রেমব্রান্টের জন্মদিন
ক্যানভাসেই জীবনের সব রঙ, সব ক্ষত

রেমব্রান্টের নিজের আত্মপ্রকৃতি (১৫ জুলাই ১৬০৬—৪ অক্টোবর ১৬৬৯)
কখনো ভেবে দেখেছেন, একটি আঁকা ছবি কীভাবে গোটা জীবনের চেয়েও বেশি দামি হয়ে ওঠে?
১৯৯০ সালের ১৮ মার্চ। গভীর রাত, অন্ধকার। আমেরিকার বোস্টন শহরের ইসাবেলা গার্ডনার মিউজিয়ামে পুলিশের পোশাক পরে ঢুকল দুই ব্যক্তি। দ্রুতই বেঁধে ফেলল পাহারাদারদের। তারপর সোজা চলে গেল ডাচ স্যালনে যেখানে শুধু প্রখ্যাত ডাচ শিল্পীদের কাজই রয়েছে। ওখান থেকে কেটে নিল ১৩টি শিল্পকর্ম। ক্যানভাসগুলো কেটে নিয়েছিল তারা, ফ্রেমগুলো পড়ে রইল— যেন প্রজাপতির পাখনা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে, দেহটা পড়ে আছে ধুলোয়।
এই ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ জানতে আশ্চর্যই হতে হবে। ৫০০ মিলিয়ন ডলার। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্পচুরির ঘটনা এটি। চুরি হওয়া ১৩টি ছবির মধ্যে দুটি ছিল রেমব্রান্টের আঁকা। এখন প্রশ্ন হলো, রেমব্রান্ট কে? কী এমন আছে তার আঁকা ছবিতে, যা এত মরিয়া হয়ে চুরি করল? ৩৪০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, তবু কেন গোটা পৃথিবী এই মানুষটার কাছে বারবার ফিরে যায়?
যে মানুষটি মাত্র ১৪ বছর বয়সে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় নিজের নাম লিখিয়েছিলেন, নিজের সই করার জন্য এক মরদেহের নাভিকে ইংরেজি ‘R’ অক্ষরের মতো বানিয়ে দিয়েছিলেন, যে মানুষটি জীবনের একেবারে শেষ বর্ষে এঁকেছিলেন এমন এক ছবি— যা দেখলে আজও সবার চোখ ভিজে আসে!
১৬০৬ সাল। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন শহর। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে রাইন নদী, আর সেই নদীর ধারেই এক মিল। মিলটা ঘোরে বাতাসে, আর সেই মিলের মালিকের নবম সন্তান হয়ে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কোঁকড়া চুলের ছেলে। নাম রেমব্রান্ট হারমেন্সজোন ভান রাইন।
কারখানা বা মিলটি ছিল তার কাছে এক জাদুর বাক্স। ছোট্ট জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসত, ধুলোর কণাগুলো নাচত আলোর ভেতর। রেমব্রান্ট চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতেন। এই আলো-ছায়ার খেলা তার মনে গেঁথে গেল ছোটবেলাতেই। এক গবেষক পরে বলেছিলেন, ‘আমি নিশ্চিত, মিলটি আলো প্রতিফলিত করত এক বিশেষ ভাবে, ছোট্ট রেমব্রান্ট জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসতে দেখে মুগ্ধ হয়ে হাত তালি দেয়া শুরু করতেন।’
১৪ বছর বয়সে রেমব্রান্ট ভর্তি হলেন লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন তার নাম উঠল এক রেজিস্টার খাতায়। সেই খাতা আজও আছে, আজও স্পর্শ করা যায়।
