সংকটের সুযোগে অবাধে বিক্রি হচ্ছে অবৈধ গ্যাস বুস্টার
- একজনের চুলা জ্বলে দশজনের নেভে
- তৈরি হচ্ছে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি
- ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি হচ্ছে দেদার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার আদাবরের একটি বহুতল ভবন। পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট, একই গ্যাসের সংযোগ। কিন্তু একটিতে চুলার আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে, অন্যটিতে গ্যাস প্রায় আসেই না। টিমটিম করে জ্বলে চুলা। কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, কৃত্রিম উপায়ে অন্যদের গ্যাস টেনে জ্বালানো হচ্ছে ওই চুলা। আর এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘গ্যাস বুস্টার’ নামে ছোট কিন্তু অবৈধ একটি যন্ত্র। অবশ্য, এর ব্যবহার নতুন নয়। এতদিন গোপনে ব্যবসা চললেও এবারের গ্যাস সংকটের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে চলে এসেছে এর কেনাবেচা, যা গ্যাস সংকটের পালে হাওয়া যেমন লাগিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকিও।
গ্যাস বুস্টার হলো একটি ছোট বৈদ্যুতিক চুষক বা কম্প্রেশন পাম্প, যা মূলত অ্যাকুরিয়াম বা এয়ার কম্প্রেসরের মোটরের প্রযুক্তি পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়। পাইপলাইনে যখন গ্যাসের চাপ কম থাকে, তখন পাইপের মুখে বুস্টার পাম্পটি সংযুক্ত করে বিদ্যুতের সাহায্যে চালু করা হয়। এটি একটি শক্তিশালী ভ্যাকুয়াম (শূন্যতা) বা চোষক শক্তি তৈরি করে লাইনে থাকা অবশিষ্ট গ্যাসকে টেনে নিজের দিকে নিয়ে আসে এবং বেশি চাপে তা চুলায় সরবরাহ করে।
গ্যাস বিতরণ আইন অনুযায়ী, মূল বিতরণ লাইন থেকে কোনো ধরনের যান্ত্রিক উপায়ে গ্যাস টানা বা বুস্টার ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন নয়, বরং জরিমানা ও জেলহাজতের বিধান রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ আগামীর সময়কে বললেন, ‘গ্যাস বুস্টার অবৈধ। যে নামেই হোক এটি ব্যবহার ও বিক্রি করা অপরাধ। বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে এসব বুস্টার উচ্ছেদ ও জরিমানা করা হয়েছে। তিতাসের এই অভিযান চলমান।’
অবৈধ হলেও শহরের অলিগলি, এমনকি শিল্প এলাকাতেও বুস্টার বসিয়ে গ্যাসের চাপ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বাজারে এগুলো বিক্রি হচ্ছে ‘গ্যাস বুস্টার’ বা ‘গ্যাস স্ট্যাবিলাইজার’ নামে। বহুল পরিচিত কেনাবেচার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দারাজেও দেদার বিক্রি হচ্ছে অবৈধ পণ্যটি। এ ছাড়া হাটবাজারসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে এই গ্যাস বুস্টার। আবার অনেকে ব্যক্তিগতভাবেই অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে পণ্যটি বিক্রি করছেন। এ ছাড়া নবাবপুর, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রিও হচ্ছে প্রকাশ্যে। চীন, ভারত থেকেও করা হচ্ছে আমদানি।
কথা হলো আদাবরের গ্যাস বুস্টার বসানো বাসাটির গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘বাসায় ইলেকট্রিক চুলা আছে। কিন্তু দেখা গেল রান্নার সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আবার যে গ্যাস দিয়ে এক কাপ চা বানানো যায় না, তার জন্য মাস শেষে ঠিকই ১ হাজার ৮০ টাকা গুনতে হচ্ছে। সেখানে তো মাফ নেই। তাহলে কেন আমি বুস্টার দিয়ে আমার ভাগের গ্যাস টেনে নেব না?’
বুস্টার যে শুধু অবৈধ তাই নয়, নিম্নমানের এই যন্ত্র যেকোনো সময় ঘটাতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এক বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, ‘বুস্টার পাম্পগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অননুমোদিত উপায়ে মোটরের সঙ্গে পাইপ জুড়ে তৈরি হয়। এর সাহায্যে পাইপলাইনে জোর করে ভ্যাকুয়াম তৈরি করার ফলে বাতাসের অক্সিজেন লাইনে ঢুকে যায়। মিথেন ও অক্সিজেনের এই অনুপাত যদি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছায়, তবে পাম্পের মোটরের সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গ পুরো ভবনের গ্যাস লাইনকে মুহূর্তে শক্তিশালী বোমায় রূপান্তরিত করতে পারে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলছিলেন, ‘গ্যাসের চাপ যত কমই থাকুক, বুস্টার ব্যবহার অন্যায়। তা ছাড়া এটি ব্যবহার ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণও। একটি ফ্ল্যাটে একজনমাত্র ব্যবহারকারী পুরো ভবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।’
তবে ঝুঁকি জেনেও ফেসবুকে দেদার বিক্রি হচ্ছে বুস্টার। তেমনই একটি বিজ্ঞাপন দেখে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জের আনোয়ার শাহাদাতের সঙ্গে। তিনি জানালেন, চুলায় গ্যাসের চাপ বাড়াতে তার কাছে সাড়ে ৭ হাজার এবং সাড়ে ৮ হাজার টাকা দামের দুই ধরনের গ্যাস স্ট্যাবিলাইজার রয়েছে। সামান্য গ্যাস থাকলেও চুলা জ্বলবে গনগন করে। তার দাবি, এটি কোনো গ্যাস বুস্টার নয়, এতে গ্যাস টানা হয় না।
তবে তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস টেনে নেওয়া ছাড়া গ্যাসের চাপ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। একই কথা বললেন মাটিকাটা এলাকার ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলামও। তার মতে, গ্যাস বুস্টার আর গ্যাস স্ট্যাবিলাইজার একই জিনিস।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এই গ্যাস বুস্টার বিক্রি করছেন বলে জানালেন সাইদুল ইসলাম। জানালেন, চায়না থেকে আনা গ্যাস বুস্টার ৯৯০ টাকায় বিক্রি করতেন আগে। কিন্তু এগুলো মানসম্মত না হওয়ায় নিজেই এই বুস্টার তৈরি করে বিক্রি করছেন। গুণগত মান ও সুবিধা অনুযায়ী তার গ্যাস বুস্টারের দাম ২ হাজার ৬৯০ টাকা থেকে ৮ হাজার ৯৯০ টাকা।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘শুরুতেই এ যন্ত্র ব্যবহারে কিছুটা ঝামেলা হলেও এখন অনেক মানুষ বিক্রি করছে তাই কোনো ঝামেলা হয় না।’
এর আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুটি স্পিনিং মিলে গোপনে বুস্টার মেশিন বসানোর প্রমাণ মিলেছিল, যার প্রভাবে আশপাশের আবাসিক ও শিল্প সংযোগে দীর্ঘদিন তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছিল। যেহেতু যন্ত্রটি গোপনে ব্যবহার করা হয়, তাই কেউ অভিযোগ না জানালে বিষয়টি গোপনই থাকে। এক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থেই গ্রাহককে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে তিতাস।







