নিওলিবারেল ট্রমা অথবা অসামান্য সুরের সেতু

সংগৃহীত ছবি
প্রতিটা চাকরিহীন ব্যক্তিগত 'মাঘ মাস' অতিক্রম কালে আমার মাথায় আইয়ুব বাচ্চু বেজে ওঠে...। কারণ- 'চাঁদ ছাড়া যে, আমার আর... অন্য কোনো মামা নাই।' ১৬ আগস্ট আইয়ুব বাচ্চুর শুভ জন্মদিন। কিন্তু ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনে কেবল একজন স্পিড-কিং গিটার জাদুকরকে স্মরণের আনুষ্ঠানিকতায় শেষ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আইয়ুব বাচ্চু কোনো সাধারণ পপ আইকন বা কিছু কালজয়ী মেলোডির নিছক স্রষ্টা নন; তাঁর সুর ও কণ্ঠ আমাদের টেনে নিয়ে যায় নব্বইয়ের সেই ধূসর, বিষণ্ণ, কুয়াশাচ্ছন্ন দিনগুলোতে।
নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যখন এলআরবির 'স্বপ্ন' অ্যালবামে আইয়ুব বাচ্চু তাঁর গিটারের তীব্র মেলোডিক স্ট্রোক আর ভাঙা দরদী কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন—"সুখতলি ক্ষয়ে গেছে, ছিঁড়ে গেছে জামা / একটা চাকরি হবে, চাঁদ মামা?"—তখন তা কোনো সাধারণ রোমান্টিক বা স্যাড মেলোডি গান হিসেবে আটকে থাকে না। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তরুণ্যে পা রাখা এক দিশেহারা, আশাহত প্রজন্মের সেই অস্ফুট আত্ম চিৎকারের লিগেসি আজকের বাস্তবতায়ও হাজিরা দেয়- নিয়মিত।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, যখন আমরা চব্বিশের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখা যায়—নব্বইয়ের সেই মেলাঙ্কোলিক ব্লুজ সুর থেকে আজকের রাজপথের প্রটেস্ট হিপহপ ও রকের ডিস্টোর্শন কীভাবে একটি দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাস তৈরি করেছে। আর অবশ্যই শিল্প-ভাষার ভিন্নতার অবসরে সেই একই কূটাভাষ, একই গোলকধাধার কপাললিখন পড়ে নেয়া যায়।
নব্বইয়ের দশকের সূচনা হয়েছিল এক মহিমান্বিত রাজনৈতিক প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে। রাজপথে তরুণদের রক্ত ও আত্মত্যাগে এরশাদের ৯ বছরের সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল। তিন জোটের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল এই অঙ্গীকারে যে, বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরতন্ত্র ফিরবে না, বাকস্বাধীনতা হরণ করা হবে না এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠবে।
কিন্তু স্বৈরাচার বিদায় নেওয়ার পরপরই রাজনৈতিক দলগুলো—বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত—ক্ষমতার খেলায় মেতে ওঠে। রাজপথের লড়াই শেষে তরুণরা দেখল, যাদের তারা বিশ্বাস করেছিল, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের দেওয়া রক্তকে নিছক ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি বানিয়েছে। রাজপথ রূপ নিল হিংস্র দলীয় সংঘর্ষ, নৈরাজ্য, হরতাল আর ভোট কারচুপির মহড়ায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সেই উদ্দীপ্ত তরুণরা রাতারাতি অনুধাবন করল—তারা ব্যবহৃত হয়েছে এবং চরমভাবে প্রতারিত হয়েছে।
কেবল রাজনৈতিক বেইমানিই নয়, নব্বইয়ের তরুণদের রাজনীতিবিমুখ করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় ও প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা ছিল তৎকালীন নিওলিবারেল (নব্য-উদারবাদী) অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রবর্তন। মুক্তবাজার অর্থনীতির চটকদার প্রলোভনে রাষ্ট্র তার মৌলিক সামাজিক দায়িত্বগুলো থেকে হাত গুটিয়ে নিতে শুরু করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান রূপ নেয় বাণিজ্যিক পণ্যে।
