আরও কট্টর নেতৃত্বের হাতে ইরান

তেহরানের রাস্তায় সাবেক দুই নেতার সঙ্গে মোজতবা খামেনির ব্যানার শোভা পাচ্ছে। ছবি : সিএনএন
ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তাতে নিহত হন।
পরবর্তীতে তেহরান প্রশাসনের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা ও কর্মকর্তাদের হত্যা করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। এরপর মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানে বসে নতুন প্রশাসন।
পরমাণু কর্মসূচি রুখে দেওয়ার পাশাপাশি পেন্টাগনের এ সামরিক অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়েছে। তার ভাষ্য, ইরানের নতুন নেতৃত্ব কম উগ্রপন্থী এবং বেশি যুক্তিবাদী।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প তার ভাষণে বলছিলেন , ‘আগের শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। মারা গেছে তারা সবাই। পরবর্তী শাসনব্যবস্থাটিও প্রায় মৃত। আমরা এখন কাজ করছি ভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে।’
‘ইরানে ভিন্ন একটি গোষ্ঠী ক্ষমতায়। সুতরাং আমি একে বিবেচনা করব শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হিসেবেই’, যোগ করেন তিনি।
কিন্তু অধিকাংশ বিশ্লেষক বলছেন, ইরানের ঘটনাটি একই ব্যবস্থায় শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতিস্থাপন মাত্র। শাসনব্যবস্থার রূপান্তর নয়। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলো পদ্ধতিগত পরিবর্তন, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রে এখনও দেখা যায়নি।
বরং এই যুদ্ধ ইরানের জটিল শাসনব্যবস্থার ভেতরে থাকা কট্টরপন্থী সামরিক গোষ্ঠীগুলোকে আরও ক্ষমতা দিয়েছে এবং সেইসঙ্গে জোরদার করেছে মার্কিনবিরোধী মনোভাবকেও।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়াবের ভাষ্য, এই শাসনব্যবস্থা আরও কট্টরপন্থী, সমঝোতায় কম আগ্রহী এবং আইআরজিসির (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) সঙ্গে আরও সরাসরি জড়িত।
তিনি স্পষ্ট করেন, ‘আমরা ইরানে নেতার পতন দেখেছি, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অবস্থানে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসেনি।’
ইয়াকুবিয়ান সতর্ক করেন, এই মুহূর্তে কোনো বিশ্লেষকই ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ কাজ গভীরভাবে দেখছেন না। এখানে অনেক অজানা দিক রয়েছে, যা খোদ মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন।
তেহরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সুস্থ আছেন কি না বা তিনি আসলেই দেশ পরিচালনা করছেন কি না, তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেখা যায়নি তাকে বা তার ছবি।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন, আইআরজিসির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে মোজতবার। তারাই তাকে এই পদে বসিয়েছে এবং এ কারণে তিনি তার বাবার চেয়ে আইআরজিসির কাছে বেশি দায়বদ্ধ।
আরও জোরদার হতে পারে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, নতুন শাসকগোষ্ঠী ইরানিদের ওপর দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে দেবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলি ভায়েজের ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলেই ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দিয়েছেন, এক অর্থে তিনি ঠিকই বলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ট্রাম্প এটিকে আরও বেশি উগ্রপন্থী শাসনব্যবস্থায় পরিণত করেছেন।
ভায়েজের দাবি, ক্ষমতায় আসা ব্যক্তিরা সবাই অতীতে দমন-পীড়নে জড়িত ছিলেন। জানুয়ারিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গুলি করে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করে ইরান।
নতুন সরকার গত মাসেও ওই বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে অন্তত ৯ জনের। তেহরানের নতুন কর্তৃপক্ষ অবশ্যই যেকোনো ধরনের গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকবে। এছাড়া গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও তথ্য ফাঁসের কারণে শীর্ষ নেতাদের হত্যার ঘটনায়ও মোজতবা প্রশাসন শঙ্কিত থাকবে।
ভায়েজ বিশ্বাস করেন, সরকারের আতঙ্কের মাত্রা বিবেচনা করলে দমন-পীড়ন অতীতের চেয়ে অনেক বেশি হবে।
এদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর ইরানি কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এখনও অটুট।
ইন্টারনেট পরিষেবা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার ৩৬তম দিন চলছে।
ইরানের হারানোর কিছু নেই
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, এই যুদ্ধ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে তেহরানকে আরও উদ্বুদ্ধ করবে।
ভায়েজ মনে করিয়ে দেন, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি পারমাণবিক বোমা নিষিদ্ধ করে একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন। কিন্তু সেই ফতোয়া তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল হয়ে গেছে।
যুদ্ধ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণেই আক্রমণের শিকার হয়নি উত্তর কোরিয়া। আইআরজিসি পিংইয়ংকে অনুসরণ করতে পারে।
ভায়েজ যোগ করেন, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনকেই প্রতিরোধের সেরা উপায় হিসেবে বিবেচনা করবে। কারণ তাদের কাছে ৪০০ কেজি উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনও মজুদ আছে। তাছাড়া ইরানের বর্তমান প্রশাসনের কাছে এই মুহূর্তে হারানোর কিছু নেই।
ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ভাষণে আবারও দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের একেবারে দোরগোড়ায় রয়েছে। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি।
অন্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের নতুন নেতৃত্ব সম্পর্কে কথা বলতে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
এবিসি নিউজকে সোমবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সন্দেহ করেন, ‘দেখুন, শাসনব্যবস্থার ভেতরে কিছু ফাটল ধরছে।’
তিনি বিশ্বাস করতে চান, ‘নতুন যারা দায়িত্বে এসেছেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের আরও যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এমন হলে আমাদের পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বের জন্য সুসংবাদ হবে।’
‘কিন্তু আমাদের এই সম্ভাবনার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে, তারা আসলে এমন নাও হতে পারে’, যোগ করেন রুবিও।
সিএনএন থেকে অনূদিত















