কেন এখনো যুদ্ধে যোগ দেয়নি ইরানের মিত্র হুতিরা?

সংগৃহীত ছবি
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে আবুধাবি, দোহা, কুয়েত সিটি, মানামা ও বৈরুতসহ একাধিক আরব শহরে।
বেশ কয়েকটি দেশে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির এই ঢেউয়ের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে ইয়েমেন এখনো শান্ত। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা শুরুর পর থেকে ইরানের মিত্র হুতিরা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে বারবার আক্রমণ চালিয়েছে।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা তেহরানের প্রতি তাদের সমর্থন কেবল বক্তব্য এবং হামলার নিন্দা জানিয়ে গণবিক্ষোভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে।
তারা সংঘাত থেকে দূরে থাকবে কিনা তা এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, গোষ্ঠীটির এই যুদ্ধে জড়িত হওয়া এখনো সম্ভব। তাদের বর্তমান সংযম কৌশলের অংশ বলে মনে হচ্ছে।
সশস্ত্র সংঘাতের স্থান এবং ঘটনা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য দিয়ে থাকে এসিএলইডি। ‘এই যুদ্ধে হুতিদের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। পর্যায়ক্রমে হয়তো গোষ্ঠীটি এই লড়াইয়ে অংশ নেবে। বর্তমানে হুতিদের প্রধান অগ্রাধিকার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি হামলা এড়ানো,’ আল জাজিরাকে বলছিলেন সংস্থাটির ইয়েমেন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সিনিয়র বিশ্লেষক লুকা নেভোলা।
গত আগস্টে, সানায় ইসরায়েলি হামলায় হুতির কমপক্ষে ১২ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা নিহত হন। যাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাবি এবং চিফ অফ স্টাফ মোহাম্মদ আল-ঘুমারিও ছিলেন।
‘এই গোষ্ঠীটি মনে হচ্ছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সক্ষমতায় ভীত। পাশাপাশি তাদের নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় কি-না তা নিয়েও শঙ্কিত,’ বলছিলেন নেভোলা।
তবে গত বছরের ক্ষতি সত্ত্বেও গোষ্ঠীটি দুর্বল হয়ে পড়েনি। তারা এখনও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করতে সক্ষম।
নেভোলা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে হামলা করে তাহলে হুতিরা এই যুদ্ধে যোগ দেবে। এছাড়া ইয়েমেনে বিরোধীরা যদি হুতিদের বিরুদ্ধে সফলতা পায় তখনও হয়তো গোষ্ঠীটি এই সংঘাতে যোগ দিতে পারে।
ইয়েমেন স্পষ্টভাবে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র এবং মুসলিম ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহে আশ্বস্ত করেছিলেন হুতি প্রধান আবদেল-মালিক আল-হুতি।
‘সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ট্রিগারে রয়েছে আমাদের আঙুল। যেকোনো মুহূর্তে আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ব,’ জোর দিয়েছেন তিনি।
রিজার্ভে একটি কার্ড ধরে রাখা
ইরান অনুরোধ করলে ইয়েমেনের হুতিরা যুদ্ধে জড়াবে বলে অভিমত ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদাম আল-হুরাইবির। ‘তেহরান একসঙ্গে তার সব কৌশলগত কার্ড ব্যবহার করতে চায় না। পরবর্তী ধাপের জন্য হুতি গোষ্ঠীকে সংরক্ষণ করে রাখতে চায় তারা,’ আলজাজিরাকে বলছিলেন এই বিশ্লেষক।
‘আমার বিশ্বাস, হুতিদের যুদ্ধে জড়ানো কেবল সময়ের ব্যাপার। যদি ইরানের ওপর হামলা বন্ধ না হয়, তাহলে ইয়েমেনের এই গোষ্ঠী অনির্দিষ্টকাল ধরে চুপ করে বসে থাকবে না। সানাসহ তারা যে প্রদেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে হুতিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে,’ যোগ করেছেন সাদাম আল-হুরাইবি।
হুরাইবির মতে, হুতিরা এখনও লোহিত সাগরে অস্থিরতা সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে। এই সাগরে তারা অতীতে গাজাকে সমর্থনের অংশ হিসেবে বহুবার জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তারা এখনও ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়তে পারে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা নির্ভর করবে হুতি ও ইরান যে সময় নির্ধারণ করবে তার ওপর।
হুরাইবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন নেভোলা। ‘এখন যেহেতু ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ইরানপন্থী আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো সরাসরি আক্রমণের মুখে, তাই ইয়েমেন থেকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা এবং হুতি শাসনকে একটি নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে টিকিয়ে রাখা—সম্ভবত কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।’
ইয়েমেনি গবেষক এবং মেসা গ্লোবাল একাডেমির নন-রেসিডেন্ট ফেলো আদেল দাশেলা মনে করেন, হুতিরা বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করতে চায় না, কারণ তারা নিজেদের তেহরানের নির্দেশের অধীন নয়— এমন একটি স্বাধীন গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
