হাতে ওঠে পাতে ওঠে না কেন

ইলিশ, আমাদের জাতীয় মাছ। মাছটি বছরের দুটি নির্দিষ্ট সময়ে পোনা ছাড়ে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর (বাংলা ভাদ্র মাসের শেষের দিক থেকে আশ্বিন মাসের অর্ধেক সময় পর্যন্ত) মাসের দিকে বাচ্চা দেয়। অন্যদিকে বাংলা বছরের শেষ ঋতু এবং শুরুর ঋতুতেও ইলিশের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তখন মা ইলিশ বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর ও প্রধান নদীগুলোতে আর দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের দিকে আসে। একটি মা ইলিশ ১০ থেকে ২০ লক্ষাধিক ডিম দিতে পারে। তবে সব ডিম থেকে বাচ্চা (পোনা) ফোটে না। সামুদ্রিক পরিবেশ, সমুদ্রে অবাধে জাহাজ চলাচল, খাদ্যের অভাবসহ আরও অন্যান্য কারণে অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যায়। তখন ডিমের মোট সংখ্যা থেকে গড়ে মাত্র কয়েক হাজার পোনা ফোটাতে পারে একটি মা ইলিশ। ইলিশের এই প্রজনন মৌসুমে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রতি বছর দুবার করে সময় নির্ধারণের মাধ্যমে সমুদ্রে মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে ইলিশের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে চারটি জোন পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে— চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার মায়ানি, ভোলার তজুমুদ্দিন ও ভোলার পশ্চিমে সৈয়দ আওলিয়া, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও লতাচাপালী উপকূলীয় সামুদ্রিক অঞ্চলগুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত। এসব এলাকা প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার উপকূল জুড়ে বিস্তৃত।
ইলিশের প্রজনন মৌসুম ও নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে জেলেরা বোট নিয়ে চলে যান উত্তাল বঙ্গোপসাগরের বুকে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলেরা প্রতি বছর পাঁচ লাখ টনেরও বেশি ইলিশ আহরণ করেন। তবে চলতি বছরে বিগত বছরের তুলনায় ইলিশ আহরণ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারেও এর মূল্য কয়েকগুণ বেড়েছে। খুচরা মূল্যে বড় সাইজের বা এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা। মাঝারি সাইজ বা ৬০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের মধ্যে প্রতি কেজির দাম দেড় হাজার টাকার ওপরে। এ ছাড়া ছোট সাইজ বা ৬০০ গ্রামের নিচের ইলিশগুলো প্রতি কেজির দাম ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা মূল্যের বাজারে সাধারণত ছোট বা জাটকা ও মাঝারি সাইজের ইলিশের বেশি দেখা মিলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়, কিন্তু একটি পরিবারের পক্ষে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ভরণপোষণের জন্য ২৫ কেজি চাল পর্যাপ্ত নয়
বিগত বছরগুলোতে বিদেশে ইলিশ রপ্তানি করা হলেও চলতি বছরে কোনো দেশে একটি ইলিশও রপ্তানি করা হয়নি। বরং উল্টো আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৫৫৩ টন ইলিশ ভারত থেকে, মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উপলক্ষে। তবুও বাজারে ইলিশের চড়া দাম ও মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বরং যারা এই মাছ আহরণ করে তীরে নিয়ে আসেন, তাদের হাতে জুটলেও পাতে জোটে না।
এল নিনো-লা নিনোসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছোট থেকে বড় যেকোনো মাছসহ ইলিশের প্রজনন ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই আগের মতো সমুদ্রে ইলিশের বেড়ে ওঠা এবং বেঁচে থাকাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। ফলে ইলিশের সংখ্যা ও আহরণ ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। ইলিশ আহরণ করতে বোটের জন্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কারণে ইলিশের দামেও এর প্রভাব পড়েছে।
শোনা যায়, বোটমালিক ও মাঝিমাল্লারা জেলেদের মাছ খেতে নিষেধ করে থাকেন। আড়তদারদের কাছে অধিক মূল্যে ইলিশ বিক্রি করার জন্য জেলেদের উৎসাহিত করেন তারা। জেলেরা নিজেদের পরিবারের জন্য একটি ইলিশ নেওয়া তো দূরের কথা, বরং নিজেও খেতে পারেন না। জেলেদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার বছরে এক বেলাও ইলিশ খায় কি না, সন্দেহ। কখনো কখনো বোটমালিকরা মাছ ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে নেন। পরে সেই টাকা পরিশোধ করার জন্য বোটের সব ইলিশ ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। ফলে জেলেদের পাতে ইলিশ পড়ার কোনো সুুেযাগই থাকে না।
এ ছাড়া সমুদ্রের ইলিশ থেকে পাওয়া লভ্যাংশের অর্ধেক নিয়ে নেন বোটমালিক। এরপর আরেক ভাগের অংশকে তিন ভাগ করে মাঝি নিয়ে থাকেন এক ভাগ, আর বাকি দুই ভাগ থেকে বোটের চালক, ইঞ্জিন পরিদর্শক, বাবুর্চি ও জেলেদের মধ্য ভাগ করে দেওয়া হয়। এভাবে সাধারণ জেলেদের প্রতি অত্যন্ত জুলুম করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
ইলিশ দামি মাছ। এক কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি করলে একজন জেলে যে ৩ হাজার টাকা পাবেন, তা দিয়ে তিনি পুরো পরিবারের জন্য কয়েক দিনের চাল-ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে সক্ষম হন। অন্যদিকে যদি ইলিশটি বিক্রি না করে রান্না করেন, তাহলে চাল-ডাল ক্রয় করার জন্য কোনো অর্থ থাকবে না। তাই জেলেরা এক কেজি পরিমাণের একটি ইলিশ খাওয়ার চেয়ে বাজারে বিক্রি করে সংসারের অন্য খরচ চালানোটা যৌক্তিক মনে করেন।
সরকার প্রতি বছর দুই দফায় সমুদ্রে মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকেন। এ সময়ে জেলেরা পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়, কিন্তু একটি পরিবারের পক্ষে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ভরণপোষণের জন্য ২৫ কেজি চাল পর্যাপ্ত নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার আগে অনেক ধারদেনা শোধ এবং এনজিও সংস্থা থেকে নতুন লোন নিতে বাধ্য হয় তারা। পরে এসব ঋণ-শোধ আরও দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করে। এই চরম অর্থনৈতিক অনটনের কারণেই রুপালি ইলিশের মূল কারিগর হয়েও জেলেরা ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকেন। এই বৈষম্যের অবসান হওয়া উচিত। বোটমালিক ও জেলেদের মধ্যে মুনাফার ন্যায়সংগত বণ্টন, আইনের সুশাসন ও যেকোনো পরিশ্রমকে মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে এলে হয়তো আগামীতে জেলেদের পাতেও ইলিশ উঠবে।
লেখক: এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর গ্লোবাল আণবিক রিসার্চ হাব