রেমব্রান্ট-গবেষক ওন ব্লুম বলেছেন, ‘বাবার সঙ্গে সে একাডেমিতে এসেছিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তার নাম কাগজে লিখলেন। রেমব্রান্ট-প্রেমী কারও জন্য এটা জাদুকরী অনুভূতি।’
কিন্তু বইপত্রের পড়াশোনা বেশি দূর এগোল না। তার হাত চুলকাতো—আঁকতে হবে, আঁকতেই হবে। ‘নুল্লা দিয়েস সিনে লিনেয়া’—একটি দিনও রেখা ছাড়া নয়। এটাই ছিল তার ঠোঁটে ঝুলে থাকা আপ্তবাক্য আর জীবননীতি।
তাই তিনি চলে গেলেন আমস্টারডামে, পিটার লাস্টম্যান নামের এক নামকরা চিত্রকরের কাছে। লাস্টম্যান ইতালি ঘুরে এসেছিলেন, শিখেছিলেন ক্যারাভাজ্জোর বিখ্যাত আলো-ছায়ার খেলা। রেমব্রান্ট সেই কৌশল শিখলেন ঠিকই, কিন্তু ভাবলেন, ‘আমি তো এর চেয়েও আলাদা কিছু করব।’
১৬৩২ সাল। রেমব্রান্টের বয়স মাত্র ২৬। তিনি পেলেন এক অদ্ভুত কমিশন— আমস্টারডামের সবচেয়ে নামকরা সার্জন ড. নিকোলাস টাল্প আর তার সহকর্মীরা চাইলেন, তাদের একটি গ্রুপ পোর্ট্রেট আঁকুন রেমব্রান্ট। কিন্তু স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকার ছবি নয়। চলবে একটি মরদেহের কাটাছেঁড়া, আর সেই গোটা দৃশ্যই ক্যানভাসে ধরতে হবে।
সেই সময় পোস্টমর্টেম ছিল বিরাট এক সর্বজনীন অনুষ্ঠান। মানুষ টিকিট কেটে দেখতে আসত। গানবাজনা হত, সুগন্ধী ধূপ জ্বালানো হতো— কারণ লাশ যে পচতে শুরু করেছে, গন্ধ বেরোচ্ছে তা যেন খুব বিরক্ত না করে।
এখন চিন্তা করে দেখুন, এতগুলো মানুষকে একসঙ্গে এঁকে সবার মুখ ঠিকঠাক চেনা যাবে, এমন ছবি আঁকা কী সহজ কাজ? রেমব্রান্ট এক দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল বের করলেন। তিনি সবাইকে প্রায় একে অপরের ওপর স্তূপ করে দিলেন। কিন্তু ছবির একেবারে কেন্দ্রে কে? ডাক্তার নন, মৃতদেহটি।
আরেকটি চমকপ্রদ ব্যাপার লক্ষ করুন। মৃতদেহটির নাভির দিকে তাকালে ইংরেজি ‘R’ অক্ষরটি চোখে পড়ে। হ্যাঁ, রেমব্রান্ট নিজের সাইন এমন কৌশলে বসিয়ে দিয়েছেন! যেন বলছেন, এই ছবি আমার, আর কারও নয়।’
এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘এ যেন আপনার পেইন্টিংয়ের ওপর নিয়ন সাইন। আপনি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে যান, এ রেমব্রান্টেরই কাজ।’
এবার প্রেমের গল্প শোনাই। সেই নারীর গল্প যে রূপকথা থেকে এসেছিল। আমস্টারডামে এক প্রভাবশালী আর্ট ডিলার ছিলেন, নাম হেনরিকেনবুর্খ। তিনি একদিন রেমব্রান্টকে বললেন, ‘আমার কাজিন এসেছেন ফ্রিজল্যান্ড থেকে। দেখা করতে চান?’ রেমব্রান্ট রাজি হলেন।
মেয়েটির নাম সাস্কিয়া। বয়স ২০। সুন্দরী, ধনী, আভিজাত একজন। আর রেমব্রান্ট? এক গরিব কারখানা মালিকের ছেলে। তথাপি, সাস্কিয়া তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কি সত্যি যে আপনার ক্যানভাসে আলো-ছায়া জীবন্ত হয়ে ওঠে?’ ব্যস, হয়ে গেল। তিন মাসের মধ্যে বাগদান। এক বছর পর বিয়ে।
