প্রশাসনে এক যুগ ধরে ৮২’র দাপট
- মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন সচিবের চুক্তির মেয়াদ বাড়ল

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হকের চাকরির মেয়াদ ফের বাড়ানো হয়েছে এক বছর। গতকাল সোমবার এ-সংক্রান্ত আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারা দুজনই বিসিএস ১৯৮২ সালের নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ এই ব্যাচের অন্তত সাত কর্মকর্তা সচিব হিসেবে রয়েছেন চুক্তিতে। এ ছাড়া বিসিএস ১৯৮২-এর বিশেষ ব্যাচের কর্মকর্তা মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ চুক্তিতে রয়েছেন ধর্ম সচিব পদে। এমনকি পদোন্নতির জন্য সুপারিশের যে কর্তৃপক্ষ, সেই সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সাত সদস্যের কমিটির সভাপতি, সদস্য সচিবসহ তিনজনই এই ব্যাচের কর্মকর্তা। সব মিলিয়ে প্রশাসনের পুরো নিয়ন্ত্রণের নাটাই এখন এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের হাতে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৪ সালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকারসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে পদায়ন শুরু হয় ব্যাচটির কর্মকর্তাদের। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যাচের কর্মকর্তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন প্রশাসন। যে ধারা অব্যাহত ছিল ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টাতেও। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারেও প্রশাসনে সেই দাপটই থাকল। অর্থাৎ এক যুগ ধরে এই ব্যাচের কর্মকর্তারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো প্রশাসন।
অবশ্য এ নিয়ে অসন্তোষও কম নয়। নাম প্রকাশে অনাগ্রহী প্রশাসনের একাধিক নিয়মিত কর্মকর্তা বললেন, এতে করে প্রশাসনের নিয়মিত ও অন্যান্য ব্যাচের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে চললে নিয়মিত কর্মকর্তারা নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবেন কী করে? তারা কবে প্রশাসনের শীর্ষ পদে কাজ করবেন? যারা এখন প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারা গত ১৫ বছর ছিলেন প্রশাসনের বাইরে। প্রশাসন সম্পর্কে হালনাগাদ ধারণা নেই তাদের। যে কারণে পদায়ন এবং বদলির অনেক ঘটনার পর ঘটেছে প্রজ্ঞাপন বাতিলের মতো ঘটনাও।
যিনি যে পদের উপযুক্ত তাকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া উচিত। কে কার অনুগত, তা দেখা ঠিক না : ফিরোজ মিয়া
জানা গেছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনে সরাসরি চালকের আসন (চেয়ার) ফিরে পায় বিসিএস ১৯৮২ সালের নিয়মিত ব্যাচ। প্রশাসনের শীর্ষ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব পদে যথাক্রমে নিয়োগ পেয়েছিলেন ওই ব্যাচের কর্মকর্তা ড. শেখ আবদুর রশিদ ও মো. সিরাজ উদ্দিন মিয়া। এ ছাড়া ওই সময় নিয়োগ পান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. এম এ মোমেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রশাসনে বদলি-পদায়ন ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত দেন প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। পরে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিলে অনেকের চুক্তি বাতিল করলেও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব এহছানুল হককে পদায়ন করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে।
এ মুহূর্তে প্রশাসনে চুক্তিতে সচিব পদে রয়েছেন বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদ এবং ওয়াক্ফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সচিব পদে আছেন ১৯৮৪ ব্যাচের নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া (পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের আব্দুল খালেক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ১৯৮৫ ব্যাচের এ এস এম সালেহ আহমেদ ও স্বাস্থ্য সচিব পদে আছেন কামরুজ্জামান চৌধুরী। এ ছাড়া বিসিএস ১৯৮৬ ব্যাচের কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান এজেএম সালাহউদ্দিন নাগরী কর্মরত রয়েছেন চুক্তিতে।
এর আগে শেখ হাসিনা সরকারের টানা ১৬ বছরের শাসনামলের বড় একটি সময় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণও ছিল এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের হাতে। ব্যাচটি থেকেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব হয়েছেন মোহাম্মদ শফিউল আলম ও খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম (বিশেষ)। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী ও নজিবুর রহমান। এ ছাড়া তখনকার স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম শহীদ খানের মতো কর্মকর্তারা তখন নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রশাসন। এই ব্যাচের বিভিন্ন ক্যাডার থেকে ৫৫ থেকে ৬০ জন কর্মকর্তা সচিব হয়েছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের, যা বিসিএসের অন্য ব্যাচগুলোর বেলায় ঘটেনি।
তবে প্রশাসনের শীর্ষপদে ঘুরেফিরে শুধু একটি ব্যাচের বঞ্চিতদের মূল্যায়ন ভালো চোখে দেখছেন না বিসিএস ১৯৮২ (বিশেষ) ব্যাচ, ১৯৮৪ ব্যাচ, ১৯৮৫ ব্যাচ, ১৯৮৬ ব্যাচ, নবম, দশম, একাদশ ও ত্রয়োদশ ব্যাচের ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের অনেকে। তাদের দাবি, বিসিএস ১৯৮২ নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তারা অন্তত একযুগ আগেই গেছেন অবসরে। অথচ বর্তমানে সচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন বিসিএস ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে এই ব্যাচের অন্তত সাত থেকে আটজন সচিব হয়েছেনও। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে তাদের ব্যাচের বঞ্চিত কর্মকর্তাদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া উচিত।
প্রশাসনবিষয়ক বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিগত সরকারের কিছু ব্যক্তি প্রশাসন সাজিয়েছিলেন তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ ও বিদ্বেষকে প্রাধান্য দিয়ে। এতে প্রশাসনের অনেক যোগ্য, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছিলেন। এ সরকারও যদি একই পথে হাঁটে, তাহলে আগের মতো অবস্থার সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রে এখন যারা সরকারের প্রশাসনবিষয়ক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাদের উচিত ব্যাচভিত্তিক বা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বাদ দিয়ে মেধাবী, দক্ষ, যোগ্য ও কর্মক্ষম সব ব্যাচের বঞ্চিতদের মূল্যায়ন করা। যিনি যে পদের উপযুক্ত, তাকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া। কে কার অনুগত, তা দেখা উচিত হবে না।’






