এভাবে কি হকার উচ্ছেদ হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নগরে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে, এটাই কাম্য। নগরবাসীর পানি-বিদ্যুৎ পাবেন, বিশুদ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নেবেন, থাকবে খেলার মাঠ ও হাঁটার জায়গা। শুধু কংক্রিটের স্থাপত্য নয়; থাকবে সবুজের ছোয়া, তাদের বাসস্থান স্বাস্থ্যসম্মত হবে, সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সহজলভ্য চিকিৎসা পাবেন সবার জন্য, শহরে শিশু-বৃদ্ধ-নারীরা থাকবেন নিরাপদে; থাকবে নাগরিক বাহন, যা সহজ করবে যাতায়াত ব্যবস্থা। তারা ট্যাক্স দেবেন, বিনিময়ে পাবেন নাগরিক সেবা। এই চাওয়া খুব বেশি নয়, নগরবাসী হিসেবে এটি তাদের পাওনা।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। সরকারের সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু শুধু নয়, সব পরিকল্পনার সূচনাবিন্দুও বটে। ঢাকা ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এমনকি বিনোদনেরও কি আর কোনো জায়গা আছে? তিন কোটি ৬৬ লাখ মানুষের ঢাকা শহর পৃথিবীর অন্যতম প্রধান জনঅধ্যুষিত নগর। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার মানুষ আসেন ঢাকা শহরে সব হারিয়ে কিংবা জীবন বিকাশের আশায়। ঢাকা তাদের জন্য কি আয়োজন রেখেছে? ঢাকা গড়ে উঠেছে, টিকে আছে, বিকশিত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের শ্রমে; কিন্তু ঢাকায় শ্রমজীবী মানুষের জায়গা কোথায়? নির্মাণ শ্রমিক, গাড়িচালক, গৃহকর্মী, পরিবহন শ্রমিক, কলকারখানার শ্রমিক, সেবাকর্মী হিসেবে তারা কাজ করে ধনীদের জন্য; কিন্তু বাস করে বস্তিতে। ঢাকা এক অর্থে শ্রমিকের শহর এবং একই সঙ্গে বস্তির শহর।
ঢাকা শহরের রাস্তা ভর্তি রিকশায়, ফুটপাত ভর্তি হকারে। ফলে রাস্তায় চলা যায় না, ফুটপাতে হাঁটা যায় না। তাই কিছুদিন পরপরই একটা উচ্ছেদ অভিযান চলে। কিন্তু বিষয়টা কি ভেবে দেখা হয়, কেন বারবার এই উচ্ছেদ অভিযান? একটা জনগোষ্ঠী কত দিন উচ্ছেদ আতঙ্ক আর জীবিকার অনিশ্চয়তায় বাস করবে?
একজন হকার রাস্তার কোনায় একটি ঠেলাগাড়ি নিয়ে বসেন বা একটি ভ্রাম্যমাণ কাঠামো নিয়ে বসেন। এর ফলে রাস্তার একাংশ দখল করতে হয়। তাকে পণ্য বিক্রি করতে হলে সামনে-পেছনে জায়গা খালি রাখতে হয়, যেন খদ্দের এসে অন্তত দাঁড়াতে পারেন। এ কারণে হাঁটার পথ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। এটি সবার চোখে পড়ে; কিন্তু সমাজকে তারা কী দেন, তা থেকে যায় চোখের আড়ালে।
ঢাকায় পাঁচ লাখের মতো হকার আছে। দিনে এক হাজার টাকা আয় করলে তারা দিনে ৫০ কোটি টাকা আর বছরে ৩৬০ দিনে ১৮ হাজার কোটি টাকা আয় করে। এই টাকা দেশের অর্থনীতিতে কী ভূমিকা রাখে, তা কি বিবেচনা করা হয়? হকারের আয়ের ওপর ভাগ বসায় স্থানীয় ক্ষমতাসীনরা, পুলিশ এবং অদৃশ্য শক্তিমানরা। প্রায় এক লাখ কোটি টাকার পণ্য বিক্রয় হয় হকারদের মাধ্যমে। এরা নিজেরা নিজেদের কর্মসংস্থান করে, রাষ্ট্রকে পরোক্ষ কর দেয়, পরগাছাদের টিকিয়ে রাখে, অর্থনীতিতে গতি আনে আর নিজেরা গালি খায়। শুধু পথচারীর চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কী ক্ষতি করে তারা যে তাদের ওপর এত রাগ?
