ছেলেবেলার ভূতগুলো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছেলেবেলার ভূতগুলো আজও আমাকে ছেড়ে যায়নি। এই জীবনে আর যাবে বলেও মনে হয় না। ভূতের ভয়ে সারাটা ছেলেবেলা আমি কুঁকড়ে থেকেছি। সন্ধ্যার পর একা ঘর থেকে বেরোতাম না। উঠোন পেরিয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতাম না। অন্ধকার বাগানের দিকে তাকালে গা ছমছম করত। রাতের বেলায় তলপেটের চাপে ঘুম ভেঙে গেছে। জানালা সামান্য ফাঁক করে কর্মটি সেরেছি। এই করে করে জানালার শিকগুলোয় মরচে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। কত ভৌতিক গল্প তখন গ্রাম জুড়ে। কত ভুতুড়ে ঘটনা। কী নির্জন গ্রাম মেদিনীমণ্ডল। মাঠেঘাটে দু-চারজনের বেশি মানুষ দেখা যায় না। গাছপালা, ঝোপঝাড়ঘেরা বাড়িগুলোয় যে মানুষ আছে, বোঝাই যায় না। গাছের পাতায় হাওয়ার হাহাকার, পাখির ডাকাডাকি আর দিনের বেলায়ও ঝিঁঝির ডাক। বুক হিম করা নির্জনতা।
বিক্রমপুর হিন্দুপ্রধান অঞ্চল ছিল। দেশ বিভাগের কালে বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার গ্রাম উজাড় করে চলে গেছে। বাড়ির ঘরগুলো হয়তো বিক্রি করতে পেরেছে, ভিটি বিক্রি করতে পারেনি। সেই সবকিছু বেদখল হয়েছে, আবার কিছু শূন্য পড়ে আছে। লোকে ছেড়ে গেছে বলে এই বাড়িগুলোর নাম ‘ছাড়াবাড়ি’। নানাবাড়ির দক্ষিণে এরকম একটি বাড়ি ছিল ‘গুহেরবাড়ি’। লোকে ‘গুহ’ উচ্চারণটা করত না, বলত ‘গুয়েরবাড়ি’। সেই বাড়ি গাছপালা-ঝোপঝাড়ে এক টুকরো দুর্ভেদ্য বনভূমি হয়েছিল। রাতের বেলা তো দূরের কথা, দিনের আলোয়ও আমরা কেউ একা ওদিকটায় যেতাম না। চৌধুরী বাড়িতে ছিল বিশাল এক গাবগাছ। সেই গাছের চারদিকে ঠাসবুনন বাঁশঝাড়। দিনেদুপুরেও কেউ কেউ সেই গাবতলায় বিশালদেহী একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। হালকা জ্যোৎস্নায় দেখেছে, চৌধুরীদের গাবগাছের মাথায় এক পা আর পুরানবাড়ির তালগাছে এক পা দিয়ে আকাশে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন। এই শুনে আমার গলা শুকিয়ে যেত। নানির বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়তাম।
মিয়াদের একটা বাড়ি ছিল পরিত্যক্ত। ঘর-দুয়ার নেই। গাব-তেঁতুলের গাছ আছে, আম-জামের গাছ আছে, নিম-কদমের গাছ আছে আর হিজল-বরুনের গাছ আছে বিস্তর। এই বাড়িটিকেও আমরা ছাড়াবাড়ি বলতাম। এক নির্জন দুপুরে সেদিকটায় গিয়েছিল হাজামবাড়ির হাফিজুদ্দি। কিশোর ছেলেটি দুর্দান্ত সাহসী। ওই বাড়িতে গিয়েছিল পাকা তেঁতুল চুরি করতে। গিয়ে তেঁতুলতলায় দেখে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। মাথা নেই। চার হাত-পা আর বিশাল দেহ। বুক-পিঠ ভরা শুধু বড় বড় চোখ। দেখে পালিয়ে বেঁচেছিল। হাফিজুদ্দির মুখে সেই গল্প শুনে আমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। ওই জিনিসকে গ্রামের লোকরা বলত ‘কনধনাইয়া’। বড় হয়ে জেনেছি তেনাদের এই জিনিসটির প্রকৃত নাম ‘স্কন্ধকাটা’।
