এবং নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ইআইইউ যে নগরীগুলোর তুলনামূলক বাসযোগ্যতার সূচক তৈরি করে, সেখানে তারা মোটাদাগে পাঁচটি মানদণ্ড বিবেচনায় নেয়। এগুলো হলো— স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো।
বিভিন্ন আর্থসামাজিক পটভূমি ছেড়ে মানুষ যখন গ্রামাঞ্চল থেকে মহানগরীতে আসে, তখন সে নিজের ব্যক্তি-পরিচয় হারিয়ে ফেলে। শহরে কর্মের সুযোগ বেশি থাকলেও বিরাজমান চরম আর্থিক বৈষম্য অনেককেই হতাশাগ্রস্ত করে ফেলে। ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়; অপরাধ প্রবণতা ও অস্থিরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে ঢাকায় এই অপরাধ প্রবণতা কোথায় চলে গিয়েছে, প্রতিদিনের সংবাদপত্র তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
শহরাঞ্চলে ঘনবসতির কারণে মানুষ অপরিসর জায়গায় বসবাস করতে বাধ্য হয়। কিন্তু আয় তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তার ভোগও বেড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণও বেড়ে যায়। সময়মতো বর্জ্য নিষ্পত্তি না করা গেলে তা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক এক হুমকি তৈরি করে। বর্তমানে ঢাকা যে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, তার পেছনে বেশি অবদান রাখছে বর্জ্য অপসারণ ও নিষ্পত্তিতে সিটি করপোরেশনের শিথিলতা এবং আঙিনা পরিচ্ছন্নকরণে নাগরিকদের উদাসীনতা।
শহরে বসবাসকারী নাগরিকদের বসবাস ও যাতায়াতের জন্য দক্ষ অবকাঠামো যেকোনো নগরের প্রাণভোমরা। সর্বশেষ জরিপে এই সূচকে ঢাকা পেয়েছে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৭।
ইআইইউ যে নগরীগুলোর তুলনামূলক বাসযোগ্যতার সূচক তৈরি করে, সেখানে তারা মোটাদাগে পাঁচটি মানদণ্ড বিবেচনায় নেয়। এগুলো হলো— স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো
ঢাকায় রাস্তা এমনই মহাযানজটে আক্রান্ত। গত দেড়-দুই দশকে স্বজনতোষণ নীতি-পুষ্ট কর্ম-বন্ধ্যা উন্নয়নের জোয়ারে ঢাকায় অনেক বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু বহুতল ভবনের নিবাসীদের যাতায়াতের জন্য যে বহুতল রাজপথ ও সড়ক নির্মাণ করা প্রয়োজন, সেটি কর্তৃপক্ষ ভুলে গেছেন; জনপথ ও সড়ক দশকের পর দশক অপরিবর্তিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হালে যে মেট্রোরেল চালু হয়েছে, সেটি প্রয়োজনের তুলনায় সিন্ধুতে বিন্ধুর মতো। এই একদেশদর্শী উন্নয়ন মডেলে যানজট প্রকট আকার ধারণ করা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।
ঢাকার অধিকাংশ জনপথ উত্তর-দক্ষিণমুখী; পূর্ব-পশ্চিমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে অনেক ঘুরেফিরে যেতে হয়। তাতে সময় ও খরচ অনেক বেড়ে যায়। আবার রুটভিত্তিক বাস চলাচল সমন্বিতভাবে সম্পন্ন হয় না; হয় মালিকানার ভিত্তিতে আলাদাভাবে। ফলে বাসগুলো রাজপথে চলাচলের সময় অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এতে অনেক দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়। দু-একবার সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা টেকসই করা যায়নি। অবস্থা এখন পুনঃমূষিক ভব!
