‘ভেতরে কেবিনের সুবন্দোবস্ত আছে’

নব্বইয়ের দশকের দিকে মফস্বল কিংবা জেলা শহরের যেকোনো মাঝারি সাইজের রেস্টুরেন্টে ঢুকলেই চোখে পড়ত সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা—‘কেবিনের সুবন্দোবস্ত আছে'।
কোথাও ঝুলছে একটা ময়লা ভারী পর্দা, কোথাওবা রঙিন পলিথিনের ঘের দেওয়া অন্ধকার ঘুপচি। আর একটু ভালো রেস্টুরেন্ট হলে প্লাইবোর্ড দিয়ে বানানো একখানা খুপরি ঘর। সেই যে ঝাপসা আলো আর ভ্যাপসা গন্ধের আস্তানা, সেখানে বসা মেয়েদের মূল কাজ ছিল খাওয়া অপেক্ষা সমাজকে নিজের চেহারা দেখানো থেকে বিরত রাখা। মফস্বলের বয়-বেয়ারাও ছিল স্বয়ংক্রিয়—কোনো পুরুষ সঙ্গে কোনো নারী আত্মীয় বা বন্ধুকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকলেই বেশ খাতির জমিয়ে বলত, ‘স্যার, ভেতরে কেবিন খালি আছে, কেবিনে বসেন।’
সাদা চোখে সম্মান জানানো বা নিরাপত্তা দেওয়ার এই যে বন্দোবস্ত, তার আসল মনস্তত্ত্বটা মোটেও জটিল কিছু না। বার্তাটা পরিষ্কার—পাবলিক স্পেসে নারীদের দৃশ্যমান হওয়াটা অস্বস্তিকর, তাই তাকে পলিথিন বা প্লাইবোর্ডের আড়ালে পুরে রাখাই ঈমানের আলামত ও সিভিল সোসাইটির ভদ্রতা।
আমরা ভাবছিলাম, নব্বইয়ের দশক পার হয়ে দেশটা বোধহয় সামান্য বড় হয়েছে। বাজার অর্থনীতি, নারীদের কর্মসংস্থান আর শিক্ষা ছড়ানোর পর সেই খসে পড়া কেবিন কালচার যখন বিলুপ্ত হতে শুরু করল, তখন আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম। ভাবছিলাম, আলো-বাতাস ভরা খোলা টেবিলে মানুষ খাবে, আড্ডা দেবে, তর্ক করবে—এইটাই তো নাগরিক হওয়ার প্রাথমিক নিয়ম।
কিন্তু ইতিহাস তো সরলরেখায় হাঁটে না। ইতিহাস টিএসসিতে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আমার দেখা চৌরঙ্গীর খান স্ন্যাক্সের সেই রঙিন পলিথিনের পর্দাটা আবার টানিয়ে দিল।
কিন্তু ইতিহাস তো সরলরেখায় হাঁটে না। ইতিহাস টিএসসিতে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আমার দেখা চৌরঙ্গীর খান স্ন্যাক্সের সেই রঙিন পলিথিনের পর্দাটা আবার টানিয়ে দিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নাকি নারীদের খাবারের জন্য আলাদা ‘ফিমেল জোন’ বানানো হয়েছে। কাপড় বা বোর্ডের পর্দা দিয়ে ঘেরা ওই জায়গায় কেবল মেয়েরা বসে খাবে। নাম দেওয়া হয়েছে বেশ চকচকে, আধুনিক—‘ফিমেল জোন’। ফিমেল স্পেস বলে ভুল করবেন না যেন! এইটা হচ্ছে একদম খাঁটি মফস্বলী কেবিনের ঢাবি ভার্সন। এর উদ্বোধক কারা? ডাকসু নেতা আর শিবির নেতারা মিলে ফিতা কেটে এই ‘ঐতিহাসিক’ কেবিনের শুভ সূচনা করলেন।
এদিকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) কারবার তো আরও দুই ধাপ এগিয়ে! সেখানে কোনো রাখঢাক না রেখেই সোজা সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছে—‘পর্দা কর্নার’। আর সেই পর্দা কর্নারের ফিতা কাটতে খোদ উপাচার্য মহোদয় সশরীরে উপস্থিত হয়ে শুভ উদ্বোধন ‘ফরমাইসেন’! দেশের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর যখন নিজ হাতে ‘পর্দা কর্নার’ উদ্বোধন করেন, তখন বুঝতে হবে প্রগতির গাড়িটা আমরা কত দ্রুত রিভার্স গিয়ারে চালাচ্ছি।
