রঘু রাই— সেই ঐশ্বরিক চোখ

আমার তখন ক্লাস এইট। অঙ্কের ক্লাস নিতে এলেন ড. চক্রবর্তী। ছোটোখাটো একজন মানুষ। যেন তার শরীর থেকে তখনও সত্তরের দশক বিদায় নেয়নি। পরনে বেলবটম প্যান্ট এবং হাফ শার্ট। ক্লাসে এসে প্রথমেই গণিত বইয়ের শুরুর থিয়োরি পড়াতে শুরু করলেন। কালো বোর্ডে কষলেন না চারটি অঙ্ক। ক্লাসের সকলেই বেশ অবাক হয়েছিলাম সেদিন। ক্লাস শেষে প্রথম বেঞ্চ থেকে একজন প্রশ্ন করল, স্যার, অঙ্ক করালেন না? স্যার বেরিয়ে যেতে গিয়েও ফিরে এলেন। জানতে চাইলেন, সূত্র জানো? সে বললো, জানি। ‘বল, এ-প্লাস-বি হোল-স্কোয়ারের সূত্র।’ গড়গড় করে বলে গেল সে। তার সঙ্গে আরও কেউ কেউ। এবার আরেকটি প্রশ্ন উড়ে এল। ‘এবার বল, এটার প্রমাণ কী?’ সূত্রের প্রমাণ! সে আবার কী? ‘হ্যাঁ, এটা যে সঠিক বলছো, তার প্রমাণ কী?’ আমরা বললাম, ওমুক স্যার বলেছেন, তাই। ‘কেউ বললেই সেটা সত্যি এমন কথা কোথায় লেখা আছে? বিজ্ঞান হল যুক্তির বিষয়, তাকে কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করব কেন?’ পরের দিন এই কথার সূত্রেই ক্লাস এগোলো। স্যার প্রমাণ করলেন কেন এই সূত্র সত্যি। আর বললেন, ‘এটা তোমরা আগেই জেনে যেতে যদি এই চ্যাপ্টার শুরুর আগের এই লেখাগুলো পড়তে।’
একটি ছবি কেবল একটি মোমেন্ট নয়। তারও ওপরে। যে-কোনও ভাল ছবির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন ঈশ্বর
অনেক বছর পর গত ২০২৪-এ এই কথাগুলো আবার মনে করালেন রঘু রাই। ‘একটি ছবি কেবল একটি মোমেন্ট নয়। তারও ওপরে। যে-কোনও ভাল ছবির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন ঈশ্বর।’ আর সেই ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব কেবলমাত্র সত্যির মধ্যে দিয়েই। আমি লেখার সত্যির সাথে পরিচিত বেশ কয়েক দশক। কিন্তু ছবির সত্য কী, আমার জানা নেই। আসলে, আমি নিজে কোনওদিন ফটোগ্রাফার হতে চাইনি। ছবি তোলা আমার কাছে ছিল কেবল এক আনাড়ি অভ্যেস। কিন্তু ২০২৩ সালের নভেম্বরে রঘু রাইয়ের মাস্টারক্লাসের বিজ্ঞাপন এড়িয়ে যেতে দেননি কিরীটীদা।
সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করে মাত্র ১৬ জনকে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একমাত্র আমিই আনাড়ি। সে কেবল গেছে ছবিতে গল্প শিখতে। তার ওপর যখন দেখি আমাদের সঙ্গে শিক্ষার্থী হিসেবে এসেছেন অভিনেতা বিপিন শর্মা, আমার মনোবল একদম ভেতরের সর্বশেষ প্রকোষ্ঠে দরজা বন্ধ করে লুকালো। আমি কী করে সকলকে বোঝাই যে, আমি এই মাস্টারক্লাসে এসেছি কেবল একজন মাস্টার ফটোগ্রাফারের দেখার দৃষ্টিটুকু ধার নিতে। যাই হোক, এই জানুয়ারির শীতে এসেই যখন পড়েছি বেনারসে তখন কপালে যা আছে সে তো সহ্য করতেই হবে!
