তিস্তার সংকট শুধু পানি নয়

সংগৃহীত ছবি
তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি রংপুর বিভাগ তথা উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি, সংস্কৃতির প্রাণ এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্তির পথ। এটি বৈষম্যকবলিত রংপুর বিভাগের বৈষম্য কমানোরও একটি সুযোগ। প্রায় ২৪০ বছর বয়সী এই নদী অব্যবস্থাপনা, পানির সংকট, ভাঙন ও অবহেলার কারণে ধুঁকছে। তিস্তা পাড়ের মানুষও প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার সংগ্রামে লড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে ভারত গজলডোবায় পানি আটকিয়ে তাদের খননকৃত খাল দিয়ে পানি সরিয়ে নেয়। এরপরও চুয়ানি পানি ও উপনদীর কিছু পানি তিস্তায় প্রবাহিত হয়। সেই পানিটুকুও ডালিয়া ব্যারাজে আটকে সেচ দেওয়া হয়, ফলে নদী হয়ে পড়ে পানিশূন্য। অন্যদিকে শুষ্ক সময়েও আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভাঙন সবকিছু কেড়ে নেয়।
এই বাস্তবতায় বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা পানিবণ্টনচুক্তি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার ন্যায্য পানির হিস্যা পেলে নদী কিছুটা প্রাণ ফিরে পাবে—এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ সামনে এসেছে—তিস্তা পানিচুক্তি বাস্তবায়িত হলেও কি তিস্তা পাড়ের মানুষের সব সমস্যা দূর হবে?
এর উত্তর স্পষ্ট—না।
তিস্তার সংকট শুধু পানির নয়
তিস্তার পানি চুক্তি প্রয়োজনীয়, কিন্তু একক সমাধান নয়। তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে উজানে নিয়ন্ত্রণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপথ এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি ন্যায্য পানি চুক্তি এই সংকট কিছুটা লাঘব করতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—তিস্তার সমস্যা শুধু পানির পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়।
নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, নাব্যতা কমেছে, অসংখ্য স্থানে চর জেগে উঠেছে। নদীর গতিপথ অস্থির হয়ে তীরভাঙন বাড়ছে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নেমে এসে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদী মরুভূমির চেহারা ধারণ করে। অর্থাৎ, পানি এলেও যদি নদীর তা ধারণ করার সক্ষমতা না থাকে, তবে সেই পানি আশীর্বাদের বদলে দুর্যোগ হয়ে উঠতে পারে।
কেন জরুরি তিস্তা মহাপরিকল্পনা
পানিচুক্তির পাশাপাশি নদীর পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা অপরিহার্য। একটি উদাহরণ দিয়ে বলি—২০১১ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা পানিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতার কারণে ১৫ বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ধরুন, বর্তমান সময়ে দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে আগামী শুষ্ক মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে পানিচুক্তি কার্যকর করল। বর্তমান নদীর যে অবস্থা, তাতে চুক্তির পানি দেওয়া শুরু হলে তিস্তার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। নদীর নির্দিষ্ট গতিপথ না থাকলে পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে ফসলিজমি ডুবে যাবে, ভাঙনও বাড়বে।
তিস্তার নিচু এলাকাগুলোতে প্রচুর বাদাম ও পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, যা শুধু এ অঞ্চলের নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাহিদাও মেটায়। কিন্তু পানিপ্রবাহের সুনির্দিষ্ট গতিপথ না থাকলে সেই পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ফসলিজমি পানিতে ডুবে থাকবে, ভাঙনও বাড়বে। এক অর্থে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হবে। অর্থাৎ, বর্ষায় যেমন ভাঙন হয়, খরার সময়ও তেমনি ভাঙন দেখা দেবে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে হঠাৎ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি আসায় কৃষকরা পেঁয়াজ ও বাদাম ঘরে তুলতে পারেননি। হড়কা বন্যায় এ বছরও তামাক, পেঁয়াজ ও বাদামের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। কাজেই এই পানি তখন তিস্তা পাড়ের মানুষের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং নতুন দুর্দশা ও জীবিকার ওপর আঘাত হয়ে দাঁড়াবে। ফলে দেশের চাহিদা মেটাতে পেঁয়াজ ও বাদাম আমদানির পরিমাণও বাড়াতে হবে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা
তিস্তার মূল ধারাটি ব্যাপকভাবে খনন করা হলে পুনরুদ্ধার হবে ১৭২ বর্গকিলোমিটার জমি, যার সম্ভাব্য মূল্য (২০২৩ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী) ১৩,১১৬.৫১ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর নদীতীরবর্তী ১১,২৩৯.২৭ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে। এতে আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নতি হবে, বাড়বে প্রবৃদ্ধি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। নদী ও মানুষের পুনর্জাগরণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
