মঙ্গলের খোঁজে, বিশ্বজয়ের মঞ্চে
বিশ্ব রোবোটিক্সে ইতিহাস গড়ল ইউআইইউ

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) ২০২৬’-এ ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ‘মার্স রোভার টিম’।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে দলটি। একই সঙ্গে তারা জিতেছে ‘বেস্ট অটোনমাস সিস্টেম’ পুরস্কারও।
রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে লালগালিচা অভ্যর্থনা জানানো হয় বিজয়ী দলকে। পরে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ইউআরসির ২০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিয়েছে কোনো এশীয় দল। এই সাফল্যের অংশীদার হতে পেরে গর্বিত ইউআইইউ।
এ-সময় প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন দলের মেন্টর এবং ইউআইইউর কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইউটার হ্যাঙ্কসভিল মরুভূমিতে অবস্থিত ‘মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশন’-এর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে মঙ্গলের অনুরূপ করে। শুষ্ক আবহাওয়া, লালচে-বাদামি মাটি, পাথুরে ঢাল এবং ধূলিঝড়পূর্ণ এই কঠিন পরিবেশে বিশ্বের সেরা দলগুলো তাদের রোভার পরীক্ষা করে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, পোল্যান্ড, ভারত, কানাডাসহ ১১টি দেশের ৩৮টি দল অংশ নেয় চূড়ান্ত পর্বে। প্রতিকূল পরিবেশে চারটি জটিল মিশন সফলভাবে শেষ করে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশি দলটি।
প্রথম মিশনে দুর্গম মরুভূমি পেরিয়ে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করতে হয় রোভারকে। পরে অন-বোর্ড ল্যাবের মাধ্যমে নমুনা বিশ্লেষণ করে সেখানে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব বা জৈব উপাদানের সম্ভাবনা যাচাই করতে হয়। ইউআইইউর রোভার সফলভাবে এই কাজ সম্পন্ন করে।
দ্বিতীয় মিশনে রোবোটিক বাহুর সক্ষমতা পরীক্ষা। মানুষের সহায়তা ছাড়া স্ক্রু ঘোরানো, ভালভ নিয়ন্ত্রণ এবং প্যানেলে প্লাগ সংযুক্ত করার মতো সূক্ষ্ম কাজগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন করে রোভারটি।
তৃতীয় মিশনে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হয়। জিপিএস তথ্য ও কম্পিউটার ভিশনের সহায়তায় রোভারটি পাথর ও খাদ এড়িয়ে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এই পারফরম্যান্সের জন্যই দলটি পায় ‘বেস্ট অটোনমাস সিস্টেম’ পুরস্কার।
চতুর্থ ও সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মিশনে মঙ্গলের মতো দুর্গম ভূখণ্ডে হারিয়ে যাওয়া নভোচারীদের সরঞ্জাম খুঁজে বের করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিতে হয়। উন্নত যান্ত্রিক নকশা ও দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে রোভারটি সফলভাবে শেষ করে এ মিশনটিও।
চার দিনব্যাপী প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ইউআইইউর নয়জন শিক্ষার্থী। টিম লিডার শাইফ আল শাদের নেতৃত্বে দলটি চূড়ান্ত ফলাফলে ৪০০ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট অর্জন করে তৃতীয় স্থান দখল করে। ৪৬৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ৪১২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট নিয়ে রানারআপ হয় অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি।
বাংলাদেশি প্রতিযোগীদের ভাষ্য, বিশ্বজয়ের এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মেন্টর মো. আবিদ হোসাইন, পরামর্শক প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার এবং ড. সুমন আহমেদ। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে ইউনাইটেড গ্রুপ।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ইঞ্জি. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম এবং আইএআর-এর নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ইমেরিটাস ড. এম রিজওয়ান খান বলেন, টানা পাঁচবার এশিয়ার সেরা দল হওয়ার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, যথাযথ সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের তরুণরাও বিশ্বমানের রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।