হাড়কাঁপানো শীতে ভোর সাতটায় উপস্থিত হলাম ক্লাসে। ক্লাস তখনও ভরেনি। ক্লাসরুমের ঠিক শুরুতেই একটু সাইড করে বসে আছেন ছ-ফুটের, সেই আইকনিক লাল জোব্বা পরা রঘু রাই। তার সামনের টেবিলে রাখা ছোট্ট ব্লুটুথ স্পিকারে বাজছে সকালের রাগ। চোখ তুলে চাইলেন। যেন এফোঁড় ওফোঁড় করে দেখে নিলেন আমার ভেতরটাকে। লজ্জা পেলাম। এই শেষ তিরিশে এভাবে নগ্ন হতে কার ভাল লাগে!
ক্লাস শুরু হল আমাদের জমা-দেওয়া ছবি বড় স্ক্রিনে দেখানো দিয়ে। একটা করে ছবি স্ক্রিনে আসছে আর রঘু রাই ছুড়ে দিচ্ছেন তার তীক্ষ্ণ মন্তব্য। অনেকেই বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন। কারণ, স্যার আমাদের ছবির মধ্যে খুঁজছেন মুহূর্ত ছাপিয়ে-ওঠা ঈশ্বরের স্পর্শ। লাঞ্চ ব্রেক শেষ করে আমরা ঢুকে পড়লাম মাইস্ট্রোর নিজের ছবির জগতে। রঘু রাই বেছে নিয়েছেন নিজের পাঁচটি আইকনিক ছবি। একেকটা ছবির মধ্যে তিনি কেমন করে ছুঁতে চেয়েছেন ঈশ্বরের স্পর্শ। তার ভাষায়, ‘গতি’।
ওর লাদাখ সিরিজের একটি ছবি নিয়ে বেশ তর্ক হল আমাদের সকলের মধ্যে। রঘু স্যার প্রায় সকলের ল্যান্ডস্কেপ ছবিগুলো স্টিফ বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন নিজেই নিজের লাদাখ ল্যান্ডস্কেপ দেখাচ্ছেন। ফলে প্রতিবাদ উঠলো। স্যার হাসলেন। আবারও খুঁজে বার করলেন আমাদের দেখানো ল্যান্ডস্কেপ ছবিগুলো। প্রজেকশনে ফেলতে বললেন দুটো ছবি পাশাপাশি। এবার ঘুরে তাকালেন আমাদের দিকে। সত্যিই তো, ওর ছবি একদম ‘অন্যরকম’ লাগছে। এবার সন্ধে গড়াল এই আলোচনায় কেন উনি আমাদের ছবিগুলো স্টিফ বলেছেন আর, ওর ছবিতে কীভাবে এসেছে ‘গতি’। সত্যি বলছি, এই গতির সূত্র চোখের সামনে যুক্তিসহ প্রমাণ হতে দেখে আর মন খারাপ রইল না। নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করলাম, পরের দিন ভোরের শুটে এই গতি কেমন করে ধরতে পারি আমি।
সেই আমার প্রথম ভোররাতে মণিকর্ণিকা যাওয়া। যদিও আমাদের যাওয়ার মিনিট পনেরো আগেই স্যার পৌঁছে গেছেন। ছবি তোলা শুরু করে দিয়েছেন। এর মাঝেই কত কত অন্যান্য ফটোগ্রাফার হঠাৎ করে রঘু রাইকে ঘাটে দেখে এগিয়ে এসেছেন, প্রণাম করেছেন। সকলকেই হেসে অভিবাদন জানিয়েছেন রঘু স্যার। আমরা সবটাই দেখছি অবাক চোখে। আমাদের এতদিনকার চর্মচক্ষু সবে পেয়েছে ‘ঈশ্বরের’ খোঁজ। বহুবার দেখা বেনারসের সেই আদিম উপাচারের মধ্যে আমরা খুঁজছি ‘গতি’। শাটারের ক্লিকে ধরে ফেলতে চেষ্টা করছি সেই গতিকে। কেবল গতি কেন, আমরা বন্দি করছি মুহূর্তের গল্পকে। এতকাল যা শব্দে ধরতে চেয়েছি আমি, তা আলোর মধ্যে স্থির করতে চাইছি। ওই বহমান জীবনের মধ্যে থেকে আমরা আমাদের ক্যামেরায় তুলে নিচ্ছি সেই রত্ন-মুহূর্ত। রঘু রাই যাকে বারবার