‘বাস্তবে এই গোষ্ঠী ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অংশ। যুদ্ধ তাদের কাছেও পৌঁছাতে পারে। হুতি নেতৃত্ব এখনও পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না,’ আল জাজিরাকে বলছিলেন দাশেলা।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু
হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। নেভোলার মতে, ‘যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হুতিরা নিজেদের হুমকির মুখে মনে করে, তাহলে তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা সম্প্রসারিত করতে পারে। ইসরায়েলের মূল ভূখন্ড এবং এ অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। পাশাপাশি এ অঞ্চলে ইসরায়েলের অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সোমালিল্যান্ডেও হামলা চালাতে পারে।’
গত এক সপ্তাহে ইরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। ফলে হুতিদের সম্ভাব্য হামলা আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
নেভোলা ব্যাখ্যা করেছেন, সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে হুতিদের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর হবে। কারণ তখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পুনরায় সরঞ্জাম সরবরাহে সীমাবদ্ধতা দেখা দেবে। দক্ষিণ দিক থেকে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলে গেলে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ বাড়বে।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগর করিডোরে জাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক সামরিক হামলা চালায়। এই অভিযানে অন্তত ৯ নাবিক নিহত এবং চারটি জাহাজ ডুবে যায়। ফলে বাণিজ্যিক নৌপথটিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। যুদ্ধের আগে এ পথে বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবহন হতো।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের অনেক রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হয়েছেন।
এই উচ্চপদস্থদের হত্যার ফলে ইরানি শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, আর সেই শাসনের পতন এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বের একটি প্রধান লক্ষ্য। ইরান দুর্বল বা দেশটির বর্তমান শাসনকাঠামোর পরিবর্তন হলে তার প্রভাব ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করেন আল-হুরাইবি।
এতে গোষ্ঠীটি সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ ইয়েমেনে ইরান থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র আসার প্রবাহ কমে যাবে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি গোষ্ঠীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে অভিমত তার।
২০২২ সালে জাতিসংঘ জানায়, আরব সাগরে জব্দ হওয়া হাজার হাজার অস্ত্র সম্ভবত ইরানের একটি নির্দিষ্ট বন্দর থেকে এসেছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া, চীন ও ইরানে তৈরি অস্ত্র নৌকা ও স্থলপথে চোরাচালানের মাধ্যমে ইয়েমেনে আনা হয়েছে। তবে ইরান বারবার দেশটিতে অস্ত্র পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হুরাইবির মতে, ইরানের নেতৃত্বের ওপর সাম্প্রতিক হামলা হুতি গোষ্ঠীর মনোবলেও বড় আঘাত দিয়েছে। হুতিদের কাছে ইরান একটি ধর্মীয় প্রতীক। সেই প্রতীক যদি পরাজিত হয়, তাহলে মনোবল আগের মতো থাকতে পারে না। ইরানি শাসনের পতন হলে তা অঞ্চলে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর পতনের সূচনা হতে পারে।
সানায় উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলা ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। এটি তাদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
হামলার প্রথম দিনই পরিবারকে রান্নার গ্যাস এবং ময়দা, চাল ও রান্নার তেলের মতো খাদ্যপণ্য মজুত করার তাগিদ দিয়েছেন সানার ২৮ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া। এর কারণ, যখনই উত্তেজনা বাড়ে তখনই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়।
‘আমি ভেবেছিলাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সানায় বিমান হামলা শুরু হবে। তাই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে অন্তত যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন বাড়িতে থাকার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম,’ আলজাজিরাকে বলছিলেন ইয়াহিয়া।
কিন্তু তার প্রত্যাশার বিপরীতে হুতিরা এখনও সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। ‘আমি কখনও ভাবিনি এমন একটি দিন আসবে যে, এই অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে আর ইয়েমেনিরা শুধু তা দেখছে। তবে শেষ পর্যন্ত হুতিরাই সিদ্ধান্ত নেবে ইয়েমেন এই সংঘাতে জড়াবে কি-না,’ কিছুটা উদ্বেগই প্রকাশ করেছেন ইয়াহিয়া।