চব্বিশের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লবের সাথে সাথে বাংলাদেশের কালচারাল সিনে এক যুগান্তকারী লিফট-অফ ঘটেছে। নব্বইয়ের দশকে রক মিউজিক যে রাজনীতিকে সরাসরি ছুঁতে কুণ্ঠাবোধ করত কিংবা রূপকের আড়ালে ঢেকে রাখত, আজকের তরুণ রক ও হিপহপ শিল্পীরা সেই ট্যাবু পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
চরম বাজারকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা চাপিয়ে দেওয়া হলো, তখন মধ্যবিত্ত তরুণদের ওপর নেমে এলো তীব্র অস্তিত্ব সংকট। রাজপথের রাজনীতি তাদের অধিকার দেওয়ার বদলে ডেকে আনত সহিংসতা আর মামলা-হামলা। ফলে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাড়নায় তরুণরা রাজনীতিকে এক অরুচিকর, বিষাক্ত ও বেইমানদের আখড়া হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তরুণদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, বিসিএস বা যেকোনো মূল্যে আত্মরক্ষার ইন্দুর দৌড়ে নামতে বাধ্য করাই ছিল নিওলিবারেল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের রক মিউজিক সিন নিজেও এক বড় রকমের সাংস্কৃতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল। পশ্চিমা বিশ্বের 'অ্যাংরি ইয়ং ম্যান' কালচার বা ইউরোপীয় ব্যান্ডের মতো সরাসরি লিটারাল পলিটিক্যাল প্রটেস্ট (Literal Political Protest) কিংবা স্পষ্ট স্লোগানধর্মী গান গাওয়ার মতো পরিকাঠামো বা সামাজিক সুরক্ষা তৎকালীন বাংলাদেশে ছিল না। বাংলা রক মিউজিক নিজেও তখন কেবল কৈশোর পার হয়ে সদ্য তরুণের মতো টলমল পায়ে পথ হাঁটতে শুরু করেছে।
সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার মেজাজ তখন না থাকলেও, রাজনীতি ও নিওলিবারেল রাষ্ট্র যা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল—অর্থাৎ চরম একাকীত্ব, বেকারত্বের ট্রমা, আত্মপরিচয়ের সংকট আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—ব্যান্ড মিউজিক সেগুলোকে পরম মমতায় ও দরদ দিয়ে বুকে তুলে নিয়েছিল।
রাজনীতিবিমুখ সেই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে আইয়ুব বাচ্চুর 'চাঁদ মামা' গানে কোনো সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, কিন্তু তৎকালীন সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চরম দেউলিয়াত্বের গল্প সেখানে ছিল ছত্রে ছত্রে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা একজন স্বজনহীন তরুণের যখন নিওলিবারেল রাষ্ট্রে কোনো প্রভাবশালী 'মামা' থাকত না, তখন সে বুঝতে পারত তার যোগ্যতা এই ব্যবস্থার কাছে শূন্য। রাষ্ট্র যখন কর্মসংস্থান ও ন্যূনতম মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়, তখন একাকী রাতে মাথার ওপর নিঃসঙ্গ চাঁদ ছাড়া আর কোনো আশ্রয় অবশিষ্ট থাকে না। আইয়ুব বাচ্চুর মেলাঙ্কোলিক ব্লুজ-রক গিটার টোন ও কণ্ঠে এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক নীরব কিন্তু ধারালো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।
নব্বইয়ের দশকে যারা বড় হচ্ছিল—অর্থাৎ মিলেনিয়াল প্রজন্ম—তারা বেড়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ভেতরে। একদিকে বিটিভি, ক্যাসেটের ফিতা, বিকেলের খেলার মাঠ আর কমিকসের ছায়াঘেরা শৈশব; অন্যদিকে বড় ভাইদের চাকরি না পাওয়ার ডিপ্রেশন, রাজপথের রাজনৈতিক তাণ্ডব আর নিওলিবারেল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
