‘নিরাপদ’ ভবনই আগুনের ঝুঁকিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আগুনের সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকে মুহূর্তেই তৈরি হতে পারে ভয়ংকর বিপদ। যে ভবনকে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছেন দেশের মানুষ, তার প্রায় ৩৭ শতাংশই অগ্নিঝুঁকিতে। আর এই তথ্য দিচ্ছে খোদ ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটি গত বছর দেশের ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করেছে। যার ৩ হাজার ৯৩৮টিকেই চিহ্নিত করতে হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে। এর মধ্যে ৬২২টি আবার ‘অতিঝুঁকিপূর্ণের’ তালিকায়।
এখন প্রশ্ন হলো, কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে একটি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিরাপদ বিবেচনা করা হয়? মূলত দেখা হয় ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ আছে কি না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ও ব্যবহার উপযোগী সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির রিজার্ভার, আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটানোর স্প্রিংকলার, আগুন প্রতিরোধী ফায়ার ডোর, প্রশিক্ষিত জনবল ও ডেডিকেটেড ফায়ার অফিসারসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। ভূমিকম্পের ঝুঁকি নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দুর্যোগের মুহূর্তে এসব ভবন কতটা ভয়ংকর ফাঁদে পরিণত হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানালেন, ভবন পরিদর্শনের সময় তারা অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করেন। এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং উইং না থাকায় ভবনের কাঠামোগত বিষয়ে কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে তৈরি করা নির্দিষ্ট চেকলিস্টের ভিত্তিতেই একটি স্থাপনা ‘সন্তোষজনক’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ নাকি ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’— তা নির্ধারণ করা হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে মোট ১০ হাজার ৫৩৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫টি সন্তোষজনক, ৩ হাজার ৩১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬৫২টি ভবনের মধ্যে ৪৪২টি সন্তোষজনক, ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবাসিক ভবনের ৪৭৩টির মধ্যে ২৬১টি সন্তোষজনক, ১৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২২টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। পোশাক শিল্পকারখানার ১ হাজার ৫৩৩টির মধ্যে ৮৫৩টি সন্তোষজনক, ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পোশাকশিল্প বাদে ৭২০টি কারখানার মধ্যে ৪৩৪টি সন্তোষজনক, ২৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৫টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ১ হাজার ৫৩টির মধ্যে ৫৪৫টি সন্তোষজনক, ৪৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৬টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ৪৮০টির মধ্যে ৩২৮টি সন্তোষজনক, ১৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৯টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। রেস্টুরেন্টের ১ হাজার ৭১টির মধ্যে ৫৫৪টি সন্তোষজনক, ৩৭২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৪৫টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। শপিংমল ও মার্কেটের ১ হাজার ১৭১টির মধ্যে ৭২৩টি সন্তোষজনক, ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১০৩টি অতিঝুঁকিপূর্ণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৮৪টির মধ্যে ৫৩৫টি সন্তোষজনক, ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। কেমিক্যাল গোডাউনের ৯১টির মধ্যে ১১টি সন্তোষজনক, ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৮টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। ফিলিং স্টেশনের ১০১টির মধ্যে ৬৯টি সন্তোষজনক, ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭টি অতিঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া অন্যান্য ২ হাজার ৪০৪টি স্থাপনার মধ্যে ১ হাজার ৮৪০টি সন্তোষজনক, ৫২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৯টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটার ব্যবহার করে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে রয়েছে—প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি থাকা, সিঁড়িটি ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ও বাধামুক্ত থাকা এবং জরুরি মুহূর্তে নিরাপদে বের হওয়ার সুব্যবস্থা। সিঁড়িতে মালামাল রেখে চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করাকে সরাসরি ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়। এমনকি সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ের কোনায় ফুলের টব রাখাকেও দেখা হয় ঝুঁকি হিসেবে।
পরিদর্শনে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের উপস্থিতির পাশাপাশি তা কার্যকর আছে কি না এবং তা পরিচালনায় প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে কি না, তা-ও যাচাই করা হয়। এ ছাড়া বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত হোস পাইপ ও ফায়ার পাম্পের অভাব এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়াকে অগ্নিনিরাপত্তায় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভবনের আইনগত অনুমোদন ও লাইসেন্সের বিষয়গুলোও কঠোরভাবে যাচাই করে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করা হলে সেটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রাজউক অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবনে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হলে তাকে রাখা হয় ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায়। এ ধরনের ভবনে অতিরিক্ত তলাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিঁড়ির সহজলভ্যতা এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়।
এ ছাড়া ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে ভবনে বজ্রপাত প্রতিরোধক (লাইটিং এরেস্টার), ছাদের ওভারহেড পানির ট্যাংক এবং ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের ধারণক্ষমতা দেখা হয়। অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় পাম্প হাউজে ফায়ার পাম্প, অল্টারনেটিভ ডিজেল পাম্প ও জকি পাম্প থাকা আবশ্যক; শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই পাম্প হাউজ না থাকাও বড় ধরনের ঝুঁকি। পাশাপাশি বহুতল ভবনে স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফায়ার ডোর এবং সিঁড়িপথ বাধামুক্ত রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সাংবাদিকদের বলছিলেন, অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে। এ কারণে অবকাঠামোর দিক থেকে যেমন ভবনকে নিরাপদ রাখতে হবে, তেমনি অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকেও ভবনকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।



