উন্নয়নের আড়ালে কৃষক ও রেমিট্যান্স যোদ্ধার কান্না

ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি কাঠের কফিনে ফিরে আসে তাদের নিথর দেহ। অধিকাংশ ডেথ সার্টিফিকেটে দায়সারাভাবে লেখা থাকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বা ‘হার্ট অ্যাটাক’। কিন্তু এই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে থাকা অমানবিক শোষণের কোনো ময়নাতদন্ত কখনো হয় না। এই নিথর দেহগুলো মূলত আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের, যাদের পাঠানো ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপর ভর করে টিকে আছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।
চকচকে এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল সেতু আর মেগা প্রজেক্টের আড়ালে আমরা যে উন্নয়নের মহাকাব্য রচনা করছি, তার ভিত্তিপ্রস্তরে কান পাতলে শোনা যায় দেশের প্রকৃত অন্নদাতা কৃষক এবং তার রেমিট্যান্স যোদ্ধা ছেলে ও পোশাককর্মী মেয়ের করুণ হাহাকার। প্রবৃদ্ধির মরীচিকার তলানিতে পড়ে থাকা এই মানুষগুলোর জীবন ব্যবচ্ছেদ করলে আমাদের বহুল চর্চিত ‘উন্নয়ন মডেল’-এর এক ভিন্ন রূপ সামনে আসে।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে সামষ্টিক পরিসংখ্যানের জাদুতে অন্ধ হয়ে আছি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থনীতি আকারে বড় হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ বলছে, দেশে আয়-বৈষম্য পরিমাপক ‘গিনি সহগ’ প্রায় ০.৪৯৯ ছুঁয়েছে। অর্থাৎ, জাতীয় আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ অভিজাত ও সুবিধাভোগী শ্রেণির পকেটে। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটি কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, বরং চরম মাত্রায় বৈষম্যমূলক। আমরা প্রতিবেশী ভুটানের অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখি, তারা পাশ্চাত্যের প্রথাগত জিডিপি বা ‘মোট দেশজ উৎপাদন’-এর অন্ধ অনুকরণ না করে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা ‘মোট জাতীয় সুখ’-কে তাদের উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের উন্নয়ন মডেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে নাগরিকদের মানসিক স্বস্তি, স্বাস্থ্য, সুষম বণ্টন এবং টেকসই পরিবেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমরা কেবল জিডিপির সংখ্যার পেছনে ছুটছি, যেখানে গুটিকয়েক মানুষের সম্পদ বাড়লেও সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক ও শ্রমিকের জীবনে নেমে আসছে সীমাহীন অনিশ্চয়তা।
যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখল, রাষ্ট্র তাদের কী দেয়? মাথার ঘাম পায়ে ফেলা অর্থ দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পর একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তখন বিমানবন্দরে পদে পদে তাদের কাস্টমস বা ইমিগ্রেশনের হয়রানির শিকার হতে হয়। নিজ দেশে ফিরেও তারা পুলিশি হয়রানি, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হন
আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে আছে কৃষক সমাজ। অর্থনীতিতে কৃষি খাতে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হলেও জিডিপিতে এর অবদান নেমে এসেছে ১১-১২ শতাংশে। সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির অভাবে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না। কৃষকের ঘামের টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট। অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে যুক্ত হয় কৃষকের চিকিৎসাবিহীন জীবনের নির্মম বাস্তবতা।
রেমিট্যান্সে রেকর্ড
০২ জুলাই ২০২৬
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে নিজস্ব পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় (আউট-অব-পকেট এক্সপেন্ডিচার) প্রায় ৬৮-৭০ শতাংশ। চিকিৎসকদের গবেষণা বলছে, দেশের পুরুষ ক্যান্সার রোগীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। অধিক ফলনের আশায় হাড় ভাঙ খাটুনি, অপরিকল্পিত রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার তাদের ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অথচ যেসব বহুজাতিক কোম্পানি এসব কীটনাশক বিক্রি করে মুনাফা লুটছে, কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কৃষক বাধ্য হয় তার হালের গরু ও শেষ আবাদি জমিটুকুও বিক্রি করতে!
