বিদায় শিল্পী তরুণ ঘোষ
চিত্রকলায় বাংলা লোককথার আধুনিক রূপকার

তরুণ ঘোষ
চলে গেলেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, লোকশিল্প গবেষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আমৃত্যু চারুকলার শিক্ষক তরুণ ঘোষ। দিনটা ৯ এপ্রিল ২০২৫, রাত ১২টার পর নিজের বাড়িতেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গন হারাল এক অকৃত্রিম শিল্পসেবীকে-যিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, নকশাবিদ, থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের আর্ট ডিরেক্টর, মুখোশশিল্পী এবং লোকসংস্কৃতির গভীর সমঝদার। যিনি বাংলার লোকমিথকে আধুনিক ক্যানভাসে তুলে এনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন, এবং যাদের হাত ধরে পথ চলা শুরু করেছিল পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, তিনি তাদের অন্যতম।
তরুণ ঘোষের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২০ আগস্ট সেসময়ের ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে (বর্তমান রাজবাড়ী জেলা)। ছোটবেলা থেকেই শিল্পানুরাগী এই তরুণ বাবা-মা ও বড় ভাইবোনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ)। ১৯৭৭ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যান ভারতের বরোদায়; ১৯৮৬ সালে এম এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধীনে ‘ফোক পেইন্টিং রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রোগ্রাম’-এ তিনি কাজ করেছেন ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত—যা ছিল তাঁর পরবর্তী লোকশিল্পচর্চার ভিত্তি।
১৯৭৯ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের অন্যতম। চাকরির মধ্যেই তিনি ভারতে গিয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৮৯ সালে রাজশাহীর চাকরি ছেড়ে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে। এখানে তিনি দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন এবং ২০১২ সালে কিপার (সংরক্ষক) পদ থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি ছিলেন স্বাধীন শিল্পী বা ইনডিপেনডেন্ট আর্টিস্ট। ক্লাসরুমে না শেখালেও রাস্তাঘাট আর ঢাকা শহরের নানা আড্ডাই হয়ে উঠেছিল তরুণ ঘোষের বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাসরুম। আমৃত্যু তিনি তরুণ শিল্পীদের ও শিল্পরসিকদের দেখে গেছেন তার আশপাশে।
তরুণ ঘোষের ক্যানভাস মূলত বাঙালির লোকজীবন, মিথ ও প্রকৃতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তার সবচেয়ে খ্যাতিমান সিরিজ ‘বেহুলা’। লোককথার বেহুলা-লক্ষিন্দরকে তিনি এঁকেছেন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী, আধুনিক আঙ্গিকে। এই সিরিজের জন্য তিনি অর্জন করেছিলেন ১১তম এশিয়ান বিয়েনালের সেরা শিল্পীর পুরস্কার।
তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ: বিহেভিয়ার অব বার্ডস, পোর্ট্রেট, নেচার ইত্যাদি। তিনি কখনও এক জায়গায় থেমে থাকেননি। তার কাজে দেখা যায় নানারকম টেকনিক্যাল নিরীক্ষা, ম্যাটেরিয়াল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তার ছাত্র ও বন্ধুদের মতে, ‘উনি ছিলেন পুরাদস্তুর আর্টিস্ট। বাংলাদেশে যে অল্প কিছু মানুষ আর্ট-যাপন করে, উনি তার মধ্যে একজন। মনে হতো ওনার জীবনের সব আনন্দই আর্ট তৈরি করা, বিভিন্ন টেকনিক, ম্যাটেরিয়াল, প্রসেস—এইসবের মধ্যেই।’
মঙ্গল শোভাযাত্রার অন্যতম নেপথ্য রূপকার ছিলেন তরুণ ঘোষ। যতদিন এই দেশে মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে কিংবা বৈশাখী শোভাযাত্রা হবে তার সাথে তরুণ ঘোষের নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে। ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শিরোনামে এই আয়োজনের সূচনা হয়েছিল চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে। তরুণ ঘোষ ছিলেন সেই শোভাযাত্রার প্রথম পোস্টারগুলোর নকশাকার। তিনিই মঙ্গল শোভাযাত্রার ধারণাকে ভিজুয়াল রূপ দিয়ে জনমনে প্রতিষ্ঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। আজ যে বিস্তৃত মঙ্গল শোভাযাত্রা সারাবিশ্বে বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে, তার নেপথ্যের অন্যতম কারিগর এই শিল্পী। উল্লেখ্য, তিনি শুধু পোস্টার নয়; মুখোশ, প্যান্ডেল, ফ্লোট- সবকিছুর নকশাতেই ছিল তার ছোঁয়া, তার পরিকল্পনা।
শিক্ষকতা ও শিল্পসৃষ্টির পাশাপাশি তিনি ছিলেন লোকশিল্পের একনিষ্ঠ গবেষক। বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোক পেইন্টিং রিসার্চ প্রোগ্রামে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে দুই বাংলার লোকশিল্পের গভীরে নিয়ে যায়। জাতীয় জাদুঘরে কর্মরত থাকাকালে তিনি লোকশিল্প সংগ্রহ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তরুণ ঘোষ শুধু ক্যানভাসে আটকে থাকেননি। তিনি থিয়েটারের মঞ্চসজ্জা, মুখোশ নির্মাণ এবং চলচ্চিত্রের আর্ট ডিরেকশনেও দক্ষতা দেখিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবিতে তিনি আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। তার বহুমাত্রিক প্রতিভা এমন ছিল যে তাকে ‘যিনি সব শিল্প একাই ধারণ করেন’ এই উপাধি দেওয়া হলে মোটেও ভুল হতো না।
১৯৭৯ সালে রাজশাহী চারুকলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসেবে যাত্রা শুরু করা তরুণ ঘোষ সারাজীবন একজন প্রেরণাদায়ক গুরু ছিলেন তার শিক্ষার্থীদের কাছে। একজন ছাত্র ফেসবুকে লিখেছেন: ‘আপনি শুধু আর্টিস্ট ছিলেন না, আপনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। আপনার সাথে ক্লাসগুলো ছিল আড্ডা, কখনও মনে হয়নি সিরিয়াসলি ক্লাস করতে বসেছি। আপনার মাঝে কোনো অহংকার ছিল না—ছিল শুধু আন্তরিকতা আর ভালোবাসা।’
তরুণ ঘোষ ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা, স্নেহময় ও আন্তরিক। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন তার স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র মিথকে। তার শেষ দিনগুলোতেও তিনি শিল্পরচনা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।
তার মৃত্যুর পর চারুকলা অনুষদে মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। তিনি রয়েছেন ‘বেহুলা সিরিজ’-এর প্রতিটি রঙের ছোঁয়ায়, রয়েছেন প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিটি মুখোশ ও পোস্টারে, রয়েছেন তার হাজারো ছাত্র-ছাত্রীর কাজের ভেতর। তিনি থাকবেন বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রতিটি সূত্রে, প্রতিটি আখ্যানে। এবার যখন পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বেরুবে সেটি সম্ভবত ভয়াবহভাবে মিস করবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পী তরুণ ঘোষকে।















