রামিসার মৃত্যুর পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়

রামিসার ঘটনায় আমরা সবাই বিচার চাইছি— কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। এমন এক বিচার, যাতে কেউ আর এমন কাণ্ড ঘটানোর সাহস না দেখায়। এই চাওয়াতে ভুল নেই। নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এমন ভয়াবহ বর্বরতার পর বিচারের দাবি না ওঠাই বরং অস্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিচারের দাবি, এত সামাজিক ক্ষোভ, এত আলোচনার পরও কেন এ ধরনের সহিংসতা থামানো যাচ্ছে না? কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন তা আরও নিষ্ঠুর, আরও নির্মম হয়ে উঠছে? আমাদের এটা ভাবতে হবে। ভাবতে হবে যে শুধু বিচারহীনতাই নয়, সমাজে অপরাধ ও শাস্তিকে ঘিরে যে ভয়ভিত্তিক ও প্রতিশোধমূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিও কি কোনোভাবে অপরাধের ধরনকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে? এটি আরও গভীরভাবে বুঝতে হলে কিছু অপরাধবিজ্ঞানভিত্তিক ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা খতিয়ে দেখতে হবে। অপরাধবিজ্ঞানে কোনো অপরাধকে কেবল ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন বিকৃতি হিসেবে দেখা হয় না; যেখানে অপরাধটি ঘটেছে, সেই সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবেশও খতিয়ে দেখা হয়। তাই প্রশ্ন ওঠে, শুধু মৃত্যুদণ্ড দিয়েই এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব কি না।
আমেরিকায় বার্গলারি (সশস্ত্র চুরি বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ), রবারি (ডাকাতি) কিংবা ভায়োলেন্ট ফেলনি (সহিংস গুরুতর অপরাধ) দমনের জন্য বহু বছর ধরে ফেলনি মার্ডার রুল (গুরুতর অপরাধ চলাকালে মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য করার আইন)-এর মতো কঠোর আইন চালু ছিল। এমনকি বহু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। ধারণা ছিল, ভয় দেখিয়ে অপরাধ কমানো যাবে। বাংলাদেশেও বছরের পর বছর ধর্ষণ, মাদক কিংবা সহিংস অপরাধ ঠেকাতে কঠোর শাস্তি ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাড়ানো হয়েছে। তাতে কিন্তু সেই অপরাধগুলো কমেনি। বাংলাদেশে দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের নজির থাকার পরও ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা থামেনি। যেমন— মাদক নির্মূলের নামে বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, কিন্তু মাদক সমস্যা নির্মূল হয়নি। অন্যদিকে পৃথিবীর বহু দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই, অথচ সেসব সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে বেশি। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস কিংবা কানাডার মতো দেশগুলো শুধু শাস্তি বাড়ানোর দিকে নয়; বরং শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা, জেন্ডার সমতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সহিংসতা প্রতিরোধের সামাজিক সংস্কৃতি তৈরির দিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
উন্নত সমাজগুলো এদিকে আলাদা। তারা ভাবতে শেখে, কীভাবে এমন ঘটনা আগেই ঠেকানো যায়
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের যেসব ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশেই আমরা দেখেছি, অপরাধের পর ভিকটিমকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ অপরাধীরা জানে, ধর্ষণের ঘটনা হয়তো ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ সে পাবে। কিন্তু ভিকটিম বেঁচে থাকলে তার পরিচয় ফাঁস করে দেবে, এতে জনরোষ তৈরি হবে। ফলে বিকৃত অপরাধী মনস্তত্ত্বের মধ্যে একটি ভয়ংকর রিস্ক ক্যালকুলেশন (ঝুঁকির হিসাব) কাজ করতে শুরু করে। ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার পর সে ভাবে, সাক্ষীকে সরিয়ে দিতে পারলেই বোধ হয় বাঁচা যাবে।
