দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায় নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণের বিনিময় ছাড়া কিংবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩২) আয়াতটি মানুষের জীবনের অসামান্য মূল্য তুলে ধরেছে। তাই মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩) এই হাদিসের শিক্ষা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত। চালকের দায়িত্ব নিরাপদে গাড়ি চালানো, পরিবহন মালিকের দায়িত্ব উপযুক্ত যানবাহন ও দক্ষ চালক নিশ্চিত করা আর ভবন বা রিসোর্টের মালিকের দায়িত্ব প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা। একইভাবে জননিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব হলো নিয়ম বাস্তবায়ন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দায়িত্বের এই স্তরগুলো আলাদা হলেও প্রত্যেকের জবাবদিহির মূলনীতি একই।
সড়কে বাসের সংঘর্ষ, আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ড কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে আগুন লেগে প্রাণহানি— প্রতিটি ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কেউ হারান সন্তান, কেউ জীবনসঙ্গী, কেউবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। কিছুদিন চলে আলোচনা, আসে তদন্তের আশ্বাস, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দেওয়া হয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি। তারপর সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে পুরনো শোককে আড়াল করে দেয় নতুন কোনো ঘটনা। কিন্তু যে প্রশ্নটির উত্তর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা অনেক সময়ই অমীমাংসিত থেকে যায়— এসব প্রাণহানির পেছনে কি শুধুই দুর্ঘটনা, নাকি কারও দায়িত্বহীনতা ও অবহেলাও দায়ী?
মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত। সেই জীবন রক্ষার দায়িত্ব ব্যক্তির, প্রতিষ্ঠানের ও রাষ্ট্রের; প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী সচেষ্ট হতে হবে
সম্প্রতি কক্সবাজারের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি এবং উত্তরবঙ্গে বাস দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যুর মতো ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। যেসব ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব, সেগুলো প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না? কোথাও কি নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল? দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কি সময়মতো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? যদি অবহেলা বা গাফিলতির কারণে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা আছে?
কোনো দায়িত্ব অবহেলা বা ব্যর্থতার কারণে প্রাণহানির সম্পর্ক পাওয়া গেলে তাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কিছুতেই নেই।
সব দুর্ঘটনা মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলতে দেওয়া, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি উপেক্ষা করা কিংবা জরুরি বহির্গমনপথ বন্ধ রাখার মতো বিষয় অবহেলা ও দায়িত্বে উদাসীনতারই প্রমাণ বহন করে। এসব ক্ষেত্রে অনুসন্ধান প্রয়োজন কার কী দায়িত্ব ছিল? দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন কি না? তা তদন্তে নির্ধারণ করা একান্ত আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০) এই হাদিস ইসলামি আইনশাস্ত্রে ক্ষতি প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে বিবেচিত। সেই নীতির আলোকে সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করা ও তা দূর করার উদ্যোগ দায়িত্বশীল ব্যক্তির কর্মপরিধির অংশ।
দুর্ঘটনার পর অনেক সময় বলা হয়, ‘তাকদিরে এটাই লেখা ছিল।’ নিঃসন্দেহে তাকদিরে বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। কিন্তু তাকদিরের দোহাই দিয়ে নিজের দায়িত্বে অবহেলার দায় এড়ানো যায় না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদেরকে নিজেদের হাতে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫) আয়াতটির মূল প্রসঙ্গ আল্লাহর পথে ব্যয়সংক্রান্ত হলেও এর মধ্যে আত্মবিনাশের পথ পরিহারের শিক্ষা রয়েছে। তাই সতর্কতা অবলম্বন ও সম্ভাব্য বিপদ প্রতিরোধ করা দায়িত্বশীলতার অংশ। একই সঙ্গে তদন্তের আগে কাউকে দায়ী করা কিংবা প্রতিটি দুর্ঘটনাকে কারও গাফিলতির ফল বলাও ন্যায়সংগত নয়। ন্যায়বিচারের দাবি হলো, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা।
মাকাসিদে শরেইয়্যাহ বা ইসলামি শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে জীবন সংরক্ষণ অন্যতম। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তার ‘আল-মুস্তাশফা’ গ্রন্থে শরিয়তের মৌলিক প্রয়োজনীয়তার আলোচনায় জীবন সংরক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন। (আল-মুস্তাশফা, মাকাসিদ ও মাসলাহার আলোচনা অধ্যায়) এই দিক বিবেচনায় নিরাপদ সড়ক, অগ্নিনিরাপত্তা, ঝুঁকিমুক্ত কর্মপরিবেশ ও কার্যকর
উদ্ধারব্যবস্থা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; মানুষের জীবন রক্ষারও অংশ। এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করতে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮) জননিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য এ আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো দুর্ঘটনার পর শুধু তাৎক্ষণিকভাবে জড়িত ব্যক্তিকে দায়ী না করে দেখতে হবে, নিরাপত্তাবিধি মানা হয়েছিল কি না, নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছে কি না এবং অনিয়ম জানা সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির
বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাগত দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, যাতে একই কারণে আবার প্রাণহানি না ঘটে।
মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত। সেই জীবন রক্ষার দায়িত্ব ব্যক্তির, প্রতিষ্ঠানের ও রাষ্ট্রের; প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী সচেষ্ট হতে হবে। দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা করা জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ, মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের চেয়ে সময়মতো একটি প্রাণ রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই দায়িত্বে অবহেলার জবাবদিহি দুনিয়ার আদালতের পাশাপাশি একজন মুমিনের বিশ্বাস অনুযায়ী আখিরাতেও রয়েছে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



