সড়ক তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সকালে গন্তব্যে বের হওয়া সাধারণ মানুষের কাছে যানজট কিংবা সময়ের চেয়েও বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় রাস্তার খানাখন্দ। গাড়ি একটু ডানে যায়, আবার বাঁয়ে। সামনে বড় গর্ত। চালক ব্রেক কষেন। পেছনের গাড়ি হর্ন দেয়। রিকশাচালক পাশ কাটাতে গিয়ে হুমড়ি খান। পথচারী কাদাপানি এড়িয়ে রাস্তার কিনারায় দাঁড়ান। এ দৃশ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী কিংবা কোনো অজপাড়াগাঁয়ের; পার্থক্য শুধু গর্তের আকারে।
বিগত বছরগুলোতে দেশে নতুন মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও সেতু নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে; কিন্তু পুরনো রাস্তা বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সেই মনোযোগ দেখা যায় না। সমস্যাটি এখানেই। প্রয়োজনের তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দও দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল। ফলে রাস্তা পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আগে ছোটখাটো ক্ষতি সারানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা হয় বড় ধরনের সংস্কারের জন্য। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশ ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে।
সিঙ্গাপুরের কথাই ধরা যাক। দেশটির ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি সপ্তাহে, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দুই সপ্তাহ পরপর এবং অন্যান্য সড়ক সর্বোচ্চ আট সপ্তাহ অন্তর নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়। এর ফলও মিলেছে— গত তিন বছরে সিঙ্গাপুরে গর্তের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। জাপানের পদ্ধতিটিও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অবকাঠামোর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘প্রিভেন্টিভ মেইনটেন্যান্স’ বা প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও মেরামতের ব্যবস্থা করা হয়। জাপানের পরিবহন মন্ত্রণালয় অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণকে শুধু মেরামতের কাজ হিসেবে নয়; সম্পদের পুরো জীবনচক্র ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখছে।
‘কত টাকা’ নয়; প্রশ্ন হলো কীভাবে টাকা খরচ হচ্ছে এবং রাস্তা কতদিন টিকে থাকছে
ভারতের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভারতের গ্রামীণ সড়ক কর্মসূচিতে
নির্মাণের সঙ্গে পাঁচ বছরের রক্ষণাবেক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নথিতে
ভারতের কিছু রাজ্যে ‘performance-based maintenance contract’-এর অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ
করা হয়েছে, অর্থাৎ ঠিকাদার শুধু রাস্তা বানিয়ে চলে যাবে না; নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত
রাস্তার মান ঠিক রাখার দায়ও তার। এ বিষয়টি বাংলাদেশও ভেবে দেখতে পারে। আমরা সাধারণত
একটি রাস্তা নির্মাণের হিসাব করি নির্মাণ ব্যয়ে। কিন্তু উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনায় হিসাবটা
আরও বড়— রাস্তার পুরো জীবনকালের খরচ কত, কত বছর সেটি ভালো থাকবে, কখন মেরামত দরকার
হবে এবং
সেই মেরামতের দায়িত্ব কার।
বিশ্বব্যাংকও সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় ‘performance-based contracting’-এর দিকে যাওয়ার কথা বলছে। এখানে ঠিকাদারের পারিশ্রমিক শুধু কতটুকু কাজ করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না; রাস্তা নির্দিষ্ট মানে কতদিন রাখা গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়ও চুক্তির অংশ হয়ে যায়। আমাদের সমস্যা হলো, রাস্তা নির্মাণের পর তার গল্প যেন শেষ হয়ে যায়। উদ্বোধনের দিন ফিতা কাটা হয়, ফলক বসে, ছবি ওঠে। তারপর কয়েক বছর পর একই রাস্তার পাশে আবার দেখা যায়— ‘সংস্কারকাজ চলিতেছে’। এই ‘চলিতেছে’ শব্দটির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ বড় পরিচিত। রাজধানীতেও চিত্রটি খুব আলাদা নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে— মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে। প্রশ্নটি তাই শুধু ‘কত টাকা’ নয়; প্রশ্ন হলো কীভাবে টাকা খরচ হচ্ছে এবং রাস্তা কতদিন টিকে থাকছে।
রাস্তার গর্তকে আমরা অনেক সময় নিছক নাগরিক দুর্ভোগ হিসেবে দেখি। কিন্তু এর অর্থনৈতিক মূল্য আছে। একটি পণ্যবাহী ট্রাক রাস্তার গর্ত এড়িয়ে ধীরগতিতে চললে সময়ের অপচয় হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে। একজন শ্রমিক প্রতিদিন অতিরিক্ত এক ঘণ্টা রাস্তায় হারালে বছরে তার কত কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, সেই হিসাবও আমাদের উন্নয়ন-পরিকল্পনায় থাকা উচিত। আর সড়ক দুর্ঘটনা শুধু চালকের ভুলে ঘটে না; সড়কের নকশা, গর্ত, ভাঙা প্রান্ত, অপর্যাপ্ত আলো, অনিরাপদ মোড়— সবই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সড়ককে শুধু যান চলাচলের অবকাঠামো হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে মানুষের জীবন রক্ষার অবকাঠামো হিসেবেও দেখতে হবে।
লেখক: শিক্ষক






