এক ঘণ্টা কমলো সময়, কমলো না তো জ্বালানি?

আগামীর গ্রাফিক্স
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্ব যখন জ্বালানি সংকটের মুখে, তখন সরকার সিদ্ধান্ত নিল অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমানোর। সপ্তাহিক ছুটি আগের মতোই দুদিন। অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিস, প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে কমে মোট পাঁচ ঘণ্টা কম কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পাঁচ ঘণ্টায় সত্যিই কি জ্বালানি সাশ্রয়ের আশানুরূপ ফল মিলবে?
চিন্তাটা খুব সরল। প্রতিদিন তো অফিসে যেতেই হবে। বাস, ট্রেন, প্রাইভেট কার বা যে যানেই যান না কেন, যাতায়াতে যে জ্বালানি খরচ হয়, তা তো এক ঘণ্টা সময় কমলেই কমে না। অফিসের ভেতরে আলো, ফ্যান, এসি, কম্পিউটার- এসব চালাতে যে বিদ্যুৎ লাগে, তা বাঁচবে হয়তো এক ঘণ্টা। কিন্তু মূল সমস্যা তো রাস্তায়। সকাল-সন্ধ্যার যানজটে পুড়ে যাওয়া জ্বালানির সামনে অফিসের সেই এক ঘণ্টার সাশ্রয় নেহাতই নগণ্য।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাহসী পদক্ষেপের বদলে আমরা দেখলাম একধরনের গড়িমসি। অথচ একদিন বাড়তি ছুটি দিলে লাভ হতো অনেক বেশি।
এবার একটু ভিন্ন চিন্তা করি। সরকার যদি সপ্তাহে আরও এক দিন ছুটি বাড়িয়ে দিত, তাহলে কী হতো? সপ্তাহে কাজ হতো চার দিন, ছুটি তিন দিন। তখন অফিসের সময় আট ঘণ্টাই রাখা যেত। তাহলে এক ঘণ্টা কমানোর দরকারই পড়ত না। কিন্তু সপ্তাহে এক দিন পুরো অফিস বন্ধ থাকায় যাতায়াত বন্ধ হতো এক দিনের জন্য। লাখ লাখ মানুষ বাসে, ট্রেনে, কারে বা মোটরসাইকেলে করে অফিসমুখী হতো না। রাস্তায় কমে যেত যানবাহনের চাপ। সাশ্রয় হতো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি। অফিসের ভেতরে বিদ্যুৎ খরচও বাঁচত পুরো এক দিন। তার ওপরে কর্মীদের মানসিক স্বস্তি, পারিবারিক সময়, যানজটের বিষাদমুক্ত এক দিন। এসব তো মূল্য দিয়ে কেনা যায় না।
তাহলে কোন পথে লাভ বেশি? সোজা অঙ্ক। পাঁচ দিন এক ঘণ্টা করে সময় কমালে জ্বালানি সাশ্রয় হয় শুধু অফিস চালানোর খাতে। আর একদিন পুরো ছুটি বাড়ালে সাশ্রয় হয় যাতায়াতের পুরো জ্বালানি ও অফিস পরিচালনার পুরো দিনের খরচ। শুধু তাই নয়, কমে যানজট, কমে বায়ুদূষণ, বাড়ে উৎপাদনশীলতা। অথচ আমরা দেখছি, সরকার সপ্তাহের ছুটি বাড়ানোর পথে যায়নি। বরং সময় কমিয়ে চিরাচরিত রুটিনে আটকে রেখেছে।
সরকার যদি সপ্তাহে আরও এক দিন ছুটি বাড়িয়ে দিত, তাহলে কী হতো? ... লাখ লাখ মানুষ বাসে, ট্রেনে, কারে বা মোটরসাইকেলে করে অফিসমুখী হতো না। রাস্তায় কমে যেত যানবাহনের চাপ। সাশ্রয় হতো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি। অফিসের ভেতরে বিদ্যুৎ খরচও বাঁচত পুরো এক দিন।
আসল কথা হলো, অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমালে মানুষ ততটা উপকার অনুভব করে না, কারণ কাজের চাপ অপরিবর্তিত থাকলেও সময় কমে যায়। অথচ সপ্তাহে একটি দিন বাড়তি ছুটি দিলে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি জনগণের জীবনযাত্রার মানও বেড়ে যেত। সপ্তাহের কর্মঘণ্টা কমানোর দুইটি পদ্ধতি তুলনা করলে দেখা যায়, চার দিনে আট ঘণ্টা করে মোট ৩২ ঘণ্টা বনাম পাঁচ দিনে সাত ঘণ্টা করে মোট ৩৫ ঘণ্টা-পার্থক্য মাত্র তিন ঘণ্টা! তাহলে এক ঘণ্টা কমানো বনাম এক দিন ছুটি বাড়ানোর মধ্যে দ্বিধা কেন?
সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের শৃঙ্খল আর প্রশাসনিক জটিলতা। অনেকের ধারণা, সপ্তাহে অতিরিক্ত ছুটি দিলে উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্য। জ্বালানি সংকটের সময় স্মার্ট সমাধান মানে শুধু ঘড়ির কাটায় হাত দেওয়া নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। পশ্চিমা অনেক দেশ মহামারী ও জ্বালানি সংকটে চার দিনের কর্মসপ্তাহ পরীক্ষা করে সফল হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, কাজের চাপ ঠিক রেখে সময় বাড়িয়ে নয়, বরং সময় কমিয়ে আরও বেশি দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।
তবুও আমাদের সরকার এক ঘণ্টা কমানোর পথই বেছে নিল। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হয় খুব সামান্য, আর মানুষের মনে তৈরি হলো হতাশা। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাহসী পদক্ষেপের বদলে আমরা দেখলাম একধরনের গড়িমসি। অথচ একদিন বাড়তি ছুটি দিলে লাভ হতো অনেক বেশি। কিন্তু সেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি কেন? আমাদের প্রশাসন আর কবে বাস্তবতার ধারে কাছে যাবে? শুধু ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে-পিছিয়েই সব সমস্যার সমাধান হবে?