এই পরিকল্পনা শুধু নদী খননের প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষার একটি সমন্বিত নকশা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বহুমাত্রিক সুফল মিলতে পারে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার বহুমাত্রিক সুফল
নদীর নাব্যতা ফিরবে, বন্যা কমবে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে নদী খনন ও পলি অপসারণের মাধ্যমে তিস্তার পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এতে বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি কমবে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করা যাবে। তিস্তা নদীর বহু শাখা-প্রশাখার সংযোগ বর্তমানে বিচ্ছিন্ন। এসব শাখা-প্রশাখা পুনঃসংযোগ ও খনন করা হলে নতুন করে খাল খননের প্রয়োজন হবে না। বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা যাবে এবং অতিবৃষ্টি বা বন্যার সময় তিস্তার অতিরিক্ত পানি এসব শাখা-প্রশাখা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যার ভয়াবহতা কমাতে সহায়তা করবে।
ভাঙনরোধে রক্ষা পাবে হাজারো পরিবার। প্রতিবছর তিস্তা পাড়ের বহু মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। পরিকল্পিত তীর সংরক্ষণ ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হলে এই মানবিক বিপর্যয় থেকে মানুষ রক্ষা পাবে। সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো, কাঁচা-পাকা রাস্তা, ফসলিজমি এবং গাছপালা সুরক্ষিত থাকবে।
কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। এক ফসলিজমি তিন ফসলি জমিতে পরিণত হবে। বর্তমানে অনাবাদি থাকা জমিগুলোও চাষাবাদের আওতায় আসবে।
সেচব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি এখনো অনেকাংশে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হলে সারা বছর সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে ফসল উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।
যোগাযোগ ও আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তিস্তার দুই তীরকে কেন্দ্র করে আধুনিক সড়ক, পর্যটন, বাজার ও শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উত্তরাঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। নদী বাঁচলে মাছ বাঁচবে, জলজ প্রাণী ফিরবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। তিস্তার পুনর্জীবন মানে পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
চুক্তি না হলেও কেন কাজ শুরু জরুরি
ধরা যাক, কূটনৈতিক জটিলতায় তিস্তা পানিচুক্তি আরও দীর্ঘ সময় পিছিয়ে গেল। তাহলে কি তিস্তা পাড়ের মানুষ অপেক্ষা করেই থাকবে?
অবশ্যই না।
বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে—আমরা চাইলে নিজেদের প্রয়োজনীয় বড় প্রকল্প নিজেরাই বাস্তবায়ন করতে পারি। সম্প্রতি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য একনেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং রোডম্যাপ অনুমোদন করা হয়েছে। অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা পদ্মা ব্যারাজের ব্যয়ের চার ভাগের এক ভাগ মাত্র।
তিস্তা মহাপরিকল্পনাও সেই সাহসী সিদ্ধান্তের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা সংগঠন ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর দাবি, তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠন করে তিস্তা বন্ড চালু করা হলে বন্ড কিনে অর্থের জোগান জনগণই দেবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনোভাবেই চীন বা ভারতের প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প। আমাদের প্রকল্প আমাদের টাকায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা।
এখনই সময় বাস্তব সিদ্ধান্তের
তিস্তা পাড়ের মানুষ আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা চায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ। পানি চুক্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলুক, কিন্তু সেই অপেক্ষায় মানুষের জীবন থেমে থাকতে পারে না।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা তিস্তা পানিচুক্তির বিকল্প নয়; একটির সঙ্গে অপরটির সম্পর্ক পরিপূরক। তিস্তা চুক্তির অপেক্ষায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ বিলম্বিত করা ঠিক হবে না। কারণ তিস্তা পানিচুক্তি হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন, না হলেও প্রয়োজন। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাঁচার অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তির পথ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
তিস্তার কান্না থামাতে হলে, নদী ও মানুষকে বাঁচাতে হলে, পানি চুক্তি হোক বা না হোক—তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। আজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তিস্তা বাঁচলে উত্তরাঞ্চল বাঁচবে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, রংপুর জিলা স্কুল




