নদী ইলিশ আর জেলের দীর্ঘশ্বাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইলিশের জীবন এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে বেড়ে ওঠা মা ইলিশ প্রতি বছর স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে ফিরে আসে মেঘনা-পদ্মার মিঠা পানিতে, ডিম ছাড়ার জন্য। সেই ডিম থেকে জন্ম নেওয়া জাটকা মার্চ-এপ্রিলে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে যায় সাগরে, বড় হয়ে একদিন ফিরে আসবে বলে। এই আসা-যাওয়ার ছন্দে শতাব্দী ধরে বাঁধা উপকূলের লাখো জেলের জীবন। নদী ইলিশকে পথ দেয়, ইলিশ জেলেকে খাদ্য দেয়, জেলে ইলিশ তুলে দেয় আমাদের পাতে। এ বছর সেই চক্র যেন ভেঙে পড়েছে। নদী পথ হারাচ্ছে, ইলিশ ফিরছে না, জেলে ফিরছেন খালি হাতে।
ভরা মৌসুমের ঘাটে দাঁড়ালেই ভাঙনের শব্দ শোনা যায়। তিন বছর আগে চাঁদপুরের আড়তে জুলাইয়ের পর দিনে গড়ে দুই হাজার মণ ইলিশ উঠত, এবার আড়াইশ মণও নয়। বরিশালের পোর্ট রোড মোকামে সম্প্রতি এক দিনে উঠেছে ৫০ মণের মতো। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ ধরা পড়েছিল, দুই বছরে তা প্রায় ৭১ হাজার টন কমে পাঁচ লাখ টনে নেমেছে।
ইলিশ কেন ফিরছে না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তার যাত্রাপথে। প্রথমত, সাগরে নামার পথেই জাটকার সামনে জালের দেয়াল। নদীতে কারেন্ট জাল, মোহনার মুখে নিষিদ্ধ বেহুন্দি জাল। যে জাটকা এসব পেরিয়ে যায়, উপকূলের ৪০ মিটারের কম গভীরতার অগভীর সাগরই তার বেড়ে ওঠার আশ্রয়। অথচ সেই আশ্রয়েই এখন সবচেয়ে বড় বিপদ। গত দুই বছরে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম উপকূলে কয়েক হাজার কাঠের ট্রলারকে স্থানীয় প্রযুক্তিতে ট্রলিং ট্রলারে রূপান্তর করা হয়েছে। নিষিদ্ধ ছোট ফাঁসের জাল টেনে এরা অগভীর সাগর ছেঁকে নিচ্ছে, সঙ্গে উঠে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা। শুধু পটুয়াখালীর মহিপুর-আলীপুরেই এমন ট্রলিং বোট গত বছরের ৪০ থেকে ৪৫টি থেকে বেড়ে এ বছর প্রায় ৬০টি। গভীর সাগরের জন্য অনুমোদিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারও মাছ না পেয়ে ঢুকে পড়ছে এ অগভীর জলে। যে মাছ বড় হয়ে নদীতে ফিরত, সে আর ফেরার সুযোগই পাচ্ছে না।
আইন মেনে সাধারণ জেলে যখন ঘাটে নৌকা বেঁধে বসে থাকেন, তখন অবৈধ ট্রলিং বোট অগভীর সাগর ছেঁকে নিয়ে যায়। নিয়ম মানার দাম দেন গরিব জেলে, নিয়ম ভাঙার লাভ তোলেন প্রভাবশালীরা
ফেরার পথে নদী আর আগের মতো স্বাগত জানায় না। উজানে যেতে ইলিশের অন্তত ১০ মিটার গভীর পানি দরকার, যা এখন অনেক জায়গায় নেই। পদ্মায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে প্রবাহ ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ কমলে ইলিশের প্রাপ্যতা অন্তত ২৬ শতাংশ কমে যায়। মেঘনার মোহনায় ইলিশের প্রবেশমুখে জেগে উঠছে ডুবোচর। নদীর জল আর ইলিশকে খাওয়াতে পারছে না। মেঘনায় ইলিশের খাদ্য প্ল্যাংকটন কমেছে ৬৮ শতাংশ, যার বড় কারণ দূষণ। এক গবেষণায় উঠে এসেছে উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু ইলিশের জীবনচক্রের জন্য প্রতিকূল। ১৯০১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, অথচ ইলিশের প্রজননের আদর্শ তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি। ইলিশের কষ্ট তাই আসলে নদীর কষ্ট, সাগরের কষ্ট, আমাদের পুরো জলজ পরিবেশের কষ্ট।