মিলেনিয়ালরা যখন কৈশোর পেরিয়ে তরুণ বয়সে পা রাখল, তারা দেখল নব্বইয়ের সেই কর্মসংস্থানহীনতার ক্ষত দূর হওয়া তো দূরের কথা, সময়ের সাথে সাথে তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা, দলীয়করণ, প্রশ্নফাঁস এবং স্বজনপ্রীতির চাদরে সাধারণ মেধাবী তরুণদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি বন্দি হয়ে পড়ে। নব্বইয়ের তরুণরা যে ক্ষতের মুখোমুখি হয়ে চুপচাপ ডিপ্রেশনে ডুবে গিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনে বুক খালি করে কাঁদত, মিলেনিয়ালরা সেই একই ক্ষত বহন করে চলল যুগের পর যুগ ধরে।
নব্বইয়ের বিষণ্ণতা ও বাধ্যগত রাজনীতিবিমুখতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে দৃশ্যপটে আগমন ঘটে জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের। নব্বইয়ের তরুণরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু জেন-জিরা সম্পূর্ণ উল্টো পথ বেছে নেয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা মূলত ওই বহমান কর্মসংস্থানহীনতা, নিওলিবারেল বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তরুণদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। ২০২৪ সালে এসে সেই কোটা আন্দোলন রূপ নেয় এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। জেন-জিরা রাজপথে নেমে এসে পরিষ্কার বার্তা দেয়—তারা আর 'চাঁদ মামা'র কাছে আক্ষেপ করে কান্নাকাটি করবে না; তারা নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে। নব্বইয়ের তরুণের নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাস চব্বিশের জেন-জির হাতে এসে পরিণত হয় এক অপ্রতিরোধ্য সশস্ত্র রাজনৈতিক প্রতিরোধে।
চব্বিশের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লবের সাথে সাথে বাংলাদেশের কালচারাল সিনে এক যুগান্তকারী লিফট-অফ ঘটেছে। নব্বইয়ের দশকে রক মিউজিক যে রাজনীতিকে সরাসরি ছুঁতে কুণ্ঠাবোধ করত কিংবা রূপকের আড়ালে ঢেকে রাখত, আজকের তরুণ রক ও হিপহপ শিল্পীরা সেই ট্যাবু পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেছে, মিউজিক আর কেবল ড্রয়িংরুমের অ্যাস্থেটিক্স বা স্পটিফাইয়ের মেলোডি নয়; মিউজিক হয়ে উঠেছে রাজপথের সরাসরি সমরাস্ত্র। র্যাপ ও হিপহপ শিল্পীরা কোনোপ্রকার রূপক ছাড়াই সরাসরি স্বৈরাচার, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গান লিখেছেন। রক শিল্পীরা গিটারে হেভি ডিস্টোর্শন চড়িয়ে সরাসরি রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম ধরে চিৎকার করেছেন।
রাজপথের মিছিলে, স্পিকারের গর্জনে কেঁপে উঠেছে শহর। শিল্পে রাজনীতিকে ধারণ করাকে আজকের তরুণ শিল্পীরা আর লজ্জা বা ভয়ের বিষয় মনে করে না, বরং এটিই তাদের প্রধান পরিচয়।
নব্বইয়ের সেই নিওলিবারেল ট্রমা ও রাজনৈতিক প্রতারণায় ভোগা তরুণদের কান্না থেকে আজকের জেন-জিদের রাজপথ কাঁপানো প্রতিবাদ—এই পুরো রূপান্তরের যাত্রাপথে আইয়ুব বাচ্চু এক অসামান্য সুরের সেতু হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি যদি সেদিন তাঁর গিটারে সেই বিষণ্ণতার সুর না তুলতেন, তিনি যদি সেদিন নিঃসঙ্গ তরুণদের বেকারত্বের ক্ষতকে রূপায়িত না করতেন, তবে এই সংস্কৃতির ক্ষোভের ভিতটি হয়তো এত গভীর হতো না।
আজ ১৬ আগস্ট, আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে আমরা যখন পেছনে তাকাই, তখন দেখি—বাচ্চুর ব্লুজ গিটারে বুনে দেওয়া সেই বিষণ্ণতার বীজই বহু বছর পর চব্বিশের রাজপথে তরুণদের অধিকার আদায়ের তীব্র হুংকারে পরিণত হয়েছে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক






