ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নিয়ে বিভক্ত তেহরান, কী বলছে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ?

ইরানের রাজধানী তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় নয়। এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার দীর্ঘ অধ্যায়ের পর তেহরান ও ওয়াশিংটন আবার আলোচনার পথে হাঁটছে। তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে গভীর মতপার্থক্য। কেউ এটিকে শান্তি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছে। আবার কেউ মনে করছে, এটি ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের সূচনা হতে পারে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তিনি খুব কমই প্রকাশ্যে এসেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে তার অবস্থান একটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে সামনে এসেছে।
সেখানে তিনি জানিয়েছেন, নীতিগতভাবে এই চুক্তি সম্পর্কে তার ভিন্ন মত ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যখন ব্যক্তিগতভাবে এর দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তখন তিনি অনুমোদন দেন।
তবে এই অনুমোদন ছিল শর্তসাপেক্ষ। খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত দাবি তোলে বা ইরানের মৌলিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করে, তাহলে তেহরান তা মেনে নেবে না। তার ভাষ্য, আসন্ন সরাসরি আলোচনা মানেই প্রতিপক্ষের অবস্থান মেনে নেওয়া নয়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, খামেনির এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন। আবার নিজেকেও রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রেখেছেন। চুক্তি সফল হলে রাষ্ট্রের অর্জন হিসেবে তা তুলে ধরা যাবে। ব্যর্থ হলে দায়ভার বর্তাবে সরকারের ওপর।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও তার সমর্থকরা এই সমঝোতাকে দেখছেন বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত হিসেবে। তাদের মতে, বহু বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিকল্প নেই।
পেজেশকিয়ান চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি এমন একটি শক্তিশালী ইরানের বার্তা, যা পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
সরকারপন্থীদের যুক্তি হলো, যুদ্ধের মাধ্যমে যে সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি, তা আলোচনার মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আর্থিক লেনদেন সহজ করা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বিষয়গুলো ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই অবস্থানের সঙ্গে একমত পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও। তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধের সময় অর্জিত রাজনৈতিক ও সামরিক সাফল্যকে এখন আলোচনার টেবিলে কাজে লাগানোর সময় এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এটি সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। তার ভাষায়, এই সমঝোতা শুধু একটি দীর্ঘ ও কঠিন পথের শুরু।
কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থী শিবির সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা স্বভাবতই ঝুঁকিপূর্ণ। তারা মনে করে, ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতায় যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সুযোগ পেলেই ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
কট্টরপন্থীরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে বাধ্য করা হতে পারে। তারা মনে করে, হরমুজ প্রণালি, প্রতিরোধ অক্ষ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করবে।
এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্র-সমর্থিত বিভিন্ন সমাবেশে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং গালিবাফের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা দেখা গেছে। কট্টরপন্থীদের চোখে এই তিন নেতাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার প্রধান মুখ।
রাজধানী তেহরানের কাছের শাহর-ই-রে এলাকায় আয়োজিত এক সমাবেশে একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় বক্তা সরাসরি প্রেসিডেন্টকে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। যদিও প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এসব বক্তব্যকে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
সংসদের ভেতরেও এই বিরোধিতা স্পষ্ট। কয়েকজন কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য দাবি তুলেছেন, যুদ্ধের কারণে সীমিত কার্যক্রমে থাকা পার্লামেন্ট দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে। তাদের যুক্তি, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো সমঝোতা হলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব সংসদেরই।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ধর্মীয় নগরী মাশহাদের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আহমাদ আলামোলহোদাও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, কট্টরপন্থী মহল এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের প্রধান শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করছে। তাদের মতে, সংঘাতের অধ্যায় এখনো শেষ হয়নি।
তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, তারা দেশের স্বার্থ ও তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ স্বার্থ রক্ষা করেই আলোচনা এগিয়ে নেবে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক চাপ। অন্যদিকে রয়েছে আদর্শিক অবস্থান, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে না। সমানভাবে নির্ভর করছে তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের চূড়ান্ত অবস্থানের ওপর।
আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইরানের ভেতরের বিতর্ক শেষ হয়নি। বরং বলা যায়, আসল রাজনৈতিক লড়াই এখনই শুরু হয়েছে।









