শ্রাবণের মেঘে হোক কলরব

প্রেমের গান দিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত কী করে? প্রেম করে? খায়? নাকি প্রেম ফুরালে ভুলে যায়, অথবা বিরহের আশ্রয় করে নেয়? ইতিহাসের পাতায় হাত বোলালে এক পরম আশ্চর্য বৈপরীত্য চোখে পড়ে। কত গান কেবল হৃদয়ের একান্ত আকুতি, বিরহ কিংবা বিশুদ্ধ প্রেমের পংক্তি হয়ে জন্ম নিয়েছিল; অথচ সময়, রাজনীতি আর ব্যবস্থার মোড়ে এসে সেই নরম সুরই রূপ নিয়েছে অবাধ্য বিপ্লব ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো হাতিয়ারে। এস্থেটিকস বা নান্দনিকতার শক্তিটা ঠিক এখানেই— শিল্প যখন নিজের রূপক ও সৌন্দর্যের ভেতরে সত্যকে ধারণ করে, তখন তা আর কেবল ব্যক্তির থাকে না, হয়ে ওঠে সামষ্টিক চেতনার অবিনাশী কণ্ঠস্বর। প্রেম আর স্বাধিকার আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ; তাই প্রেমিকার কাছে অধিকার চাওয়ার গানই দিনশেষে শাসকের রাজপ্রাসাদ কাঁপিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা রাখে।
বিশ্বসঙ্গীতের কালপঞ্জি সাক্ষী, যেখানেই স্বৈরাচার আর সাংস্কৃতিক নিপীড়ন রাজত্ব করতে চেয়েছে, সেখানেই প্রেমের গান রূপ নিয়েছে অহিংস প্রতিরোধের সমান্তরাল রাজনীতিতে। ভাবুন ১৯৮৯ সালের বেইজিংয়ের কথা। তিয়ানআনমেন স্কয়ারে ট্যাঙ্ক আর সাঁজোয়া যানের সামনে দাঁড়িয়ে চীনা তরুণরা যখন স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছিল, তখন তাদের কণ্ঠে বেজে উঠেছিল সুই জিয়ানের এক মিষ্টি প্রেমের গান— ‘আমার তো দেওয়ার মতো কিছুই নেই, শুধু একজোড়া খালি হাত!’ কিংবা উত্তর ইতালির ধানক্ষেতে প্রেমিকের বিদায়বেলায় লেখা বিরহের গান ‘বেলা চাও’— যা আজ বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সুর।
ব্রাজিলের সামরিক স্বৈরাচারের দিনগুলোতে গায়ক চিকো বুয়ার্কে সেন্সর বোর্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে লিখেছিলেন ‘Apesar de Você’— আপাতদৃষ্টিতে এক দাম্ভিক প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লেখা ব্রেকআপের গান, যা মূলত ছিল ফ্যাসিবাদের পতন কামনায় এক গভীর রাজনৈতিক রূপক। আবার কিউবার হোসে মার্তির প্রেমানুভূতির কবিতা থেকে উঠে আসা ‘Guantanamera’ কীভাবে যেন রূপ নিয়েছিল সাম্য আর স্বাধীনতার বিশ্বজনীন লড়াইয়ে। এভাবেই ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে মার্কিন সিভিল রাইটস আন্দোলন—প্রতিটি বাঁকে রোমান্টিক নান্দনিকতা বারবার রুখে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে।
২০১৪ সালে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যখন পুলিশি নির্যাতন আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে উত্তাল, তখন রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছিল অর্ণবের এক নরম সুর— ‘হোক কলরব’। রাজীব আশরাফের লেখা একটি সাধারণ প্রেমের ব্যাকুলতার গান রাতারাতি বদলে দিয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা। কোনো হিংসা নয়, ইটের জবাব পাথর দিয়ে নয়; হাজার হাজার তরুণ হাতে গিটার নিয়ে, আলোর মিছিল করে এক মিষ্টি প্রেমের সুরকে বানিয়ে নিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় ঢাল।
একই সুরের ছায়া আমরা সম্প্রতি দেখলাম বাংলাদেশে। আশি-নব্বই দশকের রোমান্টিকতার সুবাস মাখা ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের সেই কালজয়ী গান— ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল নিজের ফেসবুক রিলে শাড়ি পরে হেঁটেছিলেন, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল ওই গান। ব্যস, অমনি আমাদের মননশীলতারোধী মনস্তত্ত্ব ও প্রতিষ্ঠানে লুকিয়ে থাকা গুপ্ত নীতিপুলিশদের অনলাইন সমাজ বিষাক্ত তির ছুড়ে মারল। ভিডিও ট্রোল হলো, থানায় জিডি গেল, এমনকি ‘সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি’ ভাঙার ছুতো তুলে সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠনের ফন্দিও আঁটল।