কিন্তু একজন ইটভাটার মালিক যখন নদীপাড়ের জায়গা ব্যবহার করে বাতাসে কালো ধোঁয়া ছড়ান, তখন দূষিত বাতাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন একজন পথচারীও। একজন চামড়া ব্যবসায়ী যখন বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীতে নির্গত করেন, তখনো যৌথ সম্পদ বিনষ্ট হয়। সরকার যখন শহরের পার্কের জমি দখল করে কোনো কোম্পানিকে দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে বানায়, তখন কি সবাই তার সুযোগ পান? রাস্তা যেমন যৌথ সম্পদ, এগুলোও তেমনি। কিন্তু পরের তিনটা উদাহরণে অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। অথচ আমরা দেখছি, বাংলাদেশে নদী, পাহাড়, বন ও পার্ক দখল চলছে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বা নির্লিপ্ততায়। এসব নিয়ে প্রতিবাদে খুব বেশি মানুষ শামিল হয় না, লেখালেখিও তেমন দেখা যায় না।
একদিকে বেকার, অন্যদিকে দেশের স্বল্প আয়ের মানুষ রাস্তার দোকান থেকে সস্তায় কেনাকাটা করতে পারে বলেই বাজারের প্রয়োজনে এই হকার শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে— এ কথা ভুলে যাওয়া যাবে না। একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রাষ্ট্র চড়াও হয় শুধু হকারের ওপরই।
সিঙ্গাপুর সরকার হকার ও রাস্তার খাবারের বিক্রেতাদের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতি বছর তাদের সেরা সেবাকর্মীকে পুরস্কৃত করে, আর্থিক সাহায্য দিয়ে তাদের উৎসাহিত করা হয়। এই সম্মান ও সহায়তা তাদের জীবিকার অধিকার রক্ষা করতে সহায়তা করে। অথচ আমরা হকার পিটিয়ে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানাতে চাই
বুলডোজার দিয়ে ভাঙার কিছুদিনের মধ্যেই আবার কেন ওই একই জায়গায় অন্য হকারদের দেখা যায়— এটা একটা উত্তরহীন প্রশ্ন। এর সমাধান না করে স্বনিয়োজিত একদল মানুষকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে কেন উচ্ছেদের বেদনাদায়ক নাটক করা হয়। গড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয় যে খাত থেকে, সেখানে অবৈধ বলে কিছুদিন না যেতেই বেশি চাঁদা দিতে বাধ্য করার এই খেলা কত দিন চলবে? যদি তারা আগের জায়গায় ফিরে আসে, তাহলে তাদের অবৈধ বলা কেন?
কার স্বার্থে হকারদের অবৈধ বলা হয়? এই পেশাটা অবৈধ, নাকি যেখানে তারা ব্যবসা করেন, সেই জায়গায় বসা অবৈধ— এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। ‘অবৈধ’ আসলে হকার, নাকি ‘অবৈধ’ আসলে সেই ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে হকারকে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়? যারা চাঁদাবাজি করে, তাদের স্থানীয়রা ভালোভাবে চেনেন; কিন্তু তারা আলোচনায় আসে না কেন?