তবে বাংলাদেশের এই বাস্তবতায় টিএসসির এই কেবিনকে আবার অঞ্জন দত্তের ‘দাস-কেবিন’ ভেবে ভুল করার কোনো উপায় নেই। অঞ্জনের সেই দাস-কেবিন ছিল তিনশো বছরের বুর্জোয়া কলকাতা শহরে প্রেম সাশ্রয় করার একটা জায়গা। যেখানে ময়দানে মিটিংয়ের শোরগোল আর গঙ্গার ঘাটে ভিখিরির ভিড় এড়িয়ে এক কাপ চায়ে আধঘণ্টা আর ফিশ-চপে পাক্কা চার ঘণ্টা পার করে দেওয়া যেত; পর্দাটা টেনে দিয়ে পৃথিবীর সব ঝঞ্ঝাট ভুলে কাগজের ন্যাপকিনে কবিতা লেখা যেত। মফস্বলের ওই কেবিনগুলোতেও তরুণ-তরুণীরা বাধ্য হয়ে অঞ্জনীয় কায়দায় প্রেমের ফাঁকফোকর খুঁজে নিত বটে, কিন্তু আমাদের এই কেবিন ব্যবস্থার আসল উদ্দেশ্যটা কখনো কবিতার জন্ম দেওয়া ছিল না। এর একমাত্র সামাজিক উদ্দেশ্য ছিল—পর্দার নাম করে মেয়েদের ঘরের বাইরে আসা এবং খাওয়া-দাওয়াটা সংকুচিত রাখা।
এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুল কাদেরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট তুলে ধরেছেন এই কাঠামোগত ফাঁকটা। তিনি বললেন, আপাতদৃষ্টিতে হয়তো মনে হতে পারে হিজাব-নিকাব পরা বা পর্দানশীন নারীদের জন্য টিএসসিতে একটি কমফোর্ট জোন তৈরি হয়েছে। কিন্তু আসল গেইম অন্য জায়গায়! যে ডাকসু বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নারী শিক্ষার্থীদের মর্যাদা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে তড়িঘড়ি করে পর্দা টানাল, তারা টিএসসির দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে থাকা নারীদের ওয়াশরুম নিয়ে বিন্দুমাত্র কনসার্নড না!
নারী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত টিএসসিতে এসে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হন ওয়াশরুম নিয়ে। পর্দানশীন নারীরাও তো এই বাথরুম বিড়ম্বনার চরম ভুক্তভোগী। কিন্তু ডাকসুর যত আগ্রহ ও উৎসাহ কেবল পর্দাঘেরা ফিমেল জোন বানানোতেই সীমাবদ্ধ রইল। শুরু থেকেই ডাকসুকে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আইডিওলজিক্যাল ঘরানার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেখা গেছে—তা কালচারাল প্রোগ্রামই হোক আর পর্দার ঘেরাটোপই হোক। কাদের তো আরও দূরদর্শী এক হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন—ক্যাফেটেরিয়ায় ফিমেল জোন বানিয়ে সুবিধা দেওয়ার নামে এই ঘেরাটোপ যেন দুইদিন পর তাদের ফিমেল উইং-এর ‘টিএসসি শাখা অফিস’ না হয়ে ওঠে।
বাথরুম পরিষ্কার করা ঝামেলার কাজ, সেখানে সদিচ্ছা লাগে, বাজেট লাগে। কিন্তু নারীর মুখে বা চারপাশে পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়াটা অতি সহজ কাজ। ওই যে, হাইজিনের খবর নাই, কিন্তু ঈমানের খুব চিন্তা!