দারিদ্র্যের এই দুষ্টচক্রে পড়ে কৃষকের কন্যারা পাড়ি জমান শহরের পোশাক কারখানাগুলোতে। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে টিকে আছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত, যা প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের রেভিনিউ এনে দিচ্ছে। অন্যদিকে, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে কিংবা ঋণের জাল থেকে বাঁচতে ভিটেমাটি বন্ধক রেখে কৃষকের ছেলেরা পাড়ি জমায় মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমিতে। ক্যাফালা সিস্টেমের মতো এক আধুনিক ও নির্মম দাসপ্রথার অধীনে, ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অমানবিক পরিবেশে তারা শ্রম দেয়। এরাই মূলত আমাদের রেমিট্যান্সের প্রধান চালিকাশক্তি, যারা রক্ত পানি করে অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখে।
এর পাশাপাশি অভিবাসনের এক মর্মান্তিক চিত্রও রয়েছে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশ থেকে দুবাই বা মিশর হয়ে লিবিয়া, আর সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা ইউরোপ যাওয়ার এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পা দিচ্ছে হাজার হাজার যুবক। লিবিয়ার মাফিয়াদের বন্দিশিবিরে পৈশাচিক নির্যাতন সয়ে, উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর শত শত তরুণের সলিলসমাধি হচ্ছে। মালয়েশিয়ার জঙ্গলে মাসের পর মাস লুকিয়ে থেকে অনাহারে নাম-পরিচয়হীন লাশে পরিণত হওয়ার ঘটনাও অগণিত। এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন এক মরণফাঁদ। উন্নত জীবনের আশায় অনেক তরুণ এখন রাশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন। সামরিক বা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এসব যুবককে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ড্রোন হামলায় অকালেই প্রাণ হারাচ্ছেন আমাদের দেশের তরুণেরা। এই একমুখী পথে একবার ঢুকলে আর অক্ষত ফেরার কোনো সুযোগ থাকে না।
স্বাধীন দেশের অর্থনীতি কেবল শ্রমিকের ঘাম আর কৃষকের অশ্রু শুষে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। অবিলম্বে সুস্পষ্ট কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কৃষক ও শ্রমিকের চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্রের কাঁধে নিতে একটি ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা মডেল’ প্রণয়ন করতে হবে।
একদিকে কৃষক ও তার সন্তানদের এই সীমাহীন কষ্ট, ত্যাগ-তিতিক্ষা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সুবিধাবাদী শ্রেণির বিলাসী জীবন এই দুইয়ের বৈপরীত্য অত্যন্ত প্রকট। রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যখন রক্ত পানি করে দেশের রিজার্ভ সচল রাখছে, তখন একটা গোষ্ঠী ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকার পাহাড় গড়ছে। এই সুবিধাবাদী শ্রেণির দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই। ছেলেমেয়েদের তারা বিদেশে বা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ান। ওভার-ইনভয়েসিং ও হুন্ডির মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার করে বিদেশে স্থায়ী আবাস নিশ্চিত করেন। প্রবাসীর ঘামে অর্জিত ডলারে দেশের অর্থনীতি বাঁচে; অথচ সেই ডলারই পাচার হয়ে গড়ে ওঠে বিদেশের বিলাসবহুল ‘বেগম পাড়া’।
যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখল, রাষ্ট্র তাদের কী দেয়? মাথার ঘাম পায়ে ফেলা অর্থ দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পর একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তখন বিমানবন্দরে পদে পদে তাদের কাস্টমস বা ইমিগ্রেশনের হয়রানির শিকার হতে হয়। নিজ দেশে ফিরেও তারা পুলিশি হয়রানি, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হন। প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতি করে সর্বস্ব লুট করে নেওয়ার লোমহর্ষক ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক। তাদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ কি আদৌ আছে?
স্বাধীন দেশের অর্থনীতি কেবল শ্রমিকের ঘাম আর কৃষকের অশ্রু শুষে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। অবিলম্বে সুস্পষ্ট কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কৃষক ও শ্রমিকের চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্রের কাঁধে নিতে একটি ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা মডেল’ প্রণয়ন করতে হবে। অভিবাসন ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনতে রাষ্ট্রকে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে হবে এবং দেশে-বিদেশে প্রবাসীদের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকের জন্য সরাসরি ‘প্রাইস সাপোর্ট মেকানিজম’ চালু করা এখন সময়ের দাবি।
কৃষক বাবার হাড়ভাঙা খাটুনি, পোশাক কারখানায় মেয়ের ঘাম আর মধ্যপ্রাচ্য বা ভিনদেশে প্রবাসী ছেলের ক্লান্তিহীন শ্রম এই তিন মূল স্তম্ভের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলার অর্থনীতি। উন্নয়নের মূল স্রোতে এই উপেক্ষিত কারিগরদের ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এখনই। তাদের রক্ত জল করা অর্থে গড়ে ওঠা অর্থনীতির সুফল যদি কেবল গুটিকয়েক সুবিধাবাদীর পকেটেই যায়, তবে বৈষম্যের এই চোরাবালিতে একদিন আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিই মুখ থুবড়ে পড়বে। কাঠামোগত এই অবিচার এখনই রুখতে না পারলে, ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের তথাকথিত এই ‘উন্নয়ন’ এক নিষ্ঠুর প্রহসন হিসেবেই বিবেচিত হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।