হকারদের সরাতে লাঠি-বুলডোজার নিয়ে নামতে হবে, কখনো গুলিও চালানো হয় কেন? সিটি করপোরেশন কি পারে না সমঝোতার মাধ্যমে বাস্তবসম্মতভাবে জায়গা নির্ধারণ করে দিতে। হকারদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া, নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার অনুমতি প্রদান করার পদক্ষেপ কেন নেওয়া হয় না? আলোচনার মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে কেউ যদি সহিংসতার আশ্রয় নেয়, তাহলে তা বিচারের আওতায় আসুক। শৃঙ্খলা আসুক হকার ও নগরবাসীর জীবনে।
জাতিসংঘের ‘ইউএন হাবিটাট’ বহু বছর ধরে এশিয়ার দেশগুলোতে হকারদের সংকট ও অধিকার নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটির প্রস্তাব এবং পরামর্শ হলো, হকারদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শহর-পরিকল্পনা করতে হবে। হকার নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে শহরগুলোর উন্নয়নে হকারদের অধিকার রক্ষা অপরিহার্য। কারণ, একদিকে নিম্নবিত্ত নগরবাসীর জন্য হকার প্রয়োজন। হকার ছাড়া তারা স্বল্পমূল্যে জিনিসপত্র কিনবেন কোথা থেকে? কর্মসংস্থান ও মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্থায়ী শহর গড়ে তোলার মূল ভিত্তি।
জাতিসংঘের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে কি ঢাকার নগর-পরিকল্পনা করা হয়েছে? হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে? শুধু ঢাকা নয়; আমাদের নগরগুলোয় হকারদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কোথায় যাবে? বিকল্পের অভাবে, জীবন ও জীবিকার তাগিদে, কারও অপূরণীয় ক্ষতি না করে, তারা যদি ব্যবসা করে, তাহলে তাদের কি ‘অবৈধ’ বলা যায়? দরিদ্র বলেই কি তাদের অপরাধী বানাতে হবে? তাদের জীবিকার উৎসকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে?
বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্ন সবাই দেখান। অথচ সিঙ্গাপুর সরকার শহর-পরিকল্পনায় সক্রিয়ভাবে রাস্তার বিক্রেতাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, যেন প্রকল্পগুলোতে হকার স্টলের সুরক্ষা ও স্থানান্তরের সুযোগ থাকে। শুধু তা-ই নয়, সিঙ্গাপুর সরকার হকার ও রাস্তার খাবারের বিক্রেতাদের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতি বছর তাদের সেরা সেবাকর্মীকে পুরস্কৃত করে, আর্থিক সাহায্য দিয়ে তাদের উৎসাহিত করা হয়। এই সম্মান ও সহায়তা তাদের জীবিকার অধিকার রক্ষা করতে সহায়তা করে। অথচ আমরা হকার পিটিয়ে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানাতে চাই!
একটা বিষয় দেখা যাবে, আজকে যারা হকার উচ্ছেদ করতে উৎসাহী, কয়েক দিন পর নির্বাচন এলে তারাই আবার হকারের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে ভোট চাইবেন। গণমাধ্যমে শ্রমবান্ধব, গরিববান্ধব বলে তাকে আখ্যায়িত করে ফলাও করে প্রচার হবে, তখন এসব মানুষই ভুলে যাবেন হকারদের ব্যবসা গুঁড়িয়ে দেওয়ার চিত্র; তাদের হুংকার এবং হকারদের হাহাকার। সেদিন কারও মনে পড়বে না এই হকারদের ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। মিছিলে আবার হকারদের নিয়েই স্লোগান হবে— অমুক ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি...।
এই উচ্ছেদ আর পুনরায় অবস্থানের লুকোচুরি কতদিন চলবে? এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। ঢাকায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে, যেখানে হকাররা বসেন, প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বল্প সময়ের কাঁচাবাজার বসে, ভ্যানে পণ্য বিক্রয় হয়; এগুলো হিসাবে আনতে হবে। স্থান ও সময় নির্ধারণের জন্য হকারদের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে এবং একটা কার্যকর সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। হকার সমস্যা নয়, এটা একটা বাস্তবতা— এই কথাটা ভুলে গেলে চলবে না।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক




