শিশু জাতির ভবিষ্যৎ নাকি বর্তমান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমরা ছোটবেলা থেকেই একটি বাক্য শুনে আসছি– ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’। রাষ্ট্রপ্রধানের ভাষণ, বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থার প্রচার কিংবা আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য– প্রায় সর্বত্রই এই বাক্যটি উচ্চারিত হয়। এর উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সমাজকে শিশুদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করাই এর লক্ষ্য। কিন্তু একটু থেমে ভাবুন; যে শিশু আজ ক্ষুধার্ত, নির্যাতনের শিকার, যুদ্ধ ও দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত, দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসার অপেক্ষায়, শিক্ষাবঞ্চিত– সে কীভাবে শুধু ‘ভবিষ্যৎ’! সে তো বর্তমান। আজ তার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তবু আমরা তাকে প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’ বলেই পরিচয় করিয়ে দিই।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি গড়বে– এটি নিঃসন্দেহে সত্য। তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিচয়টিই কি শিশুর প্রধান পরিচয়? নাকি তার প্রথম পরিচয়– সে একজন বর্তমানের মানুষ? এই প্রশ্নটি শুধু ভাষার নয়; এটি শিশু অধিকার, রাষ্ট্রনীতি এবং নৈতিক দর্শনের প্রশ্ন। কারণ, ভাষা শুধু বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না; ভাষা বাস্তবতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করে।
১৯৮৯ সালের জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UN Convention on the Rights of the Child)-এর কোথাও শিশুদের ‘future citizens’ বা ‘ভবিষ্যতের নাগরিক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। বরং সনদটি শুরু থেকেই শিশুকে একজন মানুষ, একজন ব্যক্তি এবং একজন অধিকারধারী (rights holder) হিসেবে দেখেছে। UNICEF তাই স্পষ্ট ভাষায় বলছে, ‘Children are human beings and are the subject of their own rights.’
অর্থাৎ শিশু কোনো করুণার পাত্র নয়, কোনো ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের বস্তু নয়, কোনো ‘হতে থাকা মানুষ’ও নয়। সে আজকের একজন মানুষ। আর সে কারণেই তার অধিকার আজই নিশ্চিত করতে হবে। শিশু তার মা-বাবার সম্পত্তি নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ নয় কিংবা কেবল ‘বড় হয়ে উঠতে থাকা মানুষ’ও নয়। সে একজন পূর্ণ মানবসত্তা, যার নিজস্ব অধিকার আছে। সেই অধিকার তাকে ভবিষ্যতে অর্জন করতে হবে না; জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তা তার প্রাপ্য।
যখন শিশুর পরিচয় প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন শিশুর মূল্যায়ন তার বর্তমান মানবিক মর্যাদার পরিবর্তে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তিতে হতে শুরু করে। অর্থাৎ, সে বড় হয়ে দক্ষ কর্মী হবে, অর্থনীতিতে অবদান রাখবে, রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে– এই সম্ভাবনাগুলোই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অথচ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেখানে শিশুর মূল্য তার সম্ভাবনায় নয়; তার অস্তিত্বে। সে আজ একজন মানুষ বলেই তার অধিকার আছে। তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য ভবিষ্যতের কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক লাভের যুক্তি দেখানোর প্রয়োজন নেই।
যখন শিশুর পরিচয় প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন শিশুর মূল্যায়ন তার বর্তমান মানবিক মর্যাদার পরিবর্তে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তিতে হতে শুরু করে
ভবিষ্যতের জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়া তুলনামূলক সহজ। বলা সহজ, ‘আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ব।’ কিন্তু আজকের শিশুর জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দ করা, প্রতিটি হাসপাতালে শিশুবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা, নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা, খেলার মাঠ সংরক্ষণ করা, দূষণ কমানো, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। তাই ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটি কখনো কখনো বর্তমানের জরুরি দায়বদ্ধতাকে পিছিয়ে দেওয়ার একটি আরামদায়ক ভাষায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাস্তবতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়— শিশুর আনন্দ, বঞ্চনা কিংবা যন্ত্রণা ভবিষ্যতের বিষয় নয়; সবই বর্তমানের। অপুষ্টি, যুদ্ধ, বায়ুদূষণ, সড়ক দুর্ঘটনা বা নির্যাতন— এসবের শিকার শিশু ভবিষ্যতে নয়, আজই হচ্ছে। তাই শিশু সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত— সে আজ কেমন আছে? একটি রাষ্ট্র যদি শিশুকে প্রধানত ভবিষ্যতের মানবসম্পদ হিসেবে দেখে, তাহলে শিশুতে বিনিয়োগের প্রধান যুক্তি হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের লাভ। কিন্তু একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র শিশুকে বর্তমানের মানুষ হিসেবে দেখে।
‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’— এই বাক্যটি ভুল নয়। কিন্তু এটি অসম্পূর্ণ। কারণ, এটি শুধু শিশুর ভবিষ্যৎ পরিচয়কে সামনে আনে, বর্তমান পরিচয়কে নয়। অথচ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দর্শন আমাদের ভিন্ন একটি শিক্ষা দেয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ, UNICEF-এর অধিকারভিত্তিক অবস্থান এবং ‘Children are not just the future; they are the present’— এই নীতিগত ঘোষণা একই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: শিশু প্রথমে বর্তমানের অধিকারসম্পন্ন মানুষ; ভবিষ্যৎ তার পরের পরিচয়।
এই উপলব্ধির একটা বাস্তব তাৎপর্য আছে। যদি আমরা সত্যিই শিশুকে বর্তমানের মানুষ হিসেবে স্বীকার করি, তাহলে শিশু আর শুধু শিশু মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয় থাকবে না। হাসপাতাল নির্মাণ, নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহন, সড়ক নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বিচারব্যবস্থা, ডিজিটাল নিরাপত্তা কিংবা জাতীয় বাজেট— রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিত: এই সিদ্ধান্ত শিশুর ওপর কী প্রভাব ফেলবে? এটাই আসলে শিশু অধিকার সনদের ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ।
সম্ভবত এখানেই আমাদের ভাষারও একটা অধিকারভিত্তিক সংস্কার প্রয়োজন। কারণ ভাষা শুধু চিন্তা প্রকাশ করে না; ভাষা চিন্তার দিকও নির্ধারণ করে। আমরা যদি প্রতিনিয়ত শিশুকে প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’ বলে দেখি, তাহলে তার বর্তমানের জরুরি চাহিদা অগ্রাধিকারের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কিন্তু যদি আমরা তাকে প্রথমেই বর্তমানের একজন মানুষ হিসেবে দেখি, তাহলে তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ আর ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নয়; সেগুলো রাষ্ট্রের অবিলম্বে পালনীয় দায়িত্বে পরিণত হয়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ




