লেবাননের যুদ্ধই কি ভেঙে দেবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি উদ্যোগ?

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং রাজনৈতিক বৈরিতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তির একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, অঞ্চলটি হয়তো নতুন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু সেই আশার মধ্যেই আবারও সামনে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো বাস্তবতা ‘লেবাননের যুদ্ধ’।
আজ শনিবার লেবাননে ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় চালানো এসব হামলায় সাধারণ নাগরিক, একই পরিবারের সদস্য এবং একজন লেবানিজ সেনাও নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। হামলার ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি চলছিল।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—লেবাননের যুদ্ধ কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া শান্তি প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ের সমঝোতা স্মারকের অন্যতম ভিত্তিই ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমানো। বিশেষ করে লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সেখানে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার বিষয়টি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অর্থাৎ লেবাননের পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
আগামীকাল রবিবার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফা আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এতে পাকিস্তান ও কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অংশ নেবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধি দল আলোচনায় অংশ নিতে যাচ্ছে।
কিন্তু আলোচনার আগে লেবাননের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সংশয় তৈরি হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, লেবাননে কার্যকর যুদ্ধবিরতি এই আলোচনার জন্য অপরিহার্য। তার মতে, লেবাননের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করতে পারে আলোচনা সফল হবে, নাকি ব্যর্থ হবে।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তেহরান লেবাননকে এখন শুধু একটি মিত্র রাষ্ট্রের সংকট হিসেবে দেখছে না। বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে লেবাননে যা ঘটছে, তা সরাসরি ইরানের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ইরানের প্রতিক্রিয়া। তেহরান দাবি করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার চেতনাকে ক্ষুণ্ন করছে। এমনকি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণাও দিয়েছে। যদিও বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবে এটি একটি কঠোর বার্তা। এর মাধ্যমে ইরান দেখাতে চেয়েছে, তারা ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি কঠিন অবস্থানে রয়েছে। একদিকে তারা ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক অবস্থানের প্রতিও সমর্থন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটনের জন্য ভারসাম্য রক্ষা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস অবিশ্বাসে ভরা। পারমাণবিক চুক্তি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশ একে অপরকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। ফলে নতুন সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলেও সেই অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। লেবাননের সাম্প্রতিক সময়ের সহিংসতা সেই অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এদিকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহও একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করছে। হিজবুল্লাহ বলছে, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিত থাকা অবস্থায় যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থ নেই। তারা ঘোষণা দিয়েছে, আগ্রাসন চললে প্রতিরোধও চলবে। অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহই নতুন করে হামলা চালিয়ে সংঘাত উসকে দিচ্ছে।
এই পারস্পরিক অভিযোগ-প্রত্যাঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। যুদ্ধের পেছনে থাকা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান না হলে সংঘাত আবারও ফিরে আসতে পারে।
লেবাননের সেনাবাহিনীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ইসরায়েলের চলমান হামলা দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে লেবানন সরকার একদিকে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সামলাতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে সুইজারল্যান্ডে কূটনীতিকরা শান্তির ভাষায় কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে লেবাননের আকাশে এখনো যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। একদিকে সমঝোতার দলিল, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন প্রাণহানি।
এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি উদ্যোগের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে লেবাননের পরিস্থিতির ওপর। যদি সেখানে যুদ্ধবিরতি টেকসই না হয়, তাহলে আলোচনার টেবিলে অর্জিত অগ্রগতিও দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার যদি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাহলে সেটি দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
লেবাননের যুদ্ধ আজ শুধু লেবাননের বিষয় নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আগামী কয়েক দিন ও কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহই বলে দেবে, সুইজারল্যান্ডের আলোচনার টেবিল শেষ পর্যন্ত বেশি শক্তিশালী হবে, নাকি লেবাননের যুদ্ধক্ষেত্রই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।







