প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে কী বার্তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর সাধারণত আকস্মিকভাবে নির্ধারিত হয় না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভিন্ন নয়। তার প্রথম বিদেশ সফর নয়াদিল্লি বা বেইজিংয়ের পরিবর্তে কুয়ালালামপুর থেকে শুরু করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রকৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন।
ঐতিহাসিকভাবে ঢাকার নতুন নেতৃত্বকে প্রায়ই একটি দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে— ভারতকে সন্তুষ্ট রাখা, নাকি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো। নয়াদিল্লিকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া মানে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্ত ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত বাস্তবতাকে স্বীকার করা। অন্যদিকে বেইজিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে গত এক দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চীনা অর্থায়নের প্রতি নির্ভরতার ইঙ্গিত দেওয়া।
এ দুই শক্তিকে পাশ কাটিয়ে মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়ে তারেক রহমান তৃতীয় আরেকটি পথের সূচনা করলেন। এর মাধ্যমে তিনি বাস্তববাদী ও লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির দিকে ঝোঁকার বার্তা দিয়েছেন।
এটি এমন এক কূটনীতি, যেখানে বড় ভূরাজনৈতিক নাটকীয়তার চেয়ে অর্থনৈতিক প্রয়োজনই মুখ্য। মালয়েশিয়ায় কয়েক লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় অবদান রাখে। কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থা, কর্মীদের কল্যাণ এবং একটি সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তির কাঠামো। এসব বিষয় ইঙ্গিত করে, নতুন সরকার আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় অবস্থান নেওয়ার চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ দেশ থেকে যাত্রা শুরু করে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার তাৎক্ষণিক চাপ থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখার চেষ্টা করেছে ঢাকা।
দুই শক্তিকে পাশ কাটিয়ে মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়ে তারেক রহমান তৃতীয় আরেকটি পথের সূচনা করলেন। এর মাধ্যমে তিনি বাস্তববাদী ও লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির দিকে ঝোঁকার বার্তা দিয়েছেন
তবে এই নতুন কূটনৈতিক অবস্থানের আসল তাৎপর্য দৃশ্যমান হবে সফরের দ্বিতীয় পর্বে, অর্থাৎ চীন সফরে। মালয়েশিয়া থেকে তারেক রহমান যাবেন বেইজিংয়ে। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি লিয়াওনিং প্রদেশের শহর দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনেও অংশ নেবেন। ফলে এই সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার মঞ্চেও বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের উপস্থিতি নিশ্চিত করছে।
এই সফরের গুরুত্ব যথেষ্ট। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা, প্রটোকল ও বিনিয়োগ কাঠামো স্বাক্ষরের প্রস্তুতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো চট্টগ্রামে চীনের সহায়তায় ৩৪ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন, যেখানে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক চাপের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এ ধরনের বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। এক্ষেত্রে চীনের সক্রিয়তা কৌশলগত শূন্যস্থান পূরণের আগ্রহেরই ইঙ্গিত দেয়।
সফরের অর্থনৈতিক যুক্তি স্পষ্ট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল প্রমাণে দেশের প্রয়োজন বিনিয়োগ, বাজারে প্রবেশাধিকার, দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এই তিন ক্ষেত্রেই সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা চীনের রয়েছে।
তবে সফরটিকে শুধু অর্থনৈতিক নির্ভরতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ঢাকার বৃহত্তর উদ্দেশ্যটি আড়াল হয়ে যাবে। নতুন প্রশাসনের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি দেশটিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিষ্ক্রিয় ক্ষেত্র থেকে বের করে এনে স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য বহন করছে।
স্বাভাবিকভাবেই এই কূটনৈতিক বিন্যাস নয়াদিল্লিতে কিছু উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকের অনেকে প্রকাশ্যেই ভারত সফরের আগে তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক পরিবেশে একে সহজেই চীনের দিকে কৌশলগত ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখা হতে পারে। সাম্প্রতিক কিছু দ্বিপক্ষীয় টানাপড়েন সে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়েছে। নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাকে অল্প সময়ের জন্য আটকে রাখার ঘটনা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কথিত ‘পুশইন’ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ এবং ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান— সব মিলিয়ে সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকার নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেই এসব ঘটনাকে পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ভারতের অসন্তোষের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। তবে তারেক রহমানের সফরকে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী দূরত্ব সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা অতিসরলীকরণ হবে।
ভূগোলের বাস্তবতায় নিরাপত্তা, নদীর পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য অংশীদার। বাংলাদেশ যেমন চীনা বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না, তেমনি ভারতের সঙ্গেও দূরত্ব সৃষ্টির সুযোগ নেই।
এ কারণেই মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ছিল একধরনের ‘বাফার’ বা মধ্যবর্তী ধাপ, যার মাধ্যমে ঢাকা আঞ্চলিক দুই শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে একটি নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক পরিসরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিতে চেয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক কৌশলের লক্ষ্য কোনো এক পক্ষের প্রতি আনুগত্য নয়; বরং বিকল্পের পরিসর বাড়ানো। ভারতনির্ভর নিরাপত্তা ও চীননির্ভর অর্থনৈতিক সহায়তার পুরনো দ্বিমুখী কাঠামোর জায়গায় এখন বহুমাত্রিক ও বহুপক্ষভিত্তিক কূটনীতির পথ খোঁজা হচ্ছে।
কুয়ালালামপুর হয়ে বেইজিংয়ের পথে যাত্রা করে তারেক রহমান মূলত এটিই দেখাতে চাইছেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কেবল প্রতিবেশীদের উদ্বেগ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে না।
লেখক: সাংবাদিক