আর এসব কষ্ট শেষ পর্যন্ত জমা হয় জেলের ঘরে। বরগুনায় একটি ট্রলার একবার সাগরে পাঠাতে খরচ হয় প্রায় এক লাখ টাকা। সেখানকার জেলেরা চার দিন নদীতে কাটিয়েও খরচের টাকা তুলতে পারছেন না। ভোলার চরফ্যাশনের এক জেলে এ মৌসুমে ৬৬ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেও দাদনের কিস্তি, আড়তের ৭ শতাংশ কমিশন আর জাল-জ্বালানির খরচ মিটিয়ে প্রায় শূন্য হাতে ঘরে ফিরেছেন। সংসার চালাতে আবার নিতে হয়েছে নতুন ঋণ। একটি খারাপ মৌসুম এভাবেই একজন জেলেকে বছরের পর বছরের দেনায় বেঁধে ফেলে।
নিষেধাজ্ঞার দিনগুলো আরও কঠিন। এ বছর ৫৮ দিনের সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞায় একজন জেলে পেয়েছেন ৭৭ কেজি চাল। নগদ সহায়তা নেই, অথচ এনজিওর কিস্তি থেমে থাকেনি। ভোলার লালমোহনের একটি ইউনিয়নে ৩ হাজার ৩৫৫ জন নিবন্ধিত জেলের জন্য চাল বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ হাজার জনের। কার্ড হাতে নিয়েও কেউ কেউ শুনেছেন, তাদের চাল নাকি আগেই কেউ তুলে নিয়েছে। আর যাদের কার্ডই নেই? চরফ্যাশনে প্রায় ৯০ হাজার জেলের মধ্যে প্রায় ৪৬ হাজারই অনিবন্ধিত, বরগুনায় নিবন্ধনের বাইরে ৩০ থেকে ৪০ হাজার। নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্যও সমান, সহায়তা নেই। সবচেয়ে নির্মম পরিহাস, আইন মেনে সাধারণ জেলে যখন ঘাটে নৌকা বেঁধে বসে থাকেন, তখন অবৈধ ট্রলিং বোট অগভীর সাগর ছেঁকে নিয়ে যায়। নিয়ম মানার দাম দেন গরিব জেলে, নিয়ম ভাঙার লাভ তোলেন প্রভাবশালীরা।
দুই দশক আগে জাটকা রক্ষা করেই আমরা ইলিশ ফিরিয়েছিলাম। আজ দরকার ইলিশ, পরিবেশ আর জেলেকে একসঙ্গে দেখার দৃষ্টি। উপকূলের ৪০ মিটারের কম গভীরতার জলসীমাকে ইলিশের নার্সারি হিসেবে সুরক্ষা দিয়ে সেখানে সব ধরনের ট্রলিং বন্ধ করতে হবে, থামাতে হবে কাঠের ট্রলারকে ট্রলিং বোটে রূপান্তর।
নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন ও বিক্রি উৎসেই বন্ধ করতে হবে। নদীকে তার প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে দিতে হবে। ইলিশের অভিবাসন পথের নাব্য, ডুবোচর ও দূষণের পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে, মোহনার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কারখানার বর্জ্য নিয়মিত পরিবীক্ষণ করতে হবে আর বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর ঘিরে প্রস্তাবিত নতুন অভয়াশ্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। জেলেকে সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। সব প্রকৃত জেলেকে নিবন্ধনের আওতায় এনে নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য ও নগদ সহায়তা দিতে হবে, বিতরণে আনতে হবে স্বচ্ছতা আর ওই সময়ে ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখতে হবে। সহজ শর্তের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ আর মধ্যস্বত্বের স্তর কমিয়ে জেলেকে দাদনের ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে হবে।
আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। মা ইলিশ তখন নিশ্চিন্তে ডিম ছাড়বে, এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু সেই একই দিনগুলোতে উপকূলের কোনো ঘরে একজন জেলে দাদনের হিসাব মেলাতে না পেরে নির্ঘুম রাত কাটাবেন। ইলিশকে বাঁচাতে হলে সেই জেলেকেও বাঁচাতে হবে আর দুজনকে বাঁচাতে হলে বাঁচাতে হবে নদীকে। নদী, ইলিশ আর জেলে একই সুতোয় গাঁথা। এ সুতো ছিঁড়ে গেলে শুধু একটি মাছ হারাবে না, হারাবে একটি জাতির পরিচয়, লাখো পরিবারের জীবিকা আর আমাদের নদীমাতৃক সংস্কৃতির প্রাণ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, অ্যাকোয়াকালচার বিভাগ, শেকৃবি