মহানগরে তাপদ্বীপের প্রভাব মোকাবিলা, বায়ুদূষণকারী পদার্থ পরিশোধন ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সবুজ স্থানের ভূমিকা অপরিহার্য। তা ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক মেলামেশার জন্য সবুজ স্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জনপ্রতি অন্যূন ৯ বর্গমিটার সবুজ স্থানের সুপারিশ করেছে। তাদের অভিমত, একটি নগরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ ভূমি সবুজ স্থানের জন্য নির্ধারিত থাকা উচিত। কিন্তু এই মানদণ্ডে ঢাকার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালে ঢাকা মহানগরীতে ১২ হাজার ৭৪৫ হেক্টর ভূমিতে গাছপালা বিরাজমান ছিল। কিন্তু ২০২০ সালে এই ভূমির পরিমাণ ৫ হাজার ৫৯৯ হেক্টরে নেমে আসে। ২০২১ সালে মহানগরীতে মোট সবুজ স্থানের হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশ (দি ডেইলি স্টার, ২৩-৫-২০২৩)। অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে এ অবস্থা অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
একসময় ঢাকা নগরী ছিল পঞ্চ নদী (বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, ধলেশ্বরী ও তুরাগ) পরিবেষ্টিত এবং অসংখ্য খাল দ্বারা বিভক্ত এক পরিবেশবান্ধব শহুরে জনপদ। ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভের সময় (১৮৮০-১৯৪০) ঐতিহাসিক ঢাকায় প্রায় ১৭৫টি খালের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ১৯৮০-১৯৯০ সালের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা ও পরিবেশকর্মীদের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মহানগরীর অন্তত ৫৪ থেকে ৫৮টি খাল পয়ঃনিষ্কাশনের কাজ করত (দি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৫)। এখন অফিসিয়াল রেকর্ডে মাত্র ২৬টি খালের হিসাব রয়েছে। তবে এসবের অধিকাংশই এখন হয় ভূমিদস্যুর দ্বারা আংশিক অথবা সম্পূর্ণরূপে বেদখল হয়ে আছে।
নগরীর পয়ঃনিষ্কাশন, বৃষ্টির পানি অপসারণ, অভ্যন্তরীণ পরিবহন সহজীকরণ, নগরীর সবুজীকরণ, পরিবেশ শীতলীকরণ, সৌন্দর্যবর্ধন ও জলীয় আধার গড়নে খালের ভূমিকা অপরিসীম। ভেনিস, আমস্টারডাম, ব্যাংকক, সেন্ট পিটার্সবার্গ নগরীতে খাল যেভাবে মানুষ ও পরিবেশকে সেবা ও সৌন্দর্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটি যেকোনো মানুষকেই মুগ্ধ করবে। আজ সামান্য বৃষ্টিপাতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী বন্যায় আক্রান্তের মতো অবস্থায় উপনীত হয়। আবার কোথাও আগুন লাগলে আশপাশে পানির আধার পাওয়া যায় না; দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে সংগ্রহ করে আনতে আনতে ধ্বংসযজ্ঞ পূর্ণতা পায়। খালের মাধ্যমে সহজে ও সস্তায় পণ্য ও মানব পরিবহন সম্ভব হয়। নগরের প্রাণ ও পরিবেশের সুরক্ষা হয়। খাল পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান, মৎস্য চাষ এবং পর্যটনেরও সহায়ক।
ঢাকার শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ এখন মারত্মক পর্যায়ে চলে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত শব্দদূষণের মাত্রা যেখানে ৬০ ডেসিবেল, সেখানে ঢাকায় এর গড় মাত্রা ৮০ থেকে ১২০ ডেসিবেল। ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স প্রায়ই ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে ওঠানামা করে। ঢাকার বাতাস সূক্ষ্ম বিষাক্তকণায় (পিএম ২.৫) ভরপুর; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সীমা থেকে প্রায় আট গুণ বেশি। রাস্তাঘাটে অনুপযুক্ত যানবাহন চালন, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কর্ম পরিচালন, যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণ, সড়ক ও জনপথ বেদখল, উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অসমন্বিত কার্যক্রম পরিচালন এ অবনতিতে ভূমিকা রাখছে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়াদা করেছে, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা বিনির্মাণ করা হবে। সেখানে সব শ্রেণির নাগরিকের জন্য পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলে এবং সেকেন্ডারি সিটি নির্মাণ করে ঢাকার ওপর থেকে চাপ কমানো হবে। সেখানে আরও আছে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং ঢাকার চতুর্দিকে বৃত্তাকার নৌপথ ও রিং রোড গড়ে তোলার ওয়াদা। প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সিটিতে নাগরিকদের সব সেবাদান নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও সেখানে উল্লেখ আছে।
সরকার দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে জিডিপির গড়পড়তা ৮০ শতাংশ পণ্য ও সেবা শহরগুলোতেই উৎপন্ন হয়েছে। এ সময় বেসরকারি খাতের ৮৮ শতাংশ কর্মসৃজন হয়েছে শহর ও নগরে (টিবিএস, ৮-৭-২০২৬)। কাজেই ঈপ্সিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য শহর ও নগরগুলোকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় চৌকস করে গড়ে তুলতে হবে। আশা করি, সরকার তার ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিকতার পরিচয় দেবে।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য অধিদপ্তর ও কলামিস্ট





