প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের প্রতিও নজর দিক রাষ্ট্র

সংগৃহীত ছবি
সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় বার্তা দিয়ে গেছে। বন্যা ও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের এই অভূতপূর্ব প্রতিরোধটি ছিল আত্মসম্মানের। ফলে রাষ্ট্রকে একসময় পিছু হটতেই হয়েছে। তবে এই সাফল্য একটি বড় প্রশ্ন ও আত্মোপলব্ধিও সামনে এনেছে— রাজধানীর কয়েক দিনের সাময়িক দুর্ভোগ যদি সরকারকে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে, তবে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছরের পুঞ্জীভূত দুর্ভোগ কেন এখনো জাতীয় অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পায় না? তাহলে জন্মস্থানই কি তবে চিরকাল ঠিক করে দেবে এ দেশের শিশুদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার?
হাওরের প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ দৈনন্দিন যাত্রা নয়; এটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার অধিকার অর্জনের এক অবিরাম সংগ্রাম। বছরের দীর্ঘ সময় উত্তাল ঢেউ, প্রলয়ংকরী ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। অনেক গ্রামে আজও প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক সংকট অত্যন্ত তীব্র, আর উচ্চশিক্ষার সুযোগ তো সেখানে চরমভাবে সীমিত।
এই চরম বৈষম্যের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক প্রতীক ২০১০ সালের সুনামগঞ্জের শৈলচাপড়া ট্রলারডুবি, যেখানে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে আট শিক্ষার্থীসহ ১৬ তাজা প্রাণ অকালে হারিয়ে গিয়েছিল। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও হাওরে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী নৌপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি, যা একটি পুরো অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই কাঠামোগত অবহেলা আমাদের সংবিধানের সমঅধিকার চেতনার স্পষ্ট পরিপন্থী।
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন আমাদের স্পষ্ট শিখিয়েছে, অধিকার কেউ কখনো থালায় সাজিয়ে উপহার দেয় না, তা প্রশ্ন তুলে আদায় করতে হয়। এবার সেই প্রতিবাদের ভাষা রাজধানীর রাজপথ থেকে হাওরের অবহেলিত জলপথে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। হাওরের শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘদিনের ক্ষত কোনো মৌখিক সান্ত্বনা কিংবা রাজনৈতিক সৌজন্যতায় সারবে না। এর জন্য প্রয়োজন অবিলম্বে পৃথক হাওর শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন, সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ নৌযান চালুকরণ, দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ এবং উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের অবিলম্বে এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের প্রতি কতটা ন্যায়বিচার করল, দিনশেষে সেটাই হোক দেশের উন্নয়নের প্রকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য মাপকাঠি।
লেখক: সাংবাদিক, সুনামগঞ্জ




