প্রধানমন্ত্রী
২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন করবে সরকার

সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী—ফাইল ছবি
শিল্পখাতে গ্যাস সংকট রোধে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট ৪ হাজার ৫০০ কি.মি. ২ডি সাইসমিক (দ্বি-মাত্রিক) সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গ কি.মি. ৩ডি সাইসমিক (ত্রি-মাত্রিক) সার্ভে পরিচালনা করা হবে।’
তিনি জানালেন, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ প্রণয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
নতুন এলএনজি টার্মিনাল
দেশে নতুন করে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে বলে সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘দেশে বিদ্যমান ২টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে কমবেশি গড়ে দৈনিক ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্পখাত যেন বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য মহেশখালির কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড- বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন।’
‘পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা হবে’, যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানালেন, পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে কোনো সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম চলমান।
ভোলার গ্যাস প্রসঙ্গ
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের এক সম্পূরক প্রশ্নের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মেইনল্যান্ডে নিয়ে আসতে পরিকল্পনা করা হলে তা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। আমরা সেখানে (ভোলায়) শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে চাই। এরই মধ্যে কিছু শিল্প উদ্যোক্তা সেখানে তাদের শিল্প স্থাপন করার চেষ্টা করছেন। ভোলায় শিল্প কারখানা হলে সেখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, সেখানকার অর্থনীতির আকারও বৃদ্ধি পাবে।’
এর বাইরে ভোলার গ্যাস সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন সরকারপ্রধান। একইসঙ্গে ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথাও জানালেন তিনি।
প্রকল্প, মেয়াদ ও দুর্নীতি
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতির ওপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে বর্তমান সরকার।’
তিনি বলেছেন, ‘এই দেশের অর্থনীতি বিভিন্নভাবে অপচয় করা হয়েছে, লুটপাট করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে এসবের পরিষ্কার একটি চিত্র উঠে এসেছে। বর্তমান সরকার সেই পেপারটিকে সামনে রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।’
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘দেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত একটি কারণে হয় না। বরং প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সমস্যা তৈরি করে। প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতার বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’
পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রণয়ন নিশ্চিত করা; প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা; প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন সংক্রান্ত বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে নির্দেশিকার সংশোধন; চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মনিটরিং জোরদার করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন; নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার; যে সব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি, সে সব প্রকল্পের বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও সংশোধনের কারণ নিরূপণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কর্তৃক পর্যালোচনাপূর্বক বিলম্বের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান; যে সব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম সে সব প্রকল্পের উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে প্রকল্পগুলো পুনর্বিন্যাস; স্কোপ পরিবর্তন কিংবা চলমান রাখার বিষয়ে মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ না করে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান; সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপি ব্যবহারের সম্প্রসারণ; পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদকরণ, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলের প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব প্রদানের বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান এবং সরকারি ক্রয়ে অধিকতর প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহিতামূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫ হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।