বলেছেন, ‘ওয়াও মোমেন্ট’। পর পর তিন দিন আমরা কুয়াশা মেখে ঘরে ফিরেছি। ফিরে দেখি, আমরা শিখিনি একটা ভালো ছবির এক্সপোজার কেমন হবে, সেই মুহূর্তে শাটার স্পিড কত হবে, ফোকাস কী, তার বদলে আমরা শিখেছি একটা ছবি তুলব কেন। বেনারসের ঘাটে সারা বিকেল রবিশংকরের সঙ্গে বাজরায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ যখন তার কয়েক গাছা চুল উড়ে গিয়ে দূরের মন্দির স্পর্শ করল, সেই ঐশ্বরিক মুহূর্তের অপেক্ষা করতে শিখেছি। জেনেছি, সবার তোলা ইন্দিরা গান্ধির ছবিগুলো পাশে সরিয়ে রেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঠিক পেছনে কেন দাঁড়ালেন রঘু রাই – যখন ইন্দিরা গান্ধির সামনে দাঁড়িয়ে আছে পুরুষ-অধ্যুষিত একটা গোটা ক্যাবিনেট। সর্বকালের প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী কতটা নিঃসঙ্গ, রঘু রাই ধরলেন শিমলায় – আলো-আঁধারিতে, ছায়ার মধ্যে – আমরা এসব দেখাকেই স্মৃতির ক্যামেরায় ভরে চললাম আরেক শীতল প্রান্তে কাকতালীয় কিনা জানি না, সে-বছরই শেষের দিকে আমি জড়িয়ে পড়লাম রঘু রাইয়ের বায়োগ্রাফির সঙ্গে। বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রচ্ছদ নির্মাণের বরাত পেলাম। রঘু স্যারের প্রথম পছন্দ সাদা-কালো প্রচ্ছদ। যদিও মোট চারটি কভার ডিজাইন করলাম যার মধ্যে একটি আমার পছন্দের আর, সেটা অবশ্যই সাদা-কালো নয়। রঘু স্যারের ছোটমেয়ে আভনি আমার পছন্দের কভারটি বেছে নিয়ে স্যারকে জোর করলেন সেটিই চূড়ান্ত করতে। যদিও স্যার প্রথমে জানতেন না তারই ছাত্র এই কভারের দায়িত্বে। বইয়ের সেটিং চলছে, ওনার আইকনিক ছবিগুলোকে লে-আউটে ফেলার দায়িত্বও আমি নিলাম। স্যার সে-সময় বেশ অসুস্থ থাকছেন মাঝেমাঝেই। তবু যথাযথ নির্দেশ দিয়ে চলেছেন ছবির প্লেসমেন্ট নিয়ে, টোন নিয়ে। আমি আমার মেধায় কাজে লাগাচ্ছি স্যারের নির্দেশ। বায়োগ্রাফি প্রকাশিত হল। আবার সেই জানুয়ারি, ঠিক একবছর বাদে আবার দেখা স্যারের সঙ্গে, ওর মেহরলির স্টুডিয়োতে। সঙ্গে স্যরের জীবনীগ্রন্থ, Raghu Rai: Wating for the Divine; খুব খুশি হলেন বই দেখে। আমাকে শেখালেন বই নির্মাণপর্বে কেন তার সাদা-কালো ছবিগুলো নিয়ে ওই নির্দেশগুলো দিয়েছিলেন।
‘পেছনের কালোকে যত সলিড করতে পারবে তত সামনের চরিত্রের ইমোশন তুলে আনতে পারবে। এটা সবসময় মনে রাখবে।’ রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে শিখিয়েছেন বেদনাহীন আনন্দ আসলে রসহীন রসগোল্লা। আর রঘু রাই শেখালেন অন্তরের শুভ্রতা উজ্জ্বল করতে হলে পেছনের কালোকেও সযত্নে লেন্সবন্দি করতে হবে। না-হলে অন্তরের সেই সাদা, সেই আনন্দ সময়ের সঙ্গে গিলে খাবে পেছনের লুকিয়ে-থাকা কালো।






