আরশোলা, ব্রয়লার মুরগি ও নেপো কিড

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভারতের আরশোলা যে বাংলাদেশে এসে মুরগিতে পরিণত হবে, কে অনুমান করতে পেরেছিল? শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা অচল করে রাজপথে নামার অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফেসবুকে তরুণদের একটি অংশ ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামে একটি পেজ খুলে ফেলে। আর দ্রুত সেটার ফলোয়ার বাড়তে থাকে।
এই ঘটনা আমাদের কাছে নতুন নয়। ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র অবিশ্বাস্য উত্থানের ঢেউ এখনও নেমে যায়নি। গত মাসে দিল্লিতে তারা বিশাল সমাবেশ করে বিজেপি সরকারের কপালে চিন্তার বলিরেখা এঁকে দিয়েছে।
এটাও একটা দৈবই বটে, বাংলাদেশে যখন শিক্ষার্থীরা পথে নেমে আন্দোলন করছে, তখন প্রতিবেশী দেশ নেপালেও সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলনে নেমে পড়েছে জেন-জি তরুণেরা। অথচ কিছু দিন আগে তারা আন্দোলন করে সরকার ফেলে দিয়েছে। তখন আন্দোলনে ‘নেপো কিড’ কথাটা তারা স্লোগানে পরিণত করেছিল। ‘নেপো কিড’ হলো দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়া রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ননি-ঘি খাওয়া সুবিধাপ্রাপ্ত সন্তান।
বাংলাদেশে ব্রয়লার মুরগির আন্দোলন বেশি দূর গড়াবে না, সেটা বোঝা যায়। তবে আমি মনোযোগ দিতে চাই ভিন্ন একটা বিষয়ে। জেন-জি কিংবা তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদের নতুন ভাষা এবং সংঘবদ্ধ হওয়ার ভিন্নতর ঝোঁক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে : সংগঠন ছাড়া শুধু অনলাইনেও কি অ্যাক্টিভিজম সম্ভব? সংগঠনভিত্তিক প্রচলিত রাজনীতির চর্চা কি অচল বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে? নেতৃত্বহীন রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান কি আমরা প্রত্যক্ষ করছি? নাকি এগুলো মিমভিত্তিক অনলাইন সক্রিয়তার চাইতে বেশি কিছু নয়, সাময়িক আলোড়ন তুলে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া যার কোনো সুদূরপ্রসারী পরিণাম নেই?
আরশোলা, ব্রয়লার মুরগি কিংবা নেপো কিড— এগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতীক নয়। কিন্তু এগুলো একটা প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন। তারা ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে চাইছে না। তারা নিজেদের ভাষা তৈরি করছে।
উপমহাদেশ জুড়ে একসময় প্রতিবাদের প্রতীক ছিল মুষ্টিবদ্ধ হাত, লাল পতাকা, পোস্টার কিংবা দেয়াললিখন। এখন আমরা দেখছি সেই জায়গা দখল করছে মিম, হ্যাশট্যাগ, ব্যঙ্গাত্মক নাম আর ভাইরাল প্রতীক। কখনও সেটা আরশোলা, কখনও ফার্মের মুরগি, কখনও নেপো কিড। ইন্টারনেট, অ্যালগরিদম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম কি এভাবে তাদের প্রতিবাদের ভাষা বদলে নিচ্ছে? স্লোগানের বাইরে তারা কি ক্ষোভ প্রকাশের নতুন মাধ্যম উদ্ভাবন করে ফেলেছে?
প্রথম দেখায় ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ নামটি হাস্যরসাত্মক মনে হলেও এটা স্পষ্টতই একটা রাজনৈতিক কৌশল। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ভাষা এড়িয়ে নতুন এক প্রতীক তৈরি করাই এর মূল কথা। নামের মধ্যে যে ‘পার্টি’ শব্দটি আছে, সেটা এখানে কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের অর্থ বহন করে না। বরং এটা একটা ডিজিটাল কমিউনিটি গড়ার চেষ্টা।
এটা একটা প্যাটার্ন হিসেবে না দেখার কারণ নেই। সেভাবেই তা আমাদের কাছে হাজির হয়। কারণ স্পষ্টতই বাংলাদেশের ব্রয়লার মুরগিরা ভারতের আরশোলাকে অনুসরণ করছে। ভারতে মাত্র তিন মাস আগে ককরোচ জনতা পার্টি নামে যে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তরুণরা গড়ে তোলে, তা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সেটারও শুরুটা হয়েছিল আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর মতো একটি বিতর্কিত বেফাঁস মন্তব্যের সূত্র ধরে। আদালতে কোনো এক শুনানির সময় দেশের বেকার তরুণদের ককরোচ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন সে দেশের প্রধান বিচারপতি। তরুণেরা তাতে ভীষণ অপমানিত হয়েছে। কিন্তু তারা এ জন্যে সড়ক অবরোধ করেনি, অবস্থান ধর্মঘট করেনি। তারা অনলাইনে একটা পেজ খুলে ফেলেছে। সেই অপমানজনক শব্দকেই তারা করে নিয়েছে নিজেদের পরিচয়ের অংশ। তারা বলেছে, যদি ক্ষমতাবানরা আমাদের আরশোলা মনে করে, তাহলে আমরা সেই আরশোলাই হব, যাদের শত চেষ্টাতেও নির্মূল করা যায় না।
এভাবে অপমানের ভাষা তরুণেরা পাল্টে নিয়েছে প্রতিরোধের ভাষায়। কয়েক দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ককরোচ জনতা পার্টির নাম ভাইরাল হয়ে যায়। দুই কোটির উপরে ফলোয়ার তৈরি হয় তাদের। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির গুরুত্ব শুধু অনলাইন জনপ্রিয়তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বেকারত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মতো বাস্তব সমস্যাগুলো এই ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে তারা রাস্তায় সমাবেশ করে। ভারতের বিজেপি সরকার যে এ আন্দোলনে বিচলিত হয়ে পড়েছিল, সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
এই জায়গাতেই জেন-জি আন্দোলনের একটি নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। আর সেটা হলো মিম রাজনীতি। মিম শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠছে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যে ভাষা আগে কার্টুন, পোস্টার বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রে দেখা যেত, এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।
নেপালের জেন-জি আন্দোলনও এই একই বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। সেটা আরও আগে ঘটেছে এবং সেখানে ‘আরশোলা’ বা ‘ব্রয়লার মুরগি’র মতো একটি একক প্রতীক গড়ে না উঠলেও তরুণরা ‘নেপো কিড’ বা ‘নেপোটিজমের’ বিরুদ্ধে বিদ্রুপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে, অথচ সাধারণ তরুণরা চাকরি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে— এই ক্ষোভ পরিণত হয়েছে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে।
লক্ষ্য করার বিষয় ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালে তরুণরা শুধু ব্যক্তি বা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছে না, তারা প্রশ্ন তুলছে ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে। তারা বলছে, প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। তাই তারা নিজেদের ভাষা তৈরি করছে।
দার্শনিক মিখাইল বাখতিন দেখিয়েছেন, কীভাবে কার্নিভাল বা মধ্যযুগীয় উৎসবের সময়ে সাধারণ মানুষ সাময়িকভাবে ক্ষমতার ভাষা উল্টে দিত। তারা তখন রাজা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত, প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে ব্যঙ্গ করত। জেন-জির মিম রাজনীতিও অনেকটা তেমন। তারা ক্ষমতাকে সরাসরি আক্রমণের পাশাপাশি হাসির বিষয় করে তুলছে।
কথা হলো, ভাইরাল ফলোয়ার কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে? একটি ফেসবুক পেজে লাখ লাখ অনুসারী থাকা আর একটি দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। ইতিহাসে অনেক ডিজিটাল আন্দোলন দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু এসব আন্দোলনের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। নতুন প্রজন্মের রাজনীতির ভাষা বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত ছড়িয়ে আছে এসব প্রবণতায়।
আরশোলা, ব্রয়লার মুরগি কিংবা নেপো কিড— এগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতীক নয়। কিন্তু এগুলো একটা প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন। তারা ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে চাইছে না। তারা নিজেদের ভাষা তৈরি করছে।