ক্রিমিনোলজিতে এ বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে। বহু দেশে সেক্সুয়াল ভায়োলেন্সের (যৌন সহিংসতা) সঙ্গে হোমিসাইড (হত্যাকাণ্ড) যুক্ত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উইটনেস এলিমিনেশন থিওরি (সাক্ষী নির্মূল তত্ত্ব) নিয়ে কাজ হয়েছে। অর্থাৎ, অপরাধী মূল অপরাধের শাস্তির ভয় থেকে নয়, বরং ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাতে ভিকটিমকে হত্যার পথ বেছে নেয়।
তবে এটিও সত্য, শুধু বিচারের ভয় দিয়েই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাবে না। সমাজেরও একটি বড় ভূমিকা আছে। আমরা দেখছি, আমাদের সমাজে মানুষ ক্রমে আরও সহিংস, অমানবিক ও নারীবিদ্বেষী হয়ে উঠছে। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, কেন ইদানীংকালে এমন ভয়াবহতা বাড়ছে? কেন নারী ও কন্যাশিশুরা ক্রমে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে? কেন তাদের নিরাপত্তা সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে? কেন এ দেশে মেয়েদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয়নি? কেন এখনো পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভেতরে নারীকে মানুষ হিসেবে নয়; বরং নিয়ন্ত্রণ, ভোগ, সম্মান বা অপমানের বস্তু হিসেবে দেখা হয়।
এখানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘৃণা, প্রতিশোধ, অপমান, উন্মত্ততা এবং অমানবিকতার ভাষা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন তার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে দুর্বলদের ওপর। রাজনৈতিক মেরূকরণ, সামাজিক বিভাজন এবং প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির উত্থান আমাদের সমাজে একধরনের ব্রুটালাইজেশন (সহিংস ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠার সংস্কৃতি) তৈরি করেছে। যার ফলে গত কয়েক বছরে মানুষ ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়েছে। অনলাইন কিংবা অফলাইনে অন্যকে অপমান করা, মব দিয়ে ভয় দেখানো, নিপীড়ন করা বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা বেড়েছে। আর এই সংস্কৃতির অন্যতম বড় শিকার হয়েছে নারী ও শিশুরা।
একদিকে নারী ও তার ব্যক্তিগত জীবনকে ভোগবাদী সংস্কৃতি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য পুরুষতান্ত্রিক নৈতিকতা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে নারী একই সঙ্গে ভোগের বস্তুতে পরিণত এবং নিপীড়িত— দুই-ই হচ্ছে। এই সাংস্কৃতিক সংকট না বুঝলে কেবল বিচারের ভাষায় সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে সাধারণত কিছু ঘটে গেলে আমরা তাতে ক্ষোভ দেখাই, বিচার চাই। উন্নত সমাজগুলো এদিকে আলাদা। তারা ভাবতে শেখে, কীভাবে এমন ঘটনা আগেই ঠেকানো যায়। আমাদেরও প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে প্রতিরোধমূলক সমাজে যেতে হবে।
ফলে রামিসার ঘটনায় কেবল বিচার চাইলেই হবে না; একই সঙ্গে আমাদের আরও বড়, আরও কঠিন প্রশ্নগুলো করতে হবে। ভাবতে হবে, কীভাবে এমন একটি সমাজ তৈরি করা যায়, যেখানে একটি মেয়েশিশু নিরাপদ থাকবে। নারীর প্রতি সহমর্মিতা কাগজে-কলমে নয়; বাস্তব হবে, পুরুষতান্ত্রিক বর্বরতা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হবে, রাজনৈতিক উন্মত্ততা ও সামাজিক অবমাননার সংস্কৃতি কমবে এবং মানুষ ধীরে ধীরে আবারও মানবিক হবে।
নইলে প্রতিবারই আমরা একই চক্রে ঘুরপাক খাব— শোক জানাব, বিচার চাইব, ক্ষোভে ফেটে পড়ব, তারপর আবার আরেকটি রামিসার খবরের সামনে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করব।
লেখক: কানাডায় কর্মরত অনুসন্ধানী সাংবাদিক






