ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার নতুন সংকট

ফয়সাল ইসলাম
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল এমন হওয়া উচিত, যাতে তা ব্যবসার বিকাশকে নিরুৎসাহিত না করে। করনীতি ব্যবসা সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং কর প্রতিপালন— সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ বাস্তবতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ১ শতাংশ টার্নওভার কর নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংশোধিত আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩(৬) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া ব্যবসা বা পেশা থেকে আয়কারী যেকোনো ব্যক্তির সাধারণভাবে নির্ণীত কর নির্ধারিত টার্নওভার করের চেয়ে কম হলে, লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে গ্রস প্রাপ্তির ওপর প্রযোজ্য হারে টার্নওভার কর দিতে হবে। সাধারণ ব্যবসা ও পেশার ক্ষেত্রে এ হার ১ শতাংশ; তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে উচ্চতর হার এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথম তিন বছর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হার প্রযোজ্য।
টার্নওভার করের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ব্যবসার মোট বিক্রয় কিংবা গ্রস প্রাপ্তির (Turnover) ওপর আরোপিত হয়, অর্থাৎ ব্যবসা লাভ করুক বা লোকসান করুক, নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে আয়কর নির্ধারিত হয় প্রকৃত নিট মুনাফার ওপর। আধুনিক করনীতির অন্যতম মৌলিক নীতি হলো— করদাতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কর আরোপ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিক্রয়ভিত্তিক বাধ্যতামূলক করের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ধরা যাক, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মাত্র ৫ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে চালের ব্যবসা শুরু করেছেন। একই মূলধন বারবার ঘুরিয়ে তিনি বছরে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকার চাল বিক্রি করেছেন। তিনি প্রতি কেজি চাল ৭৫ টাকায় কিনে ৮০ টাকায় বিক্রি করেন; অর্থাৎ প্রতি কেজিতে তার স্থূল লাভ মাত্র ৫ টাকা। বার্ষিক মোট বিক্রি ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হলে তিনি মোট ১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চাল বিক্রি করেছেন, ফলে তার বার্ষিক স্থূল লাভ দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
একজন ব্যবসায়ী কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করলেও তার লাভের হার খুবই কম হতে পারে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসায়, যেখানে লাভের মার্জিন সাধারণত সীমিত থাকে
এখন ব্যবসার প্রয়োজনীয় ব্যয়গুলো বিবেচনা করা যাক: পরিবহন ব্যয় ১ লাখ ৫০ হাজার, দোকান ভাড়া ৬০ হাজার, কর্মচারীর বেতন ৯৬ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ১২ হাজার এবং অন্যান্য ব্যয় ২৪ হাজার টাকা— সব মিলিয়ে মোট ব্যবসায়িক ব্যয় ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা। অতএব প্রকৃত নিট লাভ থাকে মাত্র ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
এখন করের হিসাব দেখা যাক। ১ শতাংশ টার্নওভার কর প্রযোজ্য হলে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বিক্রির ওপর কর হবে ১ লাখ ২০ হাজার। অন্যদিকে, প্রকৃত নিট লাভের ভিত্তিতে স্বাভাবিক আয়কর নির্ধারণ করা হলে এবং ৪ লাখ ৮ হাজার টাকাই তার একমাত্র করযোগ্য আয় ধরা হলে, করমুক্ত সীমা বাদ দেওয়ার পর ন্যূনতম কর হবে প্রায় ৫ হাজার। অর্থাৎ একদিকে কর ৫ হাজার, অন্যদিকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, দুই ব্যবস্থার পার্থক্য প্রায় ২৪ গুণ। এই উদাহরণ একটি মৌলিক বাস্তবতা তুলে ধরে: কর প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে নয়, বিক্রির ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই ব্যবসা পরবর্তী বছরে লোকসানে পড়লেও এ কর দিতে হবে, কারণ টার্নওভার কর লাভ-লোকসানের হিসাব বিবেচনা করে না। ফলে কম মুনাফার বা লোকসানগ্রস্ত ব্যবসার ওপর এ করের প্রকৃত বোঝা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। একজন ব্যবসায়ী কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করলেও তার লাভের হার খুবই কম হতে পারে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসায়, যেখানে লাভের মার্জিন সাধারণত সীমিত থাকে। পণ্যের ক্রয়মূল্য, ব্যাংক লোনের সুদ, পরিবহন ব্যয়, ভাড়া, বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় পরিশোধের পর যে সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে, সেটিই তার প্রকৃত আয়। যার বিক্রয় বেশি কিন্তু লাভ কম, তার ওপর কি শুধু বিক্রয়ের অঙ্কের ভিত্তিতে উচ্চ করের বোঝা চাপানো ন্যায়সংগত?
রাজস্ব বৃদ্ধি প্রয়োজন কিন্তু রাজস্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো টেকসই ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত করের চাপে ব্যবসা গুটিয়ে ফেললে, নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হলে অথবা অনেকে আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হলে, স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে করের ভিত্তি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার বাস্তবতা বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সীমিত মূলধন নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং অনেকেই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণের সুদহার বেড়েছে, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার বিভিন্ন চার্জ এবং ডিজিটাল পেমেন্টের মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) ব্যবসার ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় বহনের পাশাপাশি বিক্রয়ের ওপর বাধ্যতামূলক ১ শতাংশ কর দিতে হলে ক্ষুদ্র ব্যবসার কার্যকর মূলধন (Working Capital) দ্রুত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কার্যকর মূলধন কমে গেলে নতুন পণ্য কেনা, কর্মচারীর বেতন দেওয়া, সরবরাহকারীর পাওনা মেটানো এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত যার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনৈতিক চক্রে।
বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি— দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ থেকে। এ খাত শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই এ খাতের ওপর আরোপিত যেকোনো করের প্রভাব শুধু রাজস্বের হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না; এর প্রভাব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও বিবেচনা করতে হবে।
একটি টেকসই করব্যবস্থা সবসময় রাষ্ট্র এবং করদাতা— উভয়ের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে। সে বিবেচনায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ১ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ টার্নওভার কর পুনর্বিবেচনা করা সময়োপযোগী হতে পারে। এটি রাজস্ব কমানোর প্রস্তাব নয়; বরং এমন একটি করনীতি গড়ে তোলার আহ্বান, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার শক্তিও অক্ষুণ্ন রাখবে।
লেখক: আর্থিক খাতের বিশ্লেষক