তাদের জীবন ছিল সত্যিই রূপকথার মতো। রেমব্রান্ট কিনতে থাকলেন ইতালীয় ভাস্কর্যের প্রতিলিপি, অস্ত্র, অলংকার, বিদেশি পাগড়ি। আমস্টারডামের ধনী বণিকেরা সবাই চাইতেন রেমব্রান্টের আঁকা ছবি। অর্থ, খ্যাতি, ছাত্র— সবই ব্যস্ততায় ঢেকে দিল তার জীবন। কিন্তু জীবন তো আর রূপকথা নয়। একে একে তাদের তিনটি সন্তান হলো, তিনটিই কিছুদিনের মধ্যে মারা গেল। তারপর এল টাইটাস। ছেলেটি বেঁচে গেল। কিন্তু সাস্কিয়া? চারবার গর্ভধারণের ধকল আর যক্ষ্মা— মাত্র ৩০ বছর বয়সে মারা গেলেন। রেমব্রান্ট ভেঙে পড়লেন। প্রায় দশ বছর তেমন কিছু আঁকলেন না। তবু ভালোবাসার মানুষটিকে তিনি ভোলেননি।
সাস্কিয়ার একটি ছোট্ট ড্রয়িং-এ বিজ্ঞানীরা অবলোহিত আলোয় দেখেছেন, পরে তিনি ফ্যাকাশে চকের আস্তরণ দিয়ে তার মুখের চারপাশে একটি অতিরিক্ত আলোর উৎস যোগ করেছিলেন। যেন মৃত্যুর পরও সাস্কিয়া আলো হয়ে তার পাশে থাকবেন। কিন্তু তার আগে, ১৬৪২ সালে, রেমব্রান্ট এঁকেছিলেন সেই ছবিটি— যেটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর একটি। ‘দ্য নাইট ওয়াচ’। এটি আসলে আমস্টারডামের একদল বন্দুকধারী নাগরিক প্রহরীর গ্রুপ পোর্ট্রেট।
তখন অবধি গ্রুপ পোর্ট্রেট মানেই সবার মুখ সমান আলোয়, সারি বেঁধে দাঁড়ানো, স্থির। রেমব্রান্ট সেই ছাঁচ ভেঙে দিলেন। ছবিটি দেখলে মনে হয় প্রহরীরা আমাদের দিকেই ছুটে আসছেন। যেন শোনা যায় গুলির শব্দ, ঢোলের বাদ্য। বারুদের গন্ধও যেন পাওয়া যায়।
পেত্রিয়া নোবল, যিনি এখন আমস্টারডামের রাইকস মিউজিয়ামে এই ছবির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন, বলেছেন, ‘মাইক্রোস্কোপের নিচে এটাকে দেখতে আইসক্রিমের মতো লাগে। রঙের পুরু স্তর, যেন থপথপ করে বসিয়েছেন। কিন্তু ঠিক তার পাশেই কুকুরটি আঁকা মাত্র কয়েকটি টানে— যে কুকুর পটভূমিতে মিলিয়ে যায়, আর লেফটেন্যান্ট এগিয়ে আসে সামনে।’
এটাই রেমব্রান্টের জাদু— কোথাও অতি বিশদ, কোথাও একেবারে সংক্ষিপ্ত, আর তাতেই গল্প বলে যাওয়া। ১৭১৫ সালে এই বিশাল ছবিটি সরাতে গিয়ে দেখা গেল তা দরজা দিয়ে গলছে না। তখনকার মেয়র কী করলেন জানেন? নির্দেশ দিলেন, ‘কেটে ফেল চারপাশ।’ ভাবতে পারেন! রেমব্রান্টের মাস্টারপিস কাঁচি দিয়ে কাটা হলো! হারানো অংশগুলো আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কিন্তু ২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা এক চমৎকার কাজ করলেন। ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে খাইয়ে দেওয়া হলো সমসাময়িক আরেক চিত্রকরের আঁকা নাইট ওয়াচের একটি কপি। কম্পিউটার শিখল রেমব্রান্ট কীভাবে আঁকতেন। তারপর সে নিজেই পুনর্নির্মাণ করল হারানো অংশগুলো। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘আমরা নিউরাল নেটওয়ার্ককে বলি, এটাকে সেভাবে আঁকো যেভাবে রেমব্রান্ট আঁকতেন।’ ভাবা যায়! ৩০০ বছরেরও বেশি আগের একটি কাটা ছবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আবার পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল!
