প্রিয় পুত্রগণ!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি নির্ভেজাল কৌতুক
সাত বছরের সোহান তাকিয়ে আছে চিড়িয়াখানার খাঁচার দিকে। খাঁচায় দুটো গাধা— মা গাধা আর সন্তান গাধা। সেকেন্ড পাঁচেক ও দুটোকে দেখার পর পাশে দাঁড়ানো সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, গাধারা কি বিয়ে করে?’
‘করে বাবা, করে।’ কিছুটা বিষাদ গলায় সোহানের আঙুলটা ছেড়ে দিয়ে বাবা বললেন, ‘গাধারাই বিয়ে করে।’
বাবা কাকে বলে
বিয়ে করলেই একজন পুরুষ বাবা হন একদিন।
আর অধিকাংশ বাবার প্রথম চাওয়া থাকে— তার সন্তানটা যেন তার মতো হয়। তাহলে প্রথমেই যে প্রশ্নটা মনে জাগে— চেঙ্গিস খাঁ কি চেয়েছিলেন তার সন্তান তার মতো হোক? একদিন সেও চার কোটি মানুষ খুন করুক?
ব্যাপারটা শুধু অন্তর্যামী জানেন, আমরা কেউ অন্তর্যামী নই। তবে সেই ছোটকাল থেকে আমরা এটা তো জেনে এসেছি— ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।
ফল কী দাঁড়াল তাহলে— একটি শিশু, সন্তান বা পুত্র যেসব অপরাধ করে, তা তার পিতার চাওয়ারই প্রতিফলন?
গ্রিক পুরাণের গল্প
কুৎসিত এক খোঁড়া শিশু জন্মেছিল অলিম্পাসের দেবরাজ জিউসের ঔরসে, হেরার গর্ভে। সঙ্গে সঙ্গে মা হেরা অলিম্পাস পর্বতের চূড়া থেকে ছুড়ে ফেলে দেন সদ্য প্রসূত ছেলে হেফাইস্টোসকে। পর্বত থেকে গড়িয়ে পড়তে পড়তে সে আছাড় খায় লেমনোস দ্বীপে। তাৎক্ষণিক দুটো পা ভেঙে যায় তার চিরতরে। শিশু মনটা কষ্টে ভরে যায়, ক্রোধও জমে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। ওপর থেকে স্রষ্টা তা দেখে অদ্ভুত এক প্রতিভা দিয়ে দেন তাকে— ভালোবেসে, করুণায়।
আগ্নেয়গিরির গর্ভে বছরের পর বছর লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করতে লাগল হেফাইস্টোস। শক্ত ধাতু গলানো শিখল সে, হাতুড়ি বানালো প্রথমে। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করতে লাগল ওই হাতুড়ি দিয়েই। তারপর একদিন সোনার এমন একটা সিংহাসন বানালো, চোখ ধাঁধিয়ে গেল তা দেখে।
মা হেরার জন্য উপহারস্বরূপ সেই সিংহাসনটা অলিম্পাসে পাঠালেন হেফাইস্টোস। খুব খুশি হলেন হেরা। আপ্লুত হয়ে বসে পড়লেন সেই সিংহাসনে। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটল— সিংহাসনটা আটকে ফেলল তাকে, অদৃশ্য এক শিকলে। উঠতে পারলেন না তিনি, নড়তেও পারলেন না সামান্য।
বিপদ দেখে সব দেবতা চলে গেলেন হেফাইস্টোসের কাছে। অনুরোধ করলেন, ‘ফিরে এসো, হেফাইস্টোস। তোমার মাকে বাঁচাও, মুক্ত করো তাকে।’
শিরদাঁড়া সোজা করলেন হেফাইস্টোস। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘আমার কোনো মা নেই!’
আমাদের পুত্রগণ
সাজেদুল হোসেন দীপু চৌধুরীকে সম্ভবত আমরা ভুলে গেছি; কিন্তু উত্তরার লোকজন এখনো ভোলেননি তাকে। আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর ছেলে তিনি, মারা গেছেন ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বরে। অন্যের জায়গা দখল করে বিশাল একটা মার্কেট বানিয়েছিলেন। করেছিলেন আরও অনেক কিছু।
নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের একজন সেলিম ওসমান, সন্তান আজমেরী ওসমান। তার সরাসরি নেতৃত্বে ও তার টর্চার সেলে ত্বকী নামে এক তরুণকে হত্যা করা হয়।
সেলিম না বলে যদি হাজী সেলিম বলা হয়, তাহলে খুব সহজেই সবার চেনা মানুষ। তার পুত্র ইরফান সেলিম। নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর ওপর হামলা করেন তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে। তার পুরান ঢাকার ত্রাস বলতে বাপের সঙ্গে নিজে ছিলেন সমানতালে।
নোয়াখালীর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের জুন মাসে ঢাকার বনানীতে গাড়িচাপায় সেলিম ব্যাপারী নামে এক পথচারীকে মেরে ফেলেন তিনি। পরে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার দুই ছেলে রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার। ২০২০ সালের মে মাসে ৫০০ কোটি টাকা ঋণের অনুমোদন না পেয়ে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডিকে নিজ বাসায় আটকে রেখে নির্যাতন করেন তারা।
আর অতি সম্প্রতি ঘটনাকারী নারায়ণগঞ্জ যুবদলের সাবেক নেতা খাইরুল ইসলাম সজীবকে তো আমরা সবাই চিনেছি, জেনেছি। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের ছেলে তিনি। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর কাছে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে।
এ রকম গুণধর পুত্র আরও আছে, আরও আসবে ভবিষ্যতে।
আরও কিছু পুত্রধন
বাজারের ভেতর ছোট্ট একটা ছেলে গোপাল গোপাল বলে কাকে যেন ডাকছে চিৎকার করে। আশপাশ থেকে কয়েকজন থামালো তাকে। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘ডাকছো কাকে?’
