সচিবালয় সরানোর চেয়ে ঢাকা বাঁচানো জরুরি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখা এখন আর শুধু নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রতিদিন বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ, দীর্ঘ হচ্ছে যানজট, বাড়ছে বায়ুদূষণ; একই সঙ্গে কমছে গাছপালা, পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান। খাল, জলাশয় ও নিচু জমি ভরাট হওয়ায় বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে রাজধানীর অবশিষ্ট উন্মুক্ত স্থানগুলোও কি আরও স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হবে, নাকি নগরবাসীর সুস্থ জীবনযাপনের স্বার্থে সেগুলো সংরক্ষণ করা হবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী জনপ্রতি অন্তত ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত জায়গা প্রয়োজন; অথচ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকায় তা মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে এক বর্গমিটার, আর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শূন্য দশমিক ১১ বর্গমিটার বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় যা নগণ্য। দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪১টিতে কোনো পার্ক বা খেলার মাঠই নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল ও জনসংখ্যার চাপে গত কয়েক দশকে ঢাকার অর্ধেকের বেশি সবুজ অঞ্চল হারিয়ে গেছে; খাতা-কলমে অবশিষ্ট যতটুকু আছে, অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও দখলের কারণে সেখানেও সাধারণ নাগরিক বা শিশুদের অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। এই বাস্তবতায় আগারগাঁওয়ের মাঠের মতো বিরল উন্মুক্ত পরিসর কোনো বড় স্থাপনার দখলে চলে গেলে সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এম জামাল উদ্দিন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে মাঠটিকে ঢাকার একটি সম্ভাব্য অক্সিজেন ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। মুক্তচিন্তক রাশেদ মোশাররফ চৌধুরী সেখানে সচিবালয় স্থানান্তরকে বোকামি বলে আখ্যায়িত করেছেন; তার মতে, এতে যানজট ও নিরাপত্তা সংকট কমার বদলে বাড়বে। তিনি পূর্বাচলের মতো পরিকল্পিত এলাকায় প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে কাজী রহমান আড়িয়ল বিলকে কেন্দ্র করে সড়ক, রেলযোগাযোগ ও পদ্মা নদীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক নগরায়ণের ধারণা তুলে ধরেছেন; কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী হেমায়েতপুর ও সাভারসহ ঢাকার কাছাকাছি উপযুক্ত স্থানে প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলেছেন।
সচিবালয়ের অবস্থান নির্ধারণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নগর পরিকল্পনার দর্শন প্রকাশ পায়। তাই বিষয়টি শুধু একটি ভবনের স্থান পরিবর্তন নয়; প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগরের গুরুত্ব শুধু প্রশাসনিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবন, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান; রয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এর পাশেই একটি উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রশাসনিক কমপ্লেক্স গড়ে উঠলে যান চলাচল ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচল, শিক্ষা ও গবেষণার মুক্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তা ছাড়া অত্র এলাকায় বিশেষভাবে রয়েছে একগুচ্ছ হাসপাতাল, ইনস্টিটিউট ও জরুরি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। অতিরিক্ত নিরাপত্তাবেষ্টিত সচিবালয় এখানে গড়ে উঠলে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি যানবাহনের চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
যে শহরে জনপ্রতি উন্মুক্ত স্থান এক বর্গমিটারেরও কম, সেখানে আরও একটি বড় প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণের অর্থ হলো নাগরিকদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগটুকুও সংকুচিত করা
প্রশাসনিক কার্যক্রমকে মূল রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার বেশ কিছু আন্তর্জাতিক উদাহরণ রয়েছে। যেমন মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুরের চাপ কমাতে পুত্রজায়াকে পরিকল্পিত প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া সিউলের চাপ কমাতে সেজং শহরে কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করেছে। আবার ব্রাজিল ১৯৬০ সালে রিও ডি জেনিরো থেকে পরিকল্পিত ব্রাসিলিয়া শহরে তাদের প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তর করে। তবে প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। তাই সরাসরি কোনো মডেল অনুকরণ না করে সেসব দেশের অভিজ্ঞতার আলো থেকে আমাদের নিজস্ব বাস্তবতায় টেকসই সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিসংগত।
আমাদের সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণী রক্ষার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অর্থ শুধু বৃক্ষরোপণ নয়; নগর পরিকল্পনা ও সরকারি প্রকল্পের সিদ্ধান্তেও পরিবেশগত বিবেচনাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। যে শহরে জনপ্রতি উন্মুক্ত স্থান এক বর্গমিটারেরও কম, সেখানে আরও একটি বড় প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণের অর্থ হলো নাগরিকদের শ্বাস নেওয়ার অবশিষ্ট সুযোগটুকুও সংকুচিত করা।
এখানে একটি সত্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই— প্রশাসনিক ভবন প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো উপযুক্ত স্থানে গড়ে তোলা সম্ভব; কিন্তু একবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া জলাভূমি, নষ্ট হয়ে যাওয়া বাস্তুসংস্থান কিংবা হারিয়ে যাওয়া সবুজ অঞ্চল পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। গাছ লাগিয়ে কিছুটা সবুজ ফিরিয়ে আনা যায়, কিন্তু মাটির নিচের পানি ধারণক্ষমতা, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা বাস্তুতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই সিদ্ধান্তের সময়সীমা ও স্থান নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সচিবালয় কোথায় হবে, তা নয়; আমরা ঢাকাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন শহর হিসেবে রেখে যেতে চাই, সেটিও। প্রশাসনিক ভবন প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত স্থানে নির্মাণ করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জলাভূমি, সংকুচিত সবুজ অঞ্চল কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই শেরেবাংলা নগরে মাঠ রক্ষা, ঢাকার পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এই তিন লক্ষ্যকে পরস্পরবিরোধী না ভেবে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সচিবালয়ের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন হোক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, জনশুনানি ও সাংবিধানিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে; আর ঢাকার অবশিষ্ট সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান বেঁচে থাকুক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শ্বাস নেওয়ার জায়গা হয়ে। ঢাকাকে বাঁচানোর পরিকল্পনা শুরু হোক এমন সিদ্ধান্ত থেকে, যা বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারও সুরক্ষিত রাখে।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়