রেমব্রান্টের ছবি চুরির ইতিহাস শুনলে আপনারা অবাক হবেন। তার কাজ জাদুঘর থেকে ৮১ বারের বেশি চুরি হয়েছে! একটি প্রতিকৃতির নামই হয়ে গেছে ‘টেকঅ্যাওয়ে রেমব্রান্ট’— যেন ফাস্টফুডের প্যাকেট! সেটি চারবার চুরি হয়েছে, চারবারই আবার ফিরে এসেছে।
২০০০ সালে স্টকহোমে আরেক নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল। মেশিনগান হাতে তিন ব্যক্তি ঢুকল সুইডিশ ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। দুটি রেনোয়া ও একটি রেমব্রান্টের ছবি নিয়ে তারা স্পিডবোটে পালাল। পালানোর সময় বিভ্রান্তি ছড়াতে রাস্তায় দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল। একেবারে সিনেমার গল্পের মতো, অবশ্য পাঁচ বছর পর ছবিগুলো উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু ইসাবেলা গার্ডনার মিউজিয়ামের সেই ১৩টি মাস্টারপিস আজও নিখোঁজ। এগুলোর সন্ধান দিতে পারলে ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার এখনও মিলতে পারে।
এবার আরেকটি চিত্তাকর্ষক গল্প। ২০০৭ সালে ইয়ান সিক্স নামের একজন রেমব্রান্ট-গবেষক লন্ডনের সথবির একটি নিলাম ক্যাটালগ দেখছিলেন। সেখানে একটি ছবির তলায় লেখা ছিল, ‘রেমব্রান্টের এক ছাত্রের কাজ।’ দাম? মাত্র দেড় হাজার পাউন্ড। ইয়ান সিক্সের মনে সন্দেহ হলো। তার ক্লায়েন্ট ছবিটি কিনলেন। পরে কী জানা গেল? সেটি ছাত্রের নয়, স্বয়ং রেমব্রান্টের আত্মপ্রতিকৃতি!
২০১৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলসের গেটি মিউজিয়াম সেটি ১৬ মিলিয়ন ডলারে কিনল। দেড় হাজার পাউন্ড থেকে ১৬ মিলিয়ন ডলার— শুধু কেউ চিনতে পেরেছিলেন বলে।
আরেকবার ইয়ান সিক্স গেলেন কোলোনের এক নিলাম হাউসে। একটি বাইবেলীয় দৃশ্যের ছবির ওপর নতুন রঙের আস্তরণ চড়ানো ছিল। সন্দেহ হলো। এক্স-রে করাতেই বোঝা গেল— নিচে লুকিয়ে আছে আরও চিত্র!
ইয়ান বললেন, ‘এটা ইন্ডিয়ানা জোন্সের মতো, এ যেন প্রত্নতত্ত্ব, এক অভিযান’। রঙের পরত সরাতেই বেরিয়ে এল একেবারে নিচ থেকে একটি নগ্ন শিশুর অবয়ব। বাইবেলের নিষ্পাপতার প্রতীক। রেমব্রান্ট বাইবেল এত ভালো বুঝতেন ... নগ্ন শিশুর চেয়ে বেশি নিষ্পাপ কী হতে পারে?
রেমব্রান্টের আলো নিয়ে অনেক কথাই হলো। কিন্তু তিনি কীভাবে এই জাদুকরী আলো তৈরি করতেন?
গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন, তার স্টুডিওর জানালায় এক বিশেষ ধরনের কাপড়ের কাঠামো ঝোলানো থাকত। এই কাপড় সূর্যের আলোকে নরম ও বিক্ষিপ্ত করে দিত। আবার জানালার নিচের অংশ বন্ধ থাকত, যাতে আলো কেবল ওপর থেকে আসে। এতে মডেলের মুখ ও শরীর নরম এক আলোর চাদরে আবৃত হতো। তিনি শুধু আলো দিয়ে জায়গা তৈরি করতেন না, আলো দিয়েই আবেগকে ফুটিয়ে তুলতেন। দুঃখ, ভয়, বিষণ্ণতা, ক্ষমা, ভালোবাসা— সবকিছুই এই আলো-ছায়ার নিপুণ খেলা দিয়ে প্রকাশ করতেন।
আর নিজের ছবি? জীবনে কম করে ৮০টি আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন। তরুণ বয়সে নিজেকে রাজা বানিয়েছেন, ভিখারি বানিয়েছেন, কখনও সম্ভ্রান্ত, কখনও সৈনিক— বৈচিত্র্যময় সব ভূমিকায়। কিন্তু শেষ বয়সের প্রতিকৃতিগুলো? শেষ বয়সের আত্মপ্রতিকৃতিগুলো এতটাই সৎ যে দেখলে বুক চিরে যায়। মদ্যপানের ফলে নাক ফোলা, লিভার খারাপ হওয়ায় গাল হলুদ, চামড়ায় আঁচিল— কিছুই লুকোননি।
গবেষকেরা বলেন, ‘প্রকৃতিকে দেখা ছিল তার একমাত্র ধর্ম।’ কোনো অলংকরণ নয়, কোনো মেকি সৌন্দর্য নয়। সত্যিটা। শুধু সত্যিটা।
কিন্তু জীবন যে কেবল সত্যি, কিংবা আলোর গল্প, তা তো নয়। কখনও কখনও নিষ্ঠুরও। সাস্কিয়া মারা যাওয়ার পর রেমব্রান্ট প্রথমে সম্পর্কে জড়ালেন গের্তিয়া ডির্ক্স নামের আয়ার সঙ্গে, যিনি টাইটাসকে বড় করছিলেন। কিন্তু তারপর এলেন হেন্ড্রিকিয়ে স্টফেলস— তরুণী, সুন্দরী, নিরক্ষর এক গৃহপরিচারিকা। গের্তিয়া আদালতে মামলা করলেন এবং ভরণপোষণ জিতে নিলেন। রেমব্রান্ট প্রতিশোধ নিলেন। পাঁচ বছরের জন্য এক নারী সংশোধনাগারে বন্দী করালেন গের্তিয়াকে।
গবেষকেরা বলেন, ‘এটাই রেমব্রান্টের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়। যে মানুষটি এত অসামান্য সংবেদনশীল ছবি আঁকতেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রূঢ় ও ক্ষমাহীনও হতে পারতেন।’
হেন্ড্রিকিয়ে রইলেন তার পাশে। ১৬৫৬ সালে রেমব্রান্ট পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেলেন। তার প্রিয় বাড়ি, শিল্পসংগ্রহ, নিজের আঁকা ছবি— সব নিলামে উঠল। তখন হেন্ড্রিকিয়ে কী করলেন জানেন? একটি শিল্প-বাণিজ্য কোম্পানি খুললেন, আর রেমব্রান্টকে নিজের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিলেন! এতে করে আইনগতভাবে পাওনাদারেরা আর কিছু নিতে পারল না এবং রেমব্রান্ট সম্পূর্ণ নির্ভাবনায় ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করতে পারলেন। এই সময়ের ছবিগুলোই তার জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট কাজ বলে বিবেচিত হয়।
হেন্ড্রিকিয়ে আর টাইটাস— তারাই ছিলেন রেমব্রান্টের শেষ ভরসা। কিন্তু প্লেগের মহামারি আমস্টারডামে আঘাত হানল। ১৬৬৩ সালে হেন্ড্রিকিয়ে মারা গেলেন, ১৬৬৮ সালে টাইটাস। রেমব্রান্ট একা। ভাঙা। নিঃস্ব। কেবল কন্যা কর্নেলিয়া মাঝেমধ্যে খোঁজ নেন। এমন অবস্থায় একজন মানুষ কী আঁকতে পারেন?
রেমব্রান্ট বেছে নিলেন বাইবেলের সবচেয়ে করুণ গল্পটি— ‘পুত্রের প্রত্যাবর্তন’। যে ছেলে সব উড়িয়ে দিয়ে অবশেষে ফিরে এসেছে বাবার কাছে। অন্ধ পিতা তাকে জড়িয়ে ধরেছেন। পিতার দুটি হাত— একটি শক্ত, পুরুষালি; অন্যটি কোমল, প্রায় নারীর মতো। যেন গোটা পৃথিবীর সব ক্ষমা আর ভালোবাসা ওই দুটি হাতে মিলিত হয়েছে। ছবিটার রং গাঢ় বাদামি আর ম্লান সোনালি। অন্ধকার থেকে যে আলো বেরোচ্ছে, তা কোনো জানালা বা প্রদীপ থেকে আসে না। আসে ভেতর থেকে। ক্ষমার আলো। ভালোবাসার আলো। ১৬৬৯ সালে রেমব্রান্ট মারা গেলেন। একা। গরিব। কিন্তু মৃত্যুর আগে পৃথিবীকে দিয়ে গেলেন এমন এক কাজ— যা দেখলে আজও মানুষের চোখ ভিজে যায়।
ভিনসেন্ট ভ্যান গগ একবার লিখেছিলেন, ‘রেমব্রান্ট এমন গভীরে প্রবেশ করেন রহস্যের, যা ভাষায় বলা যায় না। তাকে চিত্রকলার জাদুকর বলাই সঙ্গত।’
আরেকজন শিল্প-গবেষক বলেছেন, ‘এমনকি এত কিছু জানার পরও, এত কাছে আসার পরও, রেমব্রান্ট এক রহস্যই রয়ে যান’। হয়তো সেটাই তার জাদু। আলোর জাদু। অন্ধকারের জাদু। যে জাদু বুঝিয়ে বলা যায় না, অনুভব করা যায়। ৪০০ বছর আগের এক মিলারের ছেলে, যে ছোট্ট জানালা দিয়ে সূর্যের আলো দেখতেন— সেই আলো আজও আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।