ছেলেটি উত্তর দিল, ‘বাবাকে।’
‘বাবাকে কেউ এভাবে নাম ধরে ডাকে!’
‘ডাকে।’ ভিড় ঠেলে গোপাল ভাঁড় সামনে এসে বললেন, ‘গোপাল ভাঁড়ের ছেলে ডাকে। আর কারও ছেলে ডাকে না।’
একটা প্রশ্ন হচ্ছে— এত এত অপকর্ম কি শুধু ক্ষমতাসীনদের ছেলেরাই করে? আর কেউ করে না।
করে।
অপকর্ম করে কোনো সাধারণ পিতার সন্তানরাও। তাই তো আমরা দেখি একজন সচিব, একজন চিকিৎসকের মা একা একা মরে পড়ে থাকেন একলা বাসায়, একলা বিছানায়। পচে যাওয়ার আগপর্যন্ত কেউ খোঁজ নেয় না তার। এক প্রকৌশলী, একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার বাবাকে কাঁদতে দেখা যায় বিষাদ বৃদ্ধাশ্রমে! সাধারণ এক পরিবারের সাধারণ ছেলেই হয় দুর্দান্ত নেশাখোর, প্রচণ্ড ঘুষখোর, রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠনকারী, সিরিয়াল ধর্ষক!
দারিয়ুশ ছিল মায়ের ছোট সন্তান। সারাক্ষণ মায়ের সেবা করত। বড় দুই ভাই কখনো করত না। মায়ের সেবায় বাসায় রইল সে একদিন, বড় দুই ভাই গেল বাজারে। এক ফকির এসে সাহায্য চাইলে দারিয়ুশ তাকে রুটি দিল, হালুয়া দিল, পানি দিল। ফকির তাকে একটা ছেঁড়া থলি দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।
দারিয়ুশ ভাবতে লাগল— এটা তাকে কী দিল ফকিরটি! চিন্তা করতে করতে থলের ভেতর হাত ঢুকাল সে। বেরিয়ে এলো একটি সোনার মোহর। আবার দিতেই আরেকটা। খবর পেয়ে ছুটে এলো বড় দুই ভাই। থলেটি কেড়ে নিয়ে হাত ঢুকাল সে, বেরিয়ে এলো একটা ইঁদুর। মেজো ভাই হাত ঢুকাল, বেরিয়ে এলো একটা তেলাপোকা।
থলেটা ফেরত নিল দারিয়ুশ। তারপর থলেতে হাত ঢুকিয়ে আরেকটি সোনার মোহর বের করে হাসতে হাসতে বলল, ‘থলে জানে— কাকে কোন ধরনের জিনিস দিতে হবে।’
আমাদের স্রষ্টাও তো তাহলে জানেন— কাকে কোন ধরনের সন্তান দিতে হবে!
শাহজাহান নামের অর্থ পৃথিবীর রাজা। এই পৃথিবীর রাজা একদিন তার নিজ পুত্র আওরঙ্গজেব দ্বারা আগ্রার এক দুর্গে গৃহবন্দি হন এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয় ১৬৬৬ সালে।
আমরা যারা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি
স্রষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুনিয়ার তাবৎ বাবা ও তাদের পুত্রগণ। স্রষ্টা তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর নিচু স্বরে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কারও কারও বাবার অনেক পাপ জমা হয়েছে। কারও কারও ছেলের জমা হয়েছে অনেক অন্যায়। শাস্তি হবে। তোমাদের পরস্পরের এসব শাস্তি উভয়ই পরস্পরকে সমানভাবে ভোগ করতে হবে এখন, যেহেতু তোমরা বাবা আর সন্তান।’ স্রষ্টা একটু থেমে বলবেন, ‘তোমাদের কিছু বলার আছে?’
আমি নিশ্চিত, পরস্পরের প্রতি ঘৃণাভরে বাবারা তখন বলবেন— আমার কোনো ছেলে নেই! ছেলেরা বলবে— আমার কোনো বাবা নেই! যেমনটা হেফাইস্টোস বলেছিল তার মাকে।