সরাসরি তেনাদের কাউকে কখনো আমি দেখিনি। লোকমুখে শুনে শুনে ভূতের ভয়টা স্থায়ী হয়ে মনের ভেতর গেঁথে গেছে। গভীর অন্ধকারে আমি তাকাতেই পারিনি। একা ঘরে থাকতে পারিনি। বিদেশে গেলে হোটেলের রুমে কিংবা ভাইবোন, আত্মীয়, বন্ধুর বাড়ির রুমেও লাইট জ্বালিয়ে ঘুমাতে হয়। নয়তো অন্ধকার ঘরে রাতের বেলায় মনে হয় এই যেন বিছানার পাশে এসে কে এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়েছে! এই যেন পায়ে কে সুড়সুড়ি দিল! দুচোখ এক করলেই এই অবস্থা।
ছেলেবেলার কয়েকটি ঘটনায় সেই যে ভূতের ভয় মনের মধ্যে জেঁকে বসেছিল, জীবনে সেই ভয় আর কাটাতে পারিনি। নানাবাড়ির টিনের ঘরটা ছিল বিশাল। অনেকগুলো কামরা। একটা কামরাকে বলা হতো কেবিন। ঘরের ভেতর সেটি ছিল আরেকটা ঘর। কাঠের পাটাতন করা। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হতো। তার এক কোণে আবার বড় একটা সিঁড়ি। ওই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হতো দোতলায়। দোতলার টিনের ঘরে একদিকে বারান্দা না থাকলে বিক্রমপুর অঞ্চলে সেটিকে দোতলা ঘর বলা হয় না, বলা হয় ‘কার’ কিংবা ‘আপার’। আমাদের ওই ঘরটির আপারে বিশাল একটা কাঠের সিন্দুক ছিল। টিনের বড় বড় অনেক ড্রাম ছিল। আমি একা ওই আপারে যেতেও ভয় পেতাম। মনে হতো ড্রামগুলোর অন্ধকারের ভেতর কারা যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে। আমাকে দেখলেই উঠে দাঁড়াবে। তাদের মাথা নেই। বিশাল শরীর ভরা অজস্র চোখ। দেখলেই আমাকে থাবা দিয়ে ধরবে।
দক্ষিণের দরজার পাশে এক বালতি পানি ভরে রাখত বাড়ির কাজের লোক। রাতের বেলা বিশেষ প্রয়োজনে কেউ যেন পানিটা খরচ করতে পারে। এক গভীর রাতে ঘুম ভেঙেছে। কেবিনে টিমটিম করে জ্বলছে হারিকেন। আমার পোষা বিড়ালটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে হারিকেনের অদূরে। কেবিন ভরা আবছা আলো-আঁধারি। বাইরের ঘোরতর অন্ধকারে ঘুমের ভেতর থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম, দক্ষিণের দরজার বাইরে রাখা পানির বালতিটাতে গরুতে পানি খাচ্ছে। গ্রামে থাকি, গরুর পানি খাওয়ার শব্দটা চিনি। নানিকে ধাক্কা দিয়ে বললাম, ‘ও বুজি, কাদের বাড়ির গরু এত রাতে এসে বালতির পানি খাচ্ছে?’
নানি আমাকে আরও নিবিড় করে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কইতে পারি না, মিয়াভাই। তুমি ঘুমাও।’ সকালবেলায় দেখা গেল বালতির পানি যেমন ভরা ছিল, তেমনই আছে। এক ফোঁটাও কমেনি। রাতে তাহলে গরুতে কী খেয়ে গেল। বাড়ির লোকে এসব নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিল। তাতে আমি বুঝেছিলাম, তেনাদের কেউ এসে গরুর পানি খাওয়ার মতো শব্দ করে গেছেন।
নানা বাড়িটি ছিল তিন শরিকের। আমার নানার অংশটা ছিল দক্ষিণ দিকে। বিশাল ঘরটির সামনে উঠোন, পেছনে বিশাল বাগান। আম, নিম ও কদমগাছে ভরা। পুবদিকে রান্নাঘর। এর দক্ষিণে আরেকটা পাটাতন করা ঘর। সেই ঘরটা থাকত তালা মারা। এক জ্যোৎস্নামাখা সন্ধ্যায় বাগানের শেষ দিককার জোড়া আমগাছ দুটোর তলায় সাদা শাড়ি পরা একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। বুঝতে পারিনি, কে? ভাবলাম, বাড়ির কাজের ঝিদের কেউ হবে। হয়তো ফতিরমা। নানিকে দেখিয়ে বললাম, ‘সন্ধ্যাবেলা ফতিরমা ওইদিকে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন?’
