জনস্বাস্থ্য, মানবিক সেবা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজও নানা সংকটের মুখোমুখি। একটি দেশের স্বাস্থ্য খাত কতটা শক্তিশালী, তা কেবল আধুনিক প্রযুক্তি বা বড় অট্টালিকা দিয়ে মাপা যায় না। আসল শক্তি হলো সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানবিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সরকারি হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়, শয্যা ও চিকিৎসকের ঘাটতি এবং চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচের কথা বিবেচনা করলে বেসরকারি খাতের অবদান অস্বীকার করা যায় না। এক্ষেত্রে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তেমনই একটি নাম। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প খরচে মানসম্মত সেবা, চিকিৎসা-শিক্ষা ও মানবসেবা দিয়ে জনস্বাস্থ্যে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে।
তবে সম্প্রতি হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা দেশ জুড়ে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই বেদনাদায়ক ঘটনায় আদ্-দ্বীনের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চরম অবহেলা ও প্রশাসনিক ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরকারি তদন্তের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে। এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনায় ছয়টি পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার দায় কোনোভাবেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। এমন দুর্ঘটনা চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের নিরাপত্তা বোধ ও আস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, হাসপাতাল আর অন্য দশটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাঠামোগত এবং সেবা প্রদানের ধরনগত পার্থক্য রয়েছে। কেউই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে যেমন নয়, তেমনি কোনো একটি ভুলের খেসারত দিতে হলে তার মাত্রা কতটা হবে, কারা সেই দায় বহন করবে ইত্যাদিও বিবেচনায় নিতে হয়।
এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে শুধু চিকিৎসাসেবাই থমকে যায়নি, মারাত্মক সংকটে পড়েছেন আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকায় ইন্টার্ন ও এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা ও ক্লিনিক্যাল ট্রেইনিং পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাজীবন আজ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে। চিকিৎসা-শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে শেষ পর্যন্ত তার খেসারত পুরো দেশকেই দিতে হয়।
সেবা চালু থাকা হাসপাতালগুলো হুট করে বন্ধ না করে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ
হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এখানে সেবা নিয়েছেন ১ কোটি ৫৭ লাখের বেশি মানুষ। এই সময়ে ২০ লাখের বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারী সেবা পেয়েছেন। হাসপাতালটিতে প্রসব হয়েছে তিন লাখ তিন হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার ছিল স্বাভাবিক প্রসব। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ছোট-বড় অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে আদ্-দ্বীনের অবদান উল্লেখযোগ্য। এখানে ১০১ শয্যার এনআইসিইউ রয়েছে, যেখানে ২০১০ সাল থেকে ৩০ হাজারের বেশি নবজাতক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পেয়েছে।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই হাসপাতালের সেবা অত্যন্ত দরকারী। ওষুধসহ সিজারিয়ান অপারেশনের খরচ এখানে মাত্র ১০ হাজার ৮০০ টাকা। ভর্তি রোগীদের চিকিৎসক ভিজিট ও খাবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক প্রসবের খরচ ৪ হাজার ৫০০ টাকা আর দরিদ্রদের জন্য তা মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা। শিশু ওয়ার্ডের ৬৬টি শয্যা এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ১৫টি শয্যা একেবারে বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৫০০টি প্রোস্টেট ও ৫০০টি ফিস্টুলা অপারেশন করা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি মানুষ মাত্র ২২০ টাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পান।
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও নারী ক্ষমতায়নে প্রতিষ্ঠানটির বড় ভূমিকা রয়েছে। ১ হাজার ৭৯০ জন কর্মীর মধ্যে ১ হাজার ৪৮০ জনই নারী। এ ছাড়া নারী রোগীদের গোপনীয়তা ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রয়োজনে নারী রোগীর অস্ত্রোপচারে নারী সার্জন ও নারী অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করা হয়।
এখানে একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যি ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে ভুগছে। অন্যদিকে, পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় এ দেশে চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি। এ পরিস্থিতির জন্য দেশের এখন পর্যন্ত সব সরকারের দায় রয়েছে। তবে গত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকার দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল। তারা আমাদের রোগীদের ভারত-নির্ভর করে তুলেছিল। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় দেশের চিকিৎসা খাতের করুণ দশা আমাদের সামনে চলে এসেছিল। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশকে চিকিৎসায় স্বনির্ভর হতে হবে। তাই সেবা চালু থাকা হাসপাতালগুলো হুট করে বন্ধ না করে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই আসল বুদ্ধিমানের কাজ।
একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থমকে গেলে তার প্রভাব হয় বহুমাত্রিক। তবে এটিও স্পষ্ট, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হতে হবে। তদন্তে প্রমাণিত অবহেলার দায় অবশ্যই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কিন্তু একটি মর্মান্তিক ঘটনা বা ভুলের কারণে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের দীর্ঘদিনের হাজারো ভালো কাজ, মানবিক অবদান এবং বিশাল জনসেবাকে এক নিমেষে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা কখনোই সমীচীন নয়।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাবি এবং সাবেক গবেষক, হোক্কাইডো ইউনিভার্সিটি, জাপান।




