গত বছরের তুলনায় দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়েছে ১২ শতাংশ
- ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা গেছে দুজন
- ২৪ ঘণ্টায় হামে মারা গেছে তিনজন
- হামের টিকাদান কর্মসূচি পর্যালোচনা করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের মাসগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৭০ হাজার ১০৪ জন। মারা গেছে ২১১ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই আক্রান্ত হয়েছে ৩৪ হাজার ২৫৮ এবং মারা গেছে ১১৪ জন। অর্থাৎ বছরের মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর বড় একটি অংশই ঘটেছে চলতি মাসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ২৫ হাজার ৬৩১ জন।
২০২৫ সালে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪৪ হাজার ৪৭৩ জন। চলতি বছরে একই সময় পর্যন্ত সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ১০৪ জনে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৫৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। গত বছর ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিল ১৮৮ জন। চলতি বছরে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১১ জন। অর্থাৎ এক বছরে মৃত্যু বেড়েছে ২৩ জন বা ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। জুনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৯০৭ এবং মারা যায় ১৩ জন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে, মৃত্যু হয় ৩৬ জনের। আগস্টে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। ওই মাসে আক্রান্ত হয় ২০ হাজার ৫৩৬ এবং মারা যায় ৪৩ জন। আর চলতি সেপ্টেম্বরেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ২৫৮ জনে। এ মাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১১৪ জনের। অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।
এরই মধ্যে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং অন্যজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। দুজনই নারী। একজনের বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং অন্যজনের বয়স ৫১ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। একই সময়ে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৫৫ জন। তাদের মধ্যে ৫৫৮ জন পুরুষ ও ৩৯৭ জন নারী। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
চলতি বছরের মোট আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। ৭০ হাজার ১০৪ আক্রান্তের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২১১ জনের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ নারী এবং ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ। অর্থাৎ আক্রান্তের হিসাবে পুরুষ বেশি হলেও মৃত্যুর হিসাবে নারীর সংখ্যা বেশি।
বিভাগভিত্তিক তথ্যেও ঢাকার চিত্র সবচেয়ে খারাপ। চলতি বছরে ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১০২ জন। এরপর খুলনা বিভাগে ৩৭, চট্টগ্রামে ২১, ময়মনসিংহে ২০, বরিশালে ১৬, রাজশাহীতে ১০, রংপুরে চার এবং সিলেটে একজন মারা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যায়ও ঢাকা বিভাগ শীর্ষে। এ বিভাগে চলতি বছরে আক্রান্ত হয়েছে ২৮ হাজার ২১৪ জন। এরপর খুলনা বিভাগে আক্রান্ত হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৫ জন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত কিছুদিন আগে বলেছেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সংকট আরও বাড়লে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
হামের পরিস্থিতি: ২৪ ঘণ্টায় হামে মারা গেছে তিনজন। এ সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৬৫ জন। চলতি বছরে এ নিয়ে হামে মারা গেল ১ হাজার ৮৪ জন।
হামের টিকাদান কর্মসূচি পর্যালোচনা করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ: দেশে হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগের (ভিপিডি) নজরদারি কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ একাধিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর সারা দেশে মাঠপর্যায়ে নজরদারি কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে।
ইপিআই ও সার্ভিল্যান্সের সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদের সই করা এক চিঠিতে এ কথা বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের মনোনয়নের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর ওই চিঠি দেওয়া হয়েছে। দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েক মাসে হাজারেরও বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সাব্বির হায়দার বললেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো একেবারে মাঠপর্যায়ে আমাদের কার্যক্রম দেখবে। দেশের আট বিভাগের দুটি জেলার উপজেলা পর্যায়ের মাঠে অবস্থা বিশ্লেষণের জন্য তারা কাজ করবে।’
চিঠিতে বলা হয়, দেশের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম এবং টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা, অর্জন, বিদ্যমান ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করা হবে। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত দল দেশের আটটি বিভাগের নির্বাচিত জেলা, উপজেলা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং টিকাদান কেন্দ্র/সেশন ৬ থেকে ১১ অক্টোবর মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করবে।
ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক আরও বললেন, ‘আমরা নিজেরাও দেখতে চাই এসব কার্যক্রমের কোনো ঘাটতি আছে কি না। এ ছাড়া মাঠে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা বাস্তবে জানতেই এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা করা হবে।’