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এই কেবিন নাকি বানানো হয়েছে ‘নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য’ দেওয়ার দোহাই দিয়ে। মফস্বলের জিলাপির দোকানের ওই বেয়ারাও কিন্তু একই কথা বলত। সেও 'সুরক্ষা' দিতেই প্লাইবোর্ডের ঘরে পাঠাত। কিন্তু আপনি যখন নিরাপত্তার অজুহাতে কোনো মানুষকে আলাদা একটা ঘেরাটোপে ঢুকিয়ে দেন, তখন আপনি মূলত তাকে নিরাপদ করেন না, বরং বার্তা দেন যে মূল পাবলিক স্পেসটা তার জন্য নয়।
এই নতুন কেবিন প্রজেক্টটা আসার ফলে যাদের সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে, তারা হলো এই সমাজের রক্ষণশীল ও লিঙ্গভিত্তিক পৃথকীকরণে বিশ্বাসী গোষ্ঠীগুলো। আর এর সবচেয়ে ক্ষতিকর মনস্তাত্ত্বিক কোপটা গিয়ে পড়বে ওইসব মেয়েদের ওপর, যারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, যারা বিশেষ মহল নির্দেশীত পর্দা করেন না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যখন এরকম একটা ‘পর্দা ঘেরা শালীন ঘর’ তৈরি হয়ে যায়, তখন না চাইতেও সমাজ একটা অদৃশ্য বিভাজন রেখা টেনে দেয়—‘ভালো মেয়েরা পর্দা কর্নারে বসে, আর বাকিরা বাইরে।’ ফলে যেসব মেয়ে স্বাভাবিকভাবে পুরুষ সহপাঠীদের সাথে খোলা জায়গায় বসে খাবেন বা আড্ডা দেবেন, তাদের ওপর আশেপাশের মানুষের এক ধরনের অযাচিত জাজমেন্ট আর নীতিপুলিশের নজর এসে পড়বে। তাদের চলাফেরার স্বাধীন স্পেসটা মুহূর্তের মধ্যে সংকুচিত হয়ে আসবে।
কিন্তু গল্পটা শুধু ঢাবি কিংবা পবিপ্রবির টিএসসিতেই থেমে থাকার নয়। যেকোনো বড় পরিবর্তনের একটা 'পাইলট প্রজেক্ট' থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পটুয়াখালী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলো এই লিঙ্গভিত্তিক পৃথকীকরণের পরীক্ষাগার। যখন এই কেবিন কালচার এখানে বৈধতা পেয়ে যাবে, তখন পরের ধাপটা আরও সোজা। অচিরেই এই ‘পর্দা কর্নার’ বা ‘ফিমেল জোন’ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে দেশের সমস্ত কলেজ, জেলা শহরের উচ্চবিদ্যালয় এমনকি অন্যান্য সামাজিক ও কর্মসংস্থানের পরিসরেও।
তখন মফস্বল থেকে শুরু করে রাজধানীর যেকোনো প্রান্তে নারীরা খোলামেলা জায়গায় বসতে গেলেই শুনতে হবে—‘আপনার জন্য তো ওই যে পর্দা ঘেরা জোন আছে, সেখানে যাচ্ছেন না কেন?’ অর্থাৎ, সুরক্ষার দোহাই দিয়ে শুরু হওয়া একটি ছোট পর্দা শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজটাকেই নারীর জন্য অদৃশ্য এক খাঁচায় রূপান্তর করার রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
পর্দা আরও শক্ত করে টানিয়ে দেন ভাই! বাথরুম ভাঙা থাকুক, স্যানিটেশন জাহান্নামে যাক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কেবল সাইনবোর্ডে শোভা পাক—কিন্তু পর্দাটা যেন খসে না পড়ে। নব্বইয়ের খসে পড়া ওই মফস্বলী পলিথিনের কেবিনগুলোই আরো কত ভাবে ফেরত আসবে- তা কে জানে...।… কমদামি সাউন্ডসিস্টেমে গানও ভেসে আসতে পারে- ‘সাবধানে থাকিও নারী পর্দার আড়ালে...’। আপাতত ঢাবি ও পবিপ্রবিতে নামফলকের পাশে লিখে দেওয়া যেতে পারে- ‘কেবিনের সুবন্দোবস্ত আছে!’
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