কিন্তু এই অনলাইন লিঞ্চিং ও হেনস্তার বিপরীতে দেশের শিক্ষিকারা নামলেন অহিংস এক নজিরবিহীন ডিজিটাল প্রতিবাদে। একই গান ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে হাজার হাজার নারী শিক্ষক নিজ নিজ ভিডিও পোস্ট করে বুঝিয়ে দিলেন— নান্দনিক সৌন্দর্য আর ব্যক্তিস্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়ে শিক্ষা কিংবা নাগরিকতা অর্জিত হয় না।
আজ এক মন্ত্রীর কথায় আমলারা হয়তো আড়ালে মুখ লুকাল, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে গজিয়ে ওঠা এই অন্ধ রাজনৈতিক ভাইরাস কি এত সহজে মরে? তারা স্রেফ সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় থাকবে— অন্য কোনো প্রাঙ্গণে, অন্য কোনো বিউটি পালকে অন্য কোনো বাহানায় খাঁচায় পুরতে
এই দমবন্ধ উত্তাপের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির বাতাস এনে দিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সিলেটে গিয়ে তিনি যখন খোলামেলাভাবে স্পষ্ট করলেন যে, ভিডিওতে ‘অশ্লীলতা’ বা নিয়মভঙ্গের কিছু নেই এবং গান শোনা বা গাওয়া কোনো অপরাধ নয়— তখনই সিলেটের শিক্ষা বিভাগ মুহূর্তেই ইউটার্ন নিল। মন্ত্রী মহোদয়ের কারণে শিক্ষিকা বিউটি পাল হয়তো এই দফায় প্রশাসনিক রক্তচক্ষু থেকে রক্ষা পেলেন। আপাতদৃষ্টে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে ধন্যবাদ দেওয়াটাই সঙ্গত।
কিন্তু আসল শঙ্কা তো অন্য জায়গায়। মননশীলতা বিরোধী যে অন্ধকার মনস্তত্ত্ব ও গুপ্ত রাজনীতির ডালপালা আজ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিস্তার লাভ করেছে, তাতে খুব বড় এক প্রশ্ন থেকেই যায়— সত্যিই কি শেষ রক্ষা হবে?
রাজনীতি আর নান্দনিকতার এই দ্বন্দ্ব আসলে নতুন নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র আর সামাজিক কাঠামোর গহীনে ওৎ পেতে বসে থাকা এই ‘গুপ্ত’ মনস্তত্ত্ব আসলে মানুষের মৌলিক আনন্দ, সৌন্দর্যবোধ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ভীষণ ভয় পায়। কারণ, যেকোনো নান্দনিকতাই কাঠামোর অন্ধ অনুগতদের জন্য হুমকি। এরা সুযোগ পেলেই সংস্কৃতি আর আচরণের ওপর খবরদারির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নাগরিকের প্রাণশক্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে চায়। আজ এক মন্ত্রীর কথায় আমলারা হয়তো আড়ালে মুখ লুকাল, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে গজিয়ে ওঠা এই অন্ধ রাজনৈতিক ভাইরাস কি এত সহজে মরে? তারা স্রেফ সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় থাকবে— অন্য কোনো প্রাঙ্গণে, অন্য কোনো বিউটি পালকে অন্য কোনো বাহানায় খাঁচায় পুরতে।
তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কাঠামোর মেকি নিয়ম আর গুপ্ত রাজনীতির খাঁচা ভেঙে মানুষের নান্দনিকতা সবসময় পথ চিনে নেয়। অন্যায়ের থমথমে আকাশে বিষাদের শ্রাবণ মেঘ জমলেও, জীবনের দরবারে আবারও প্রতিধ্বনিত হবে অনমনীয় সুর —‘হোক কলরব’। আমাদের সকল নন্দনবোধ, মননশীলতা যখন বিরোধীতার মুখে পড়ে, তখন অনুভূতির গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের আরশ।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক






