তেল ভরতেই দিন পার, বাড়ছে পরিবহন খরচ

ছবিঃ আগামীর সময়
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি পণ্য ঢাকায় নিতে একটি ট্রাকের প্রয়োজন হয় প্রায় ৭০ লিটার ডিজেল। কিন্তু পেট্রোল পাম্পগুলো একটি ট্রাকে একবারে তেল দিচ্ছে সর্বোচ্চ ২০ লিটার। ফলে ৭০ লিটার তেল ভরতে ট্রাক ড্রাইভার মোহাম্মদ সিরাজকে ঘুরতে হয়েছে চারটি পেট্রোল পাম্প। গাড়িতে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে নগরজুড়ে পাম্প ঘুরতে ঘুরতেই তার চলে যাচ্ছে পুরোদিন। অর্থ্যাৎ ঢাকায় রওনা দেওয়ার আগে ডিজেল নিতেই তার লাগছে একদিন।
এভাবে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাগায় কমে গেছে ট্রিপ। আর তেল নিতে বাড়তি সময় লাগার কারণে কর্মঘণ্টা যোগ হয়ে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের বাজারদরে।
মোহাম্মদ সিরাজ বললেন, ‘আগে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে দু’দিনে দিতে পারতাম একটি ট্রিপ। এখন ৬ দিনে দিচ্ছি একটি ট্রিপ। কারণ ঢাকা থেকে ফেরার সময়ও একইভাবে তেল সংগ্রহে লাগছে একদিন। আর ফিরতি পথে কম থাকে ট্রিপ।’
‘আমাদের আয় নির্ভর করে ট্রিপের ওপর। ট্রিপ কমায় কমে গেছে আয়ও। ফলে কষ্ট হচ্ছে পরিবার চালাতে। জানি না এই কষ্ট শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে’— মনভার করে বললেন মেহেরপুরের বাসিন্দা সিরাজ।
চট্টগ্রামের কদমতলিতে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া নির্ধারিত হয় প্রতিদিনের চাহিদার ভিত্তিতে। সেখানকার সরবরাহকারী নুরুল ইসলামের ভাষ্য, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আগে ট্রাক ভাড়া ছিল ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ২৮ থেকে ৩১ হাজার টাকা। অর্থ্যাৎ প্রতি ট্রিপে ভাড়া বেড়েছে ন্যুনতম ৬ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম থেকে অন্য রুটগুলোতে পণ্য পরিবহন ভাড়া বেড়েছে আরও বেশি।
ভাড়া বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নুরুল ইসলামের যুক্তি, ট্রাকের তেল নিতেই যদি লাগে একদিন। তাহলে ভাড়া না বাড়িয়ে তো আমাদের কিছুই করার নেই। আর তেল সংকট যে হারে বাড়ছে তাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে পণ্য পরিবহনে।
দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি ও ৮৫ শতাংশ রপ্তানি সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর আশপাশের ১৯টি বেসরকারি ডিপো (অফ-ডক) থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার পণ্যবাহী যানবাহন (ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্রেইলর বা লরি) ছেড়ে যায় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। এর বাইরে চট্টগ্রাম জেলা ও বন্দর এলাকায় পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার। এর মধ্যে কনটেইনারবাহী লরি বা ট্রেইলর রয়েছে প্রায় ১০ হাজার।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে (প্রায় ২৫০ কি.মি) একটি বড় কাভার্ড ভ্যান বা লরির রাউন্ড ট্রিপে (যাওয়া-আসা) খরচ হয় ১৪০ থেকে ১৬০ লিটার ডিজেল । সে হিসেবে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনেই প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা সৈয়দ নুরুন্নবি লিটনের মতে, গত দুই সপ্তাহে বন্দরের বাইরে বিভিন্ন রুটে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারিতে এখনও প্রভাব পড়েনি কারণ অন্য এলাকা থেকে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এসে পরিবহন করছে পণ্য। জ্বালানি সংকট না কাটলে প্রভাব পড়বেই বন্দরের পণ্য আনা-নেওয়াতে।
তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেছেন, জ্বালানি সংকটের প্রভাব নিয়ে বিদেশি ক্রেতারাও খুব চিন্তিত। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে আগামী চার মাসে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তা জানতে চায়ছে বিদেশি পোশাক ক্রেতারা। সরকার এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট ধারণা চায়। কারণ সে হিসেবে তারাও প্রস্তুতি নিবেন আগাম।