নানি ব্যস্ত ভঙ্গিতে জানালা বন্ধ করতে করতে বললেন, ‘কোনো দরকারে গেছে। আইসা পড়ব নে।’ তারপরই দেখি অন্য কামরা থেকে হারিকেন হাতে বেরিয়ে এলো ফতিরমা। কাণ্ডটির আগামাথা কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার বয়সী মায়ের চাচাতো ভাই আলমগীর। বাড়ির মহিলাদের কানাকানি শুনে সে যা বোঝার বুঝে গেছে। পরদিন সকালবেলা আমাকে বলল, ‘তুই যারে কাইল সন্ধ্যায় দেখছস, ওইটা তো ফতিরমা আছিল না, ওইটা তো পেত্নী! এই বাড়িতে ভূত আছে, পেত্নী আছে। তারা রাত্রে পানি খায়। পানি খাওয়ার শব্দ গরুর পানি খাওয়ার মতন।’ শুনে আমার বুক হিম হয়ে গেল।
আমার বড় ভাই আজাদের বয়স এগারো। সেও আমার সঙ্গে নানির কাছে থাকে। বাড়ির মামাদের সঙ্গে গেছে গোয়ালিমান্দ্রার হাটে। বড় একটা গজার মাছ কিনেছে। চটের ব্যাগে অন্যান্য সওদাপাতি। দেরি হলে মাছ পচে যাবে। এজন্য সে একা একা রওনা দিয়েছে। কাজিরপাগলার দক্ষিণ দিকে বিশাল চক। ধান-পাট-তিল-কাউনের চাষ হয়েছে। ওই চকের ভেতর দিয়ে একা একা হেঁটে ফিরছে। পায়েচলা পথের ধারে নির্জন একটা ছাড়াবাড়ি, কলা আর বাঁশঝাড়ে ভর্তি। পাশেই বিশাল এক শিরীষগাছ। সেই গাছটার তলায় আসতেই গাছে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা একজন প্রতিটি শব্দের ওপর চন্দ্রবিন্দু লাগিয়ে বলল, ‘মাঁ ছঁ টাঁ দিঁ য়াঁ যাঁ।’ আজাদ ভয়ার্ত চোখে গাছের দিকে তাকিয়েছে। দেখে মাকড়সার মতো লিকলিকের হাত-পায়ের একজন বসে আছেন। লম্বা নাকটা বুক পর্যন্ত নেমেছে। চোখ দুখানা রাজহাঁসের ডিমের মতো। ওই দেখে সে প্রাণপণে দৌড় দিয়েছে। বাড়ির উঠোনে এসে অজ্ঞান। জ্ঞান ফেরার পর সব বলল। শুনে আমিন মুনশি সাহেব এসে তাকে ঝেড়ে দিয়ে গেলেন। পানি পড়া খাওয়ালেন। তারপরও চার দিন জ্বরে ভুগেছিল আমার ভাই। এ ঘটনা শোনার পর থেকে তেনাদের ভয়ে আমি আরও কাতর হয়ে গেলাম।
বর্ষাকালের এক সন্ধ্যাবেলায় দারোগা মামার বাড়ি থেকে ফিরছি। দিনের আলো পুরোপুরি মুছে যায়নি। শেষ বিকাল আর সন্ধ্যার অদ্ভুত মিশেল দেওয়া আবছায়া ভাব চারদিকে। চৌধুরীবাড়ির দক্ষিণ দিককার খাল দিয়ে রওনা দিয়েছি। ডানদিককার বাড়িটিতে কোনো ঘর-দুয়ার নেই। এত গাছপালা যে, দিনের বেলায়ও জায়গাটা অন্ধকার হয়ে থাকে। সেই সন্ধ্যায় ওদিকটায় তাকিয়ে মনে হলো গভীর রাত। আমার গা ছমছম করছিল। আজাদেরও বোধহয় একই অবস্থা। যত দ্রুত সম্ভব সে বৈঠা চালাতে লাগল। এ সময় অচেনা একটা ফুলের তীব্র গন্ধ পেলাম। কী ধরনের মাদকতাময় গন্ধ। সেই গন্ধে ঘুম ঘুম পেতে লাগল। আজাদ ফিসফিস করে বলল, ‘দোয়া পড়তে থাক।’ সে শব্দ করে করে দোয়া পড়তে লাগল। আমি বুঝিনি কিছুই। ভাইয়ের দেখাদেখি আমিও যতটুকু দোয়া-দরুদ জানি, পড়তে লাগলাম। কিছুদূর আসতে না আসতেই গন্ধটা উধাও। বাড়ি আসার পর নানি সব শুনে লবণপানি খাওয়ালেন। সুরা পড়ে মাথায় ফুঁ দিলেন। পরে শুনেছি, গন্ধটা কোনো ফুলের গন্ধ না, তেনাদের কারও গায়ের গন্ধ। এখনো অচেনা কোনো মাদকতাময় গন্ধ পেলে সেই বর্ষাসন্ধ্যার গন্ধটা আমার নাকে এসে লাগে। আমার গা ছমছম করে।





