ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী’ চালু হবে শিগগির

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা ঢাকা-কলকাতা রুটের আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেস আবারও চলাচলে ফিরতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল-সংক্রান্ত তিন দিনের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের প্রথম দিন কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছালেও একই দিনে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে মৈত্রী ট্রেনটি ফের চালুর বিষয়ে আশার আলো দেখা দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং খুব শিগগির নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা সম্ভব হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর বিষয়ে ‘খুব শিগগির’ সুখবর দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কবে নাগাদ ট্রেনটি চালু হতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, দ্রুতই একটি নির্দিষ্ট তারিখ জানানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, ঢাকার রেল ভবনে একই দিন শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের ৩৮তম ইন্ট্রা-গভর্নমেন্ট রেলওয়ে মিটিং (আইজিআরএম)।
তিন দিনের এই বৈঠকের প্রথম দিনটি অবশ্য কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন, ভারতীয় ঋণে চলমান রেল প্রকল্প, পণ্যবাহী ট্রেন এবং দুই দেশের রেলওয়ের দেনা-পাওনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলেও প্রথম দিন কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ।
তবে সভা সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার টেবিলে মৈত্রী এক্সপ্রেস ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উঠেছে। পাশাপাশি মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেসও ফের চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যাত্রীবাহী ট্রেনে অতিরিক্ত মালপত্র বহনের সুবিধার জন্য লাগেজ ভ্যান সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলোর একটি হলো মৈত্রী এক্সপ্রেসের চলাচলের পথ পরিবর্তন। বর্তমানে যমুনা সেতু হয়ে চলাচলের পরিবর্তে পদ্মা সেতু ব্যবহার করে ট্রেনটি চালানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পথে চলাচল করা গেলে যাত্রাপথের সময় অন্তত পাঁচ ঘণ্টা কমে আসতে পারে।
দুই দেশের রেল যোগাযোগের আরও কিছু বন্ধ সংযোগ পর্যায়ক্রমে সচল করা, সীমান্ত স্টেশনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল সহজ করার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। আন্তঃদেশীয় রেল অবকাঠামো, চলমান যৌথ প্রকল্পের অগ্রগতি, সীমান্ত রেলসংযোগ এবং কারিগরি সহযোগিতার বিষয়ও ছিল আলোচনায়।
সভার প্রথম দিন কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও এটিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রথম দিনেই সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে হবে এমন নয়; আরও দুই দিন আলোচনা হবে এবং শেষ দিন কার্যবিবরণী স্বাক্ষর করা হবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলছিলেন, ‘অন্য সময়ের চেয়ে এবারের সভার সময়টি ভিন্ন, তাই গুরুত্ব বেশি। সবার দৃষ্টি এখানে। এই সভা সফল হলে অন্যান্য খাতের স্থবির হয়ে পড়া আলোচনাগুলো সচল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
এদিকে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদারে ট্রেনটি ফের চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই রেলসেবা চালু হলে শুধু ঢাকা-কলকাতা যাতায়াতই সহজ হবে না, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন ও পারিবারিক প্রয়োজনে দুই দেশের মানুষের চলাচলেও নতুন গতি আসবে। সড়ক ও আকাশপথের পাশাপাশি রেলপথে যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে যাত্রীদের সময় ও খরচ দুটিই কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই দেশের অভ্যন্তরে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার সময় বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃদেশীয় ট্রেনও বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছরের ১২ আগস্ট দেশের অভ্যন্তরীণ ট্রেন চলাচল আবার শুরু হলেও মৈত্রী, মিতালী, বন্ধনসহ আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন আর চালু হয়নি।
কূটনীতিবিদদের মতে, এবারের আইজিআরএম বৈঠক শুধু নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় রেল বৈঠক নয়, দুই দেশের বন্ধ হয়ে থাকা যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ ফের চালুর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকায় মন্ত্রণালয় পর্যায়ে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের এই বৈঠক এবং একই সময়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের আশাবাদী বক্তব্য— সব মিলিয়ে ট্রেনটি ফের চালুর সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।





