যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় কেন গুরুত্ব পাচ্ছে লেবানন?

সংগৃহীত ছবি
সুইজারল্যান্ডের শান্ত পরিবেশে আবারও মুখোমুখি বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দীর্ঘদিনের বৈরিতা, যুদ্ধের উত্তাপ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে এই বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিষয়টি থাকার কথা ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—তা আপাতত কিছুটা আড়ালে চলে গেছে। বরং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে লেবাননে চলমান সংঘাত এবং সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে কি না।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস বিবেচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু চুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তেহরান মনে করছে, এই হামলাগুলো শুধু যুদ্ধবিরতির চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসছে।
আজ রবিবার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। মধ্যস্থতায় রয়েছে পাকিস্তান ও কাতার। অংশগ্রহণকারীদের তালিকাই বলে দেয়, এটি কেবল আরেকটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়। বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি অর্জন করা। তবু তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট। ইরান বলছে, পারমাণবিক ইস্যুতে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতার বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে হবে। বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে তারা নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির দিকে এগোতে আগ্রহী নয়।
এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে আস্থার সংকট। অতীতে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা চলাকালেই ইরান সামরিক চাপ ও হামলার মুখোমুখি হয়েছে। ফলে এবার তারা শুধু কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয়। তেহরান চায়, ওয়াশিংটন তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রমাণ করুক। আর সেই পরীক্ষার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে লেবানন।
এখানেই সামনে আসে ইসরায়েলের বিষয়টি। সমঝোতা স্মারকে ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও লেবাননে চলমান সংঘাতের বাস্তবতা এড়ানোর সুযোগ নেই। ইরানের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই চুক্তির প্রধান পক্ষ হয়ে থাকে। তাহলে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বাধ্য করার দায়িত্বও ওয়াশিংটনের। অন্যথায় সমঝোতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস। কারণ দেশটি চুক্তির স্বাক্ষরকারী নয়। তাত্ত্বিকভাবে সমঝোতার শর্ত মানতে বাধ্যও নয়। ফলে লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তা শুধু ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের সংকট হিসেবে দেখা হবে না। বরং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সদ্য গড়ে ওঠা আস্থার ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিতে পারে।
একই সময়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রণালি বন্ধের কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে শুধু এই উত্তেজনাই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। কারণ হরমুজে যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের এই আলোচনা কেবল একটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার পথ হয়তো এখনও খোলা আছে। কিন্তু সেই পথে এগোনোর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে লেবানন প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। কারণ বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় প্রযুক্তিগত বা পারমাণবিক নয়। বরং আস্থা। আর সেই আস্থার প্রথম পরীক্ষার নাম ‘লেবানন’।